বিশ্ব রাজনীতির নজর এখন ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের দিকে। এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কোনো প্রান্তিক দেশ নয়, বরং মানচিত্রের কেন্দ্রে।
ভূগোল বদলানো যায় না, কিন্তু ভূগোলের মূল্য বদলে যায়। যে বঙ্গোপসাগর একসময় ছিল জেলে নৌকা আর উপকূলীয় বাণিজ্যের জলরাশি, আজ সেটি পরাশক্তিদের মানচিত্রের লাল দাগ। সম্প্রতি রয়টার্স, ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, মিডলইস্ট আই সহ বাংলাদেশী দৈনিক সমকালে বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন করেছে যেখানে পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছে। সেই চিত্রের ভেতরে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে, এবং কোথায় দাঁড়ানো উচিত, এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।

কেন বঙ্গোপসাগর এতটা গুরুত্বপূর্ণ
অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের একটি নিবন্ধে বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের সঙ্গে চীনের ৯৫ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য ভারত মহাসাগর দিয়ে চলে। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ৭০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ এই জলপথ অনিরাপদ হলে আঘাত লাগে এশিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনীতির জ্বালানি ও রপ্তানিতে।
প্রতিটি শক্তির হিসাব আলাদা:
●চীন: বিআরআই বাস্তবায়নে বঙ্গোপসাগরকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখছে। লক্ষ্য প্রশান্ত মহাসাগরের ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে “টু-ওশান” কৌশল সুরক্ষিত রাখা।
●ভারত: বঙ্গোপসাগরকে নিরাপদ বলয় (“বাফার জোন”) হিসেবে দেখে। “অ্যাক্ট ইস্ট” নীতি শুরুতে অর্থনৈতিক হলেও এখন রাজনৈতিক ও কৌশলগত মাত্রা পেয়েছে। মালাক্কার কাছে গ্রেট নিকোবরে গভীর সমুদ্রবন্দর ও উপশহর গড়ে তোলা হচ্ছে।
●যুক্তরাষ্ট্র: “অবাধ ও উন্মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল” কৌশলে কাজ করছে।
●জাপান: “বিগ-বি” উদ্যোগের আওতায় মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ছে, যা জাইকার মতে বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হবে।
|
আমদানি করা উত্তেজনা
এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বঙ্গোপসাগরের সম্ভাব্য সংঘাত এখানকার নিজস্ব বিবাদ থেকে আসছে না। আসছে অন্য ফ্রন্টের ঢেউ হিসেবে। তাইওয়ান ঘিরে চীন-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা মালাক্কা হয়ে বঙ্গোপসাগরে আছড়ে পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধও এখানে নতুন ফ্রন্ট খুলতে পারে। ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তার যুদ্ধ ভারত মহাসাগর পর্যন্ত ছড়ানোর হুমকির কথাতেও সেই ইঙ্গিত মেলে।
অর্থাৎ বড় শক্তিদের কাছে বঙ্গোপসাগর মূল লক্ষ্য নয়, অন্য সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য পথ নিরাপদ রাখার বিমা। এই বিমার খরচ দিতে হয় আশপাশের দেশগুলোকে, যাদের নিজেদের ওই লড়াইয়ে কোনো স্বার্থ নেই। ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান চলাচলের অনুমতি চাওয়ার ঘটনায় বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা সেই ঝুঁকিরই ইঙ্গিত।
বাংলাদেশের অবস্থান: কেন্দ্রে, কিন্তু ঝুঁকিতেও
বঙ্গোপসাগরের উত্তরে বাংলাদেশ। এই অবস্থান একই সঙ্গে বাংলাদেশের শক্তি ও দুর্বলতা।
শক্তির জায়গা:
●বন্দরের সম্ভাবনা: চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা ও মাতারবাড়ী এমন এক ভূগোলে, যেখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য এসে মিলতে পারে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার এর কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
●সবার সঙ্গে সম্পর্কের সুযোগ: চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান, সবারই বাংলাদেশে আগ্রহ আছে। প্রতিযোগিতা যত বাড়ে, দরকষাকষির সুযোগও তত বাড়ে।
●সমুদ্র সম্পদ: বিশাল সমুদ্র এলাকায় মৎস্য, জ্বালানি ও অন্যান্য সম্ভাবনা সুনীল অর্থনীতির ভিত্তি হতে পারে।
ঝুঁকির জায়গা:
●ভূরাজনৈতিক চাপ: যে দেশ কেন্দ্রে থাকে, সব পক্ষের চাপও তার ওপরই বেশি আসে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) একটি লেখায়ও বলা হয়েছে, এখানকার যেকোনো প্রতিযোগিতা বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে।
●রাখাইনের অভিজ্ঞতা: প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাখাইনে চীন ও ভারতের নিজস্ব স্বার্থের কারণে প্রতিবেশীরা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। ২০২৪ সালের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, চীনের কাছে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকারের জন্য মিয়ানমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ, আর ভারত কালাদান প্রকল্পে জোর দিচ্ছে। এর মূল্য দিচ্ছে বাংলাদেশ, কক্সবাজারের শিবিরে।
●সামর্থ্যের সীমা: নৌ ও নজরদারি সক্ষমতা, জ্বালানি-নির্ভরতা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে বাংলাদেশের দরকষাকষির শক্তি সীমিত।
সহজ কথায়, বাংলাদেশ শুধু দর্শক নয়, আবার পূর্ণ নিয়ন্ত্রকও নয়। বাংলাদেশ একটি কৌশলগত সংযোগস্থল, যার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সে কতটা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজের অবস্থান ব্যবহার করে তার ওপর।
“ভারসাম্যের কূটনীতি”: স্লোগান নয়, মাপকাঠি চাই
ঢাকা “ভারসাম্যের কূটনীতি” অনুসরণ করছে। কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের দিকে না ঝুঁকে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সবার সঙ্গে কাজ করতে চায়। নীতি হিসেবে এটি যুক্তিসংগত। কিন্তু প্রতিযোগিতা তীব্র হলে “ভারসাম্য” শব্দটি সহজেই ফাঁকা স্লোগানে পরিণত হয়। তাই প্রতিটি প্রস্তাব যাচাইয়ের জন্য স্পষ্ট মাপকাঠি দরকার:
●এটি কি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখছে?
●ঋণ, শর্ত ও মালিকানা কি জনসমক্ষে স্পষ্ট?
●অবকাঠামোটি কি শুধুই বাণিজ্যিক, নাকি সামরিক কাজেও ব্যবহারযোগ্য?
●এতে কি বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছে?
ইতিহাস থেকেও একটি শক্ত অবলম্বন আছে। বাংলাদেশ ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি করেছে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বিশাল সমুদ্র এলাকা পাওয়া গেছে শক্তি দেখিয়ে নয়, আইনের পথে। শক্তিশালী প্রতিবেশীদের মাঝখানে ছোট দেশের জন্য নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাই সবচেয়ে টেকসই ঢাল।

আসল “বার্গেনিং চিপ” কী
বাংলাদেশের বার্গেনিং চিপ কী? আমার মতে, ভৌগোলিক অবস্থান একা কোনো চিপ নয়। সেই অবস্থান কাজে লাগানোর সক্ষমতাই চিপ। এর তিনটি স্তম্ভ:
বন্দর ও সংযোগ: বন্দরগুলোকে এমনভাবে গড়া, যাতে আঞ্চলিক বাণিজ্য এখান দিয়ে চলাই লাভজনক হয়।
সামুদ্রিক সম্পদ: মৎস্য, জ্বালানি ও সমুদ্রসম্পদ টেকসইভাবে ব্যবহার, যাতে উপকূলের লাখো মানুষের জীবিকা রক্ষা পায়।
নজরদারি ও নিরাপত্তা: নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের এমন সক্ষমতা, যাতে নিজের জলসীমা নিজেই রক্ষা করা যায়।
সুনীল অর্থনীতি তাই কেবল অর্থনৈতিক স্লোগান নয়, কৌশলগত নিরাপত্তারও অংশ। নিজের সাগরে যার সক্ষমতা নেই, তার নিরপেক্ষতা অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করে।
করণীয়: জরুরি পদক্ষেপ
১. চুক্তির স্বচ্ছতা ও সংসদীয় নজরদারি। বন্দর, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বড় প্রতিটি চুক্তি সংসদে ও জনসমক্ষে আলোচনা হওয়া উচিত। গোপন চুক্তি বিদেশি চাপের পথ খুলে দেয়।
২. সামরিক ঘাঁটি নিয়ে স্পষ্ট লক্ষ্মণরেখা। কোনো বিদেশি শক্তিকে সামরিক ঘাঁটি বা স্থায়ী প্রবেশাধিকার না দেওয়ার নীতি স্পষ্ট ও প্রকাশ্য থাকা দরকার।
৩. জাতীয় ঐকমত্য। পররাষ্ট্রনীতি সরকার বদলালেই বদলে যাওয়ার বিষয় নয়। বঙ্গোপসাগর-কৌশলে রাজনৈতিক দলগুলোর ন্যূনতম সমঝোতা দরকার।
৪. সামুদ্রিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ। নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও সামুদ্রিক নজরদারি প্রযুক্তি জোরদার করা, সঙ্গে ব্লু ইকোনমির জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা ও গবেষণা।
৫. আঞ্চলিক ফোরামে সক্রিয়তা। বিমসটেক ও ভারত মহাসাগরীয় ফোরামে বাংলাদেশকে এজেন্ডা-নির্ধারকের ভূমিকায় যেতে হবে, যাতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, মৎস্য ও জলবায়ুর মতো সবার স্বার্থ জড়িত বিষয়গুলো সামনে আসে। রোহিঙ্গা সংকটকেও এই আঞ্চলিক আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় করতে হবে।
সাগরের চাবি থাকুক নিজের হাতে
পরাশক্তিরা প্রতিযোগিতা করবেই। তা থামানোর ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতায় নিজের শর্ত ঠিক করার ক্ষমতা আছে: কী গ্রহণ করব, কী ফিরিয়ে দেব, কীসের বিনিময়ে কী নেব। সেই ক্ষমতা কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, আইনের প্রতি আস্থা, নিজের সামুদ্রিক সক্ষমতা আর জাতীয় ঐকমত্য।
সাগর আমাদের দক্ষিণ সীমান্ত নয়, ভবিষ্যতের দরজা। প্রশ্ন শুধু, দরজার চাবিটা আমাদের হাতে থাকবে কি না।

