অর্থনীতির গতি বাড়াতে চীনের আটটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূলধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক নানা চাপের মধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে ঋণপ্রবাহ জোরদার করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সূত্র: বিবিসি
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া রোববার জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আটটি প্রতিষ্ঠানে মোট ৩৬০ বিলিয়ন ইউয়ান দেওয়া হবে। বর্তমান বিনিময় হারে এর পরিমাণ প্রায় ৫৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অর্থায়নের ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সেবা দেওয়ার সামর্থ্যও বৃদ্ধি পাবে।
নতুন এই অর্থায়ন প্যাকেজে চীনের তিনটি বড় ব্যাংক ও পাঁচটি বিমা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না, এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না এবং চায়না এক্সপোর্ট অ্যান্ড ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, নতুন মূলধন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াবে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে আরও বেশি অর্থ প্রবাহিত করার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক আর্থিক অনিশ্চয়তার সময় বাইরের বিভিন্ন ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতাও বাড়বে প্রতিষ্ঠানগুলোর।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে চাঙা করতে বেইজিং সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে। বাণিজ্য উত্তেজনা, ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা জনসংখ্যাসহ একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে দেশটিকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমশক্তির আকার কমে যাওয়া, কয়েক বছর ধরে চলা আবাসন খাতের মন্দা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা। এসব চাপের মধ্যেই অর্থনীতির কাঠামোয় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে বেইজিং।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক স্থিতিশীলতাকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। ফলে রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ধরে রাখা ও বাড়ানোকে অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দামের ওপর তৈরি চাপ দেশটির শক্তিশালী রপ্তানি কার্যক্রমের সুফলকে অনেকটাই ছাপিয়ে গেছে।
জুলাইয়ে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে। অথচ বছরের প্রথম তিন মাসে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক প্রান্তিকের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধির হার কমেছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।
দ্বিতীয় প্রান্তিকের এই প্রবৃদ্ধি চীনা সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনাতেও কম। অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা এবং অন্যান্য চাপ যে এখনো কাটেনি, এই পরিসংখ্যান তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীন মার্চে চলতি বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করে। ১৯৯১ সালের পর এটিই দেশটির সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে চীন অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতাকে স্বীকার করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের পথও তৈরি হয়েছে।
আটটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ মূলধন দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তাই অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং বহিরাগত ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

