কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফল প্রকাশের অপেক্ষায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এর সঙ্গে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাশিয়ার জ্বালানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) এশিয়ার শেয়ারবাজারে দরপতন ঘটিয়েছে। বিপরীতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। রয়টার্সের সর্বশেষ বাজার-প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানের বাইরে এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোর এমএসসিআই সূচক ১ দশমিক ১৪ শতাংশ কমেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক কমেছে শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক প্রায় ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ নেমেছে।
বিনিয়োগকারীদের নজর এখন মেটা, টেসলা এবং এআই অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির আয়ের দিকে। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার আর্থিক ফল প্রকাশের কথা বুধবার। চলতি সপ্তাহে টেসলা ও চিপ নির্মাতা ল্যাম রিসার্চ এবং টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টসের ফলও সামনে আসবে। মঙ্গলবার স্পেসএক্স ও নেটফ্লিক্সের ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আয় ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পূর্বাভাস থেকে বিনিয়োগকারীরা বোঝার চেষ্টা করবেন, এআই প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে কোম্পানিগুলো কতটা আয় করতে পারছে এবং সেই ব্যয় থেকে পর্যাপ্ত মুনাফা আসছে কি না।
এআই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও তা থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া যাবে কি না, সেই প্রশ্ন বাজারে গুরুত্ব পাচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, মেটাসহ পাঁচটি বড় এআই অবকাঠামো ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মূলধনি ব্যয় আগামী বছর প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এত বিপুল ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার এআই অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান এলিস গ্রুপের শেয়ারবাজারে প্রথম দিনের লেনদেনেও সেই সতর্কতার প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে ২০১ দশমিক ১ বিলিয়ন ওন বা প্রায় ১৫ কোটি ১১ লাখ ডলার সংগ্রহ করা প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার লেনদেনের শুরুতে আইপিও দরের চেয়ে ১৬ শতাংশ কমে যায়। পরে দরপতন আরও বাড়ে।
শেয়ারবাজারের দুর্বলতার বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। রয়টার্সের ওই বাজার-প্রতিবেদনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ৮৫ ডলারে দাঁড়ায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে হয় ১০৯ দশমিক ৬৪ ডলার। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকির পাশাপাশি রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও বাজারের হিসাবকে জটিল করে তুলেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা এক নির্বাহী আদেশে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক শিথিল করার বিষয়টি উঠে এসেছে। এর মধ্যে রাশিয়ার পণ্যের ওপর শুল্ক এবং দেশটির তেল ও গ্যাস কেনার কারণে আরোপিত কিছু বিধিনিষেধও রয়েছে। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি। ফলে বাজারে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ বাড়বে কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচে চাপ তৈরি হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
মঙ্গলবারের লেনদেনের সময় ডলার সূচক শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ কমে ১০১ দশমিক ৮০ পয়েন্টে নেমেছে। ইউরোর দর শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ১২২৯ ডলারে দাঁড়ায়। জাপানি ইয়েন ডলারের বিপরীতে শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ শক্তিশালী হয়ে প্রতি ডলারে ১৫৮ দশমিক ২৪ ইয়েনে পৌঁছায়। অন্যদিকে, ব্রিটিশ পাউন্ডের দামও বেড়েছে। একই সময়ে স্পট স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৪৫ দশমিক ২৫ ডলারে ওঠে। বিটকয়েন ও ইথারের দামও ওই সময় কিছুটা বেড়েছিল।
এদিকে, ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। প্যারিস, লিল ও নিসের কিছু এলাকায় চলাচল সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। রাজনৈতিক অস্থিরতা ইউরোপের বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোর আগাম লেনদেনেও দরপতনের ইঙ্গিত দেখা গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ফিউচারস সামান্য বেড়েছিল। সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগকারীরা এখন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আয়, এআই খাতে ব্যয়ের স্থায়িত্ব, জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। এসব বিষয়ের নতুন তথ্যই আগামী দিনগুলোতে বিশ্ববাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

