মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের আবারও ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে নতুন একটি বিবৃতি দিয়েছে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ব্যক্তিদেরই কেবল ফেরত নেওয়া হবে।
মিয়ানমারের দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা তিন লাখের কিছু বেশি ‘বাস্তুচ্যুত’ মানুষকে ফিরিয়ে নিতে তারা ইচ্ছুক। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া তালিকায় উল্লেখ করা সংখ্যার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে দেশটি।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে মিয়ানমার আরও দাবি করেছে, ‘রোহিঙ্গা’ নামে যে জাতিগত পরিচয়ে তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে, সে নামে দেশটিতে কোনো জনগোষ্ঠী নেই।
মিয়ানমারের এই বিবৃতি নিয়ে শনিবার রাত পর্যন্ত বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে বিশ্লেষকেরা বিবৃতিটিকে মিয়ানমারের পুরোনো কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বিবৃতিতে ব্যবহৃত ভাষার মাধ্যমে দেশটি মূলত নিজেদের বয়ান বা অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে।
একই সঙ্গে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আবারও আলোচনার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে এই বিবৃতির মধ্য দিয়ে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন নিয়ে বিবৃতিটি প্রকাশ করে। এতে দাবি করা হয়েছে, এই ইস্যুতে গণমাধ্যমে ‘একপেশে, ভুল তথ্য ও অপতথ্য’ প্রচার করা হচ্ছে। তাদের জাতিগত পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে মিয়ানমার।
দেশটির দাবি, বিভিন্ন দেশে যাওয়া ব্যক্তিদের এমন একটি জাতিগত পরিচয়ে পরিচিত করা হচ্ছে, যার অস্তিত্ব মিয়ানমারে কখনো ছিল না।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শিবিরে থাকা সবাইকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। অন্যদিকে অন্যান্য দেশে যাওয়া ব্যক্তিদের এমন একটি জাতিগত পরিচয় দেওয়া হচ্ছে, যা মিয়ানমারে কখনো ছিল না।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে মিয়ানমার আরও বলেছে, বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে সমাধানের বিষয় হলেও একে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মিয়ানমারের দাবি, ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে আরসা ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ পুলিশ ফাঁড়ি ও ব্যাটালিয়নে সমন্বিত হামলা চালায়। এর জবাবে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হিসেবে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। আরসার হুমকির কারণে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষ অন্য শহর ও গ্রামে চলে যায় এবং ‘বিপুলসংখ্যক বাঙালি’ বাংলাদেশে পালিয়ে যায় বলে দাবি করেছে নেপিদো।
মিয়ানমারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আরসার হামলার আগে বুথিদং, মংডু ও রাথিডং টাউনশিপে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করত। ঘটনার পর তাদের মধ্যে ২ লাখের বেশি সেখানে থেকে যায় এবং ৫ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশে চলে যায়।
এই হিসাবের ভিত্তিতে মিয়ানমার দাবি করেছে, ‘রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত’—এমন তথ্য সঠিক নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে তিনটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে মিয়ানমার।
দেশটির দাবি, ওই চুক্তির আওতায় তিন দফায় তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও ‘একজনও’ মিয়ানমারে ফেরত যায়নি।
বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনকে যাচাই করেছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে প্রমাণিত করা হয়েছে। ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে মিয়ানমার।
যাচাই হওয়া বাস্তুচ্যুতদের দ্রুত ফিরিয়ে নিতে ‘আন্তরিক সদিচ্ছা’ নিয়ে কাজ চলছে বলেও জানিয়েছে দেশটি।
তাদের ভাষ্য, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হলে যাচাই হওয়া রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দাদের গ্রহণ করা হবে।
মিয়ানমারের এই বিবৃতির বিষয়ে শনিবার রাত পর্যন্ত বাংলাদেশ কোনো মন্তব্য করেনি। প্রতিক্রিয়া জানতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে আরও প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে।
গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ ৮৯ হাজার।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের নভেম্বরে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমারের তৎকালীন বেসামরিক সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ একটি চুক্তি করে। এতে চীন মধ্যস্থতা করেছিল।
চুক্তির অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবে আর কার্যকর হয়নি।
এরপর ২০১৯ সালের আগস্টে চীনের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর আরেকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু নাগরিকত্বের বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে যেতে রাজি হয়নি।
২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে ৮ লাখ রোহিঙ্গার একটি তালিকা দিয়েছিল।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক পর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা ও সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
এবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিবৃতিটিকেও বিশ্লেষকেরা সময়ক্ষেপণের পুরোনো কৌশল হিসেবে দেখছেন।
তাদের অনেকে মনে করছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ যে অবস্থান তৈরি করেছে, তার বিপরীতে নিজেদের পাল্টা অবস্থান তুলে ধরারও চেষ্টা করেছে মিয়ানমার।
মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, অতীতে যেভাবে সময়ক্ষেপণের চেষ্টা করেছে মিয়ানমার, এবারও তারা একই পথে এগিয়েছে।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশ অতীতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তালিকা পাঠানোর পরও মিয়ানমার যাচাই-বাছাইয়ের নামে সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছিল।
তিনি বলেন, অতীতে প্রত্যাবাসনে রাজি হওয়ার সময়ও মিয়ানমার এমন সংখ্যা উল্লেখ করেছিল, যেখানে একই পরিবারের একজনকে বৈধ এবং অন্যজনকে অবৈধ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। অর্থাৎ বাবাকে গ্রহণ করা হলেও মা বাদ পড়েছেন, আবার মা-বাবাকে বৈধ বলা হলেও সন্তানকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তার মতে, এ ধরনের কৌশলের কারণেই শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবাসন আর হয়নি।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, এবারও মিয়ানমার একই কৌশল নিয়েছে।
শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, আন্তর্জাতিক পরিসরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ঘিরে মিয়ানমারের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও রয়েছে এই বিবৃতিতে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান নিয়ে যে আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে, তার পাল্টা হিসেবে মূলত এই বয়ান সামনে এনেছে মিয়ানমার।
‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই—এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠারও চেষ্টা রয়েছে বলে মনে করেন আসিফ মুনীর।
মিয়ানমার দেশটির ১৩৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয় না। বরাবরই তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে দেশটি।
আসিফ মুনীর বলেন, এটি মিয়ানমারের এক ধরনের ছক, যা আগেও দেখা গেছে। তার মতে, মিয়ানমার সত্যিকার অর্থেই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে—এমনটি বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ নেই।
তবে এই বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কিংবা তারা বাঙালি না রোহিঙ্গা—এসব নিয়ে নানা বক্তব্য থাকলেও তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রস্তুতি বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।
আসিফ মুনীরের মতে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বর্তমানে যে সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে নিজেদের ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টাও থাকতে পারে এই বিবৃতিতে।
তিনি বলেন, মিয়ানমারে কয়েক দিন আগেই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার গঠন হয়েছে। যদিও অভিযোগ রয়েছে, এই নির্বাচন তাদের সামরিক সরকারেরই স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। তার মতে, এই গণতান্ত্রিক রূপকেও বিবৃতির মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে মিয়ানমার।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের এই বিবৃতি দেওয়ার ফলে দীর্ঘদিন পর হলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আবার আলোচনার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি

