লোহিত সাগর থেকে হরমুজ: অর্থনৈতিক স্বার্থে নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা…..
বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৬৫টি সক্রিয় সংঘাত চলছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু সংঘাত সরাসরি রাষ্ট্রের মধ্যে, আর বেশির ভাগই কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট থেকে তৈরি হয়েছে। তবে যেসব সংঘাতের প্রভাব পুরো বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পড়ে, তার মধ্যে ইরান-মার্কিন উত্তেজনা অন্যতম।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি এবং ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের পর পরিস্থিতির উত্তেজনা কিছুটা কমলেও, এই সংঘাত এখনো বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।
এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলবর্তী এলাকায় হুথিদের দ্রুত সামরিক অগ্রগতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। হুথিদের কৌশলগত অবস্থান শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। একই সঙ্গে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অনুরোধে হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনাগ্রহ এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি জাহাজে হামলা না করার বিষয়ে হুথিদের দেওয়া আশ্বাস- এসব বিষয় মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত শক্তির সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এই ঘটনাগুলোকে যদি সোমালিল্যান্ড এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েল কর্তৃক এর স্বীকৃতির বিষয়টির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, তাহলে পুরো পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সোমালিল্যান্ডে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি লোহিত সাগর অঞ্চলের ভূকৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, হুথিদের এই অগ্রগতি কি ইরানের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ, যার লক্ষ্য সৌদি আরবের বিকল্প তেল পরিবহন পথকে চ্যালেঞ্জ করা? নাকি এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এমন একটি কৌশল, যার মাধ্যমে সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে? যাই হোক, বাস্তবতা হলো, বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরের সামুদ্রিক পথ ভবিষ্যতের বড় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছেন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার শুরু থেকেই অনেক বিশ্লেষক মনে করেছেন, এর পেছনে শুধু নিরাপত্তা বা মতাদর্শ নয়, বরং তেল, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পেট্রোডলারের আধিপত্য ধরে রাখা, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা এবং আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করার চেষ্টা।
এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং গ্রিনল্যান্ডের মতো কৌশলগত অঞ্চলের গুরুত্বও আলোচনায় এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিক অঞ্চলে নতুন নৌপথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতা এবং রাশিয়া ও চীনের প্রভাব সীমিত করার বিষয়গুলোও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাবের অংশ হিসেবে দেখা হয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট- বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ সংঘাতকে শুধু ধর্ম বা মতাদর্শ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এসব সংঘাতের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যপথের আধিপত্য, সামুদ্রিক প্রবেশাধিকার এবং যুদ্ধ অর্থনীতি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্র। একইভাবে ইরান নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তেল বিক্রি করে আয় করছে এবং রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও বিভিন্নভাবে টিকে আছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কারা লাভবান হয়- এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে তেল উৎপাদনকারী দেশ, অস্ত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি, জাহাজ পরিবহন খাত এবং কালোবাজারি অর্থনীতি সংঘাত থেকে সুবিধা পায়। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাতে মানবিক সংকট আরও গভীর হয়।
এই পরিস্থিতিতে গাজা যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিন সংকটও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার সুযোগে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা ও মানবিক সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বড় শক্তিগুলোর দ্বৈত নীতির অভিযোগও সামনে আসছে।
একটি পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ‘নিয়ম-ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা’ রক্ষার দাবি করে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তন এবং কিছু অঞ্চলে সীমিত সম্পৃক্ততা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় নতুন জোট ও অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে।
এই বাস্তবতায় চীনের উত্থানও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা শুধু সামরিক ক্ষেত্রে নয়; এটি প্রযুক্তি, বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও চলছে। ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকগুলো হয়তো এই প্রতিযোগিতার অবসান ঘটাবে না, তবে সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে ইরান-মার্কিন উত্তেজনা, হুথি-সৌদি সংঘাত এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান সামরিক শক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। এসব সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন কূটনীতি, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার নতুন কাঠামো।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি উদ্যোগ, ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক, সৌদি আরব-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং তুরস্ককে যুক্ত করে সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা- এসব দেখায় যে আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক পথ খুঁজছে। পাকিস্তানের জন্য এই সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপান্তর করা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে চীন-পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে স্থায়ী সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ বর্তমান বিশ্বে একক শক্তির আধিপত্যের পরিবর্তে আন্তঃনির্ভরতা, কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি হতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও ফ্রিল্যান্স লেখক ড. রাজা মুহাম্মদের ট্রিবিউন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত লেখার আলোকে প্রতিবেদনটি পুনর্লিখন করা হয়েছে।

