নিরাপত্তার নামে নিয়ন্ত্রণ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়কে হতে হবে স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ শেখার জায়গা
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক জীবনের একটি পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে রাত ১০টার পর মেয়েদের কী কাজ? প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে নারীর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে গভীর বিতর্ক।
প্রথম আলোর একটি মতামতধর্মী লেখায় উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। ছেলেদের আবাসিক হলে যেখানে প্রবেশ ও চলাচলের ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্বাধীনতা রয়েছে, সেখানে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য রাত ১০টার পর হলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘কয়টায় হলে ফিরবে’ সেখানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রশ্ন হলো, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী শিক্ষার্থী কি নিজের সময় ও জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন?
লেখাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি রাতের স্বাধীনতাকে বিনোদনের বিষয় হিসেবে নয়, বরং শিক্ষা ও পেশাগত বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। একজন নারী শিক্ষার্থীর রাত ১০টার পর কাজ থাকতে পারে পড়াশোনা, গবেষণা, লাইব্রেরি, সাংবাদিকতা, ইন্টার্নশিপ, খণ্ডকালীন চাকরি, নাটক, চলচ্চিত্র, সংগীত, স্বেচ্ছাসেবা কিংবা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে। ঢাকার যানজট, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। অথচ আবাসিক হলের সময়সীমা নারী শিক্ষার্থীদের অনেক ক্ষেত্রেই এসব সুযোগ থেকে পিছিয়ে দিতে পারে।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি নিরাপত্তা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে রাত ১০টার পর ক্যাম্পাস অনিরাপদ, তাহলে সমাধান কি নারী শিক্ষার্থীদের ঘরে বন্দী রাখা? নাকি ক্যাম্পাসকে নিরাপদ করা?
প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হওয়া উচিত পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিরাপত্তাকর্মী, কার্যকর সিসিটিভি, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ পরিবহন এবং হয়রানি ও সহিংসতার অভিযোগ জানানোর বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো তৈরি করা। ঝুঁকি থাকলে ঝুঁকির উৎস মোকাবিলা করতে হবে; ঝুঁকি মোকাবিলার দায় কেবল নারীর চলাফেরার ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা হতে পারে না।
এই বিতর্কের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। একজন ছেলে রাত করে ফিরলে তাকে সাধারণত দায়িত্বজ্ঞানহীন বা চরিত্রহীন বলা হয় না। কিন্তু একজন নারী দেরিতে ফিরলে তার চরিত্র, উদ্দেশ্য এবং চলাফেরা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অর্থাৎ এখানে কেবল প্রশাসনিক নিয়ম নয়, কাজ করছে গভীর সামাজিক পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা।
বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধু সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রতিষ্ঠান?
নাকি এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে একজন মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে, দায়িত্ব নিতে এবং স্বাধীনভাবে জীবন পরিচালনা করতে শেখে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, নারী শিক্ষার্থীদের ওপর সময়ের বিধিনিষেধ তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি বা অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি তাদের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে যদি ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়, সংগঠনের নেতৃত্ব দিতে বিশ্বাস করা হয়, গবেষণা, চাকরি ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণের যোগ্য মনে করা হয়, তাহলে নিজের হলে কখন ফিরবেন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁকে বিশ্বাস করা হবে না কেন?
বিশেষত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনগুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের ভূমিকা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আন্দোলন, প্রতিবাদ ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীদের সামনে রাখা হবে, কিন্তু ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তাদের ‘সুরক্ষার’ নামে সীমাবদ্ধ রাখা হবে এই দ্বৈততা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অবশ্যই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন হতে পারে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রবেশ-নির্গমনের আধুনিক ব্যবস্থাপনা, জরুরি রেজিস্ট্রেশন বা অভিভাবক যোগাযোগের মতো ব্যবস্থা। কিন্তু সমাধান হতে পারে না দরজা বন্ধ করে দেওয়া এবং দেরি করে ফেরা একজন নারী শিক্ষার্থীকে সন্দেহের চোখে দেখা।
রাত ১০টার পর মেয়েদের কী কাজ এই প্রশ্নের উত্তর আসলে খুব দীর্ঘ নয়।
তাদের পড়াশোনা আছে। গবেষণা আছে। চাকরি আছে। স্বপ্ন আছে। দায়িত্ব আছে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন আছে। নেতৃত্ব দেওয়ার প্রয়োজন আছে। আর সবকিছুর বাইরে একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে নিজের সময় নিজের মতো করে ব্যবহারের অধিকারও আছে।
বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্যিই মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন মানুষের বিকাশের জায়গা হতে চায়, তাহলে নিরাপত্তার নামে নিয়ন্ত্রণের পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ নিরাপদ বিশ্ববিদ্যালয় মানে নারীকে আটকে রাখা নয়; নিরাপদ বিশ্ববিদ্যালয় মানে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে চলতে পারবে এবং প্রয়োজনে কার্যকর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পাবে।
সময়ের দাবি তাই স্পষ্ট কারফিউ নয়, নিরাপত্তা; সন্দেহ নয়, বিশ্বাস; নিয়ন্ত্রণ নয়, দায়িত্বশীল স্বাধীনতা।

