বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ সংকট সহসাই কাটছে না বলে আভাস দিয়েছেন জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য পরিসংখ্যান সংস্থা এবং সংরক্ষণাগার বাজার বিশ্লেষণকারী একটি সংস্থার সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্তও এই সংকট অব্যাহত থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির তেমন কোনো লক্ষণ নেই, ফলে জ্বালানি খরচের বাড়তি চাপ আরও কিছুদিন ভোগাবে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ডিজেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এই দুই অঞ্চল থেকে স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি বিশ্ববাজারে আসত, তা এখন আসছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন দেশের মজুদে—অনেক জায়গায় তা নেমে এসেছে ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন পর্যায়ে, আর সেই সঙ্গে দামও উঠেছে রেকর্ড উচ্চতায়। কৃষি, উৎপাদন শিল্প ও পণ্য পরিবহনের মতো ডিজেলনির্ভর খাতগুলোতে তাই সরাসরি চাপ পড়ছে।
এই সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বাজারেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি মাসে দেশটিতে প্রথমবারের মতো খুচরা ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালনে ৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা সরাসরি বাড়তি চাপে ফেলেছে কৃষক ও পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের।
সংকটের আরেকটি স্পষ্ট চিত্র মিলছে জ্বালানি সংরক্ষণের বাজারে। উত্তর আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের শোধনাগার ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি সংরক্ষণের জন্য ভাড়া নেওয়া ট্যাংকের চুক্তি নবায়ন করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, কারণ সংরক্ষণ করার মতো পর্যাপ্ত জ্বালানিই তাদের হাতে নেই। সংরক্ষণাগার বাজার-বিশ্লেষণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে ভাড়ার জন্য খালি পড়ে থাকা ট্যাংকের ধারণক্ষমতা গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, মজুদ কম থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি ইজারা নবায়নে আর আগ্রহী নয়, কারণ বাজারে রাখার মতো জ্বালানিই অবশিষ্ট নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল মজুদের চিত্রও উদ্বেগজনক। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ডিজেল মজুদ নেমে এসেছে এমন এক পর্যায়ে, যা ১৯৮২ সাল থেকে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর বছরের এই সময়ের হিসাবে সর্বনিম্ন। এই দুই চিত্র—কমতে থাকা মজুদ ও সংরক্ষণাগার বাজারের সংকোচন—একসঙ্গে বিবেচনা করলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা যথেষ্ট।
শুধু জ্বালানি খাত নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পরিবহননির্ভর অন্যান্য ব্যবসায়ও। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান জ্বালানি খরচ সামাল দিতে ছোট আকারের ট্রাক ব্যবহার এবং একই এলাকায় একাধিক ডেলিভারি একসঙ্গে সম্পন্ন করার কৌশল নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্ণধার জানান, এখন একটি অপ্রয়োজনীয় ট্রিপের খরচও আগের তুলনায় অনেক বেশি পড়ছে, আর এই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসও তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি মাসেই দেশটির ডিস্টিলেট ফুয়েল মজুদ ১০ কোটি ব্যারেলের নিচে নেমে যেতে পারে, আর ২০২৬ সালের বাকি সময় এবং ২০২৭ সালের অধিকাংশ সময়জুড়েই মজুদ থাকতে পারে গত পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন স্তরের নিচে। ডিজেল যেহেতু ডিস্টিলেট ফুয়েলের একটি প্রধান অংশ এবং কৃষি ও পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, তাই এই মজুদ সংকট সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়াতে পারে।
সংকট শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত একটি অঞ্চলেও ডিজেলের মজুদ গত পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কম, সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী যা প্রায় ১৬ শতাংশ কম। এশিয়ার প্রধান জ্বালানি বাণিজ্যকেন্দ্র সিঙ্গাপুরেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে—বর্তমান মজুদ গত বছরের গড় মজুদের তুলনায় বেশ কিছুটা কম, যদিও মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুরুর আগের অবস্থার কাছাকাছি রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়া—বিশ্বের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলেই ডিজেলের মজুদ চাপের মুখে রয়েছে। যুদ্ধ-সংক্রান্ত সরবরাহ বিঘ্নের পাশাপাশি কমতে থাকা মজুদ মিলিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত অনিশ্চিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে আগামী বছরজুড়েও ডিজেলের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি নজরদারির বিষয় হয়ে থাকতে পারে।

