তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় কূটনৈতিক সমাধানের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দুই পক্ষই সামরিক সংঘাতের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে ইরানের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ইসরায়েল একটি সামরিক সংঘাতকে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দেখছে। উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে কূটনীতিকদের ধারণা।
প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ার রয়টার্সকে বলেন, “উভয় পক্ষই তাদের বন্দুক আঁকড়ে ধরে আছে। যদি না তারা রেডলাইন থেকে সরে আসে, তাহলে যুদ্ধ অনিবার্য।”
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার দ্বিতীয় দফা আলোচনাও ব্যর্থ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা এখন অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও হামলার হুমকি দিয়েছেন, যদিও এবার তিনি সীমিত আঘাতের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নৌবাহিনীর বিশাল বহর গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন—যেখানে বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধজাহাজ রয়েছে।
দুই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলার পরিকল্পনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ইরানের শীর্ষ ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। এমনকি তেহরানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিকল্প কৌশলও বিবেচনায় রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প তেহরানকে ১০ থেকে ১৫ দিনের সময়সীমা দিয়ে পারমাণবিক বিরোধে চুক্তিতে আসার আহ্বান জানান। অন্যথায় ‘খারাপ পরিস্থিতি’র মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেন।
তবে শুক্রবার সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি মনে করি এটা বিবেচনা করছি। একটি ন্যায্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করাই ভালো।”
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, সামরিক উত্তেজনা বাড়ানো ট্রাম্পের একটি কৌশল—যাতে আলোচনায় সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করা যায়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এমএসএনবিবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য কোনো সামরিক সমাধান নেই। গত বছরই তা প্রমাণিত হয়েছে।”
তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে স্থাপনাগুলোতে বড় আক্রমণ ও বিজ্ঞানী হত্যার ঘটনা ঘটলেও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা যায়নি।
গত মঙ্গলবার জেনেভায় ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। তবে ইরান একটি খসড়া প্রস্তাব প্রস্তুত করছে, যা শীর্ষ কর্মকর্তারা পর্যালোচনা করছেন। এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময়ের মধ্যে আবার আলোচনায় বসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রাম্পের প্রশাসনের ভেতরেও যুদ্ধ নিয়ে ঐকমত্য নেই। হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামলার পক্ষে এখনো কোনো ‘ঐক্যবদ্ধ সমর্থন’ তৈরি হয়নি।
অনেক উপদেষ্টা প্রেসিডেন্টকে অর্থনৈতিক ইস্যুতে মনোযোগ দিতে বলছেন। কারণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সামরিক সংঘাত রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ রব গডফ্রে মনে করেন, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ট্রাম্প ও তার দলের জন্য বড় রাজনৈতিক বিপদ ডেকে আনতে পারে।
ইউরোপীয় ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, উপসাগরে মার্কিন বাহিনীর মোতায়েন হামলার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ডেভিড ডেস রোচেস বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে প্রথম লক্ষ্য হতে পারে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিপ্লবী গার্ড নৌবাহিনী।
এরই মধ্যে বিপ্লবী গার্ড হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। তা ঘটলে বিশ্বব্যাপী তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তীব্র প্রভাব ফেলবে।
দুই পক্ষের মধ্যে আপসের লক্ষণ খুব কম। খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা আলী লারিজানি বলেছেন, ইরান আইএইএকে পর্যবেক্ষণের অনুমতি দিতে প্রস্তুত।
কিন্তু ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ডেভিড মাকোভস্কির মতে, “দুই পক্ষই নিজের দাবিতে বাজি ধরে বসে আছে। ওয়াশিংটন বিশ্বাস করে শক্তি প্রয়োগে তেহরান নতি স্বীকার করবে, আর তেহরান মনে করে ট্রাম্পের দাবি পূরণ অসম্ভব।”
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, কূটনৈতিক পথ সংকুচিত হচ্ছে এবং সামরিক বিকল্প সামনে আসছে।
যদি শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আরেকটি বড় সংঘাতের মুখোমুখি হতে পারে—যার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।

