শুধু যৌনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেই নয়, পুরুষের সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্যও টেস্টোস্টেরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হরমোন। শরীরে এই হরমোনের মাত্রা কমতে শুরু করলে বিভিন্নভাবে তার সংকেত দিতে পারে শরীর। তবে এসব লক্ষণ অনেক সময় খুব সাধারণ হওয়ায় তা সহজেই উপেক্ষিত হয়। চিকিৎসকদের মতে, টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার এসব লক্ষণ সময়মতো শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন পেশির শক্তি, হাড়ের গঠন, মেজাজ, স্মৃতিশক্তি এবং চর্বি জমার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণত ৪০ বছর বয়সের পর থেকে এই হরমোনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ শতাংশ করে এর মাত্রা কমতে পারে। তবে এই হ্রাসের হার ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। সমস্যা হলো, টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার লক্ষণগুলো সবসময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। অনেকেই এগুলোকে বয়স বাড়ার স্বাভাবিক প্রভাব, মানসিক চাপ কিংবা শারীরিক ক্লান্তি হিসেবে ধরে নেন। ফলে শরীরের দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংকেতগুলোও অনেক সময় গুরুত্ব পায় না।
সবসময় ক্লান্তি অনুভব করা, কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা কিংবা হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া— এসব পরিবর্তনকে অনেকেই দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের সাধারণ উপসর্গের আড়ালে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা থাকতে পারে।
টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার শুরুর দিকের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে সবসময় ক্লান্তি অনুভব করা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও শরীরে আগের মতো শক্তি ফিরে না পাওয়া। এর পাশাপাশি যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া, কাজে মনোযোগের ঘাটতি, খিটখিটে মেজাজ কিংবা অবসাদও দেখা দিতে পারে। পেটের চারপাশে মেদ জমা এবং নিয়মিত ব্যায়াম করার পরও পেশির শক্তি কমে যাওয়া টেস্টোস্টেরন হ্রাসের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে এর প্রভাব শুধু বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শরীরের ভেতরেও এর বিভিন্ন প্রভাব পড়তে পারে। পেশির ভর ও শক্তি কমে যেতে পারে এবং শরীরে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিপাকক্রিয়ার গতি ধীর হয়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। এমনকি টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের সম্ভাবনাও বেড়ে যেতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে দৈনন্দিন জীবনযাপনের ধরনও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার জন্য দায়ী হতে পারে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং স্থূলত্ব— এসব টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
এ বিষয়ে এন্ডোক্রিনোলজিস্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার লক্ষণগুলো অনেক সময় এতটাই সাধারণ হয় যে মানুষ এগুলোকে আলাদা কোনো সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেন না। ফলে বিষয়টি গুরুত্ব না পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম থাকলে তা পেশি ও হাড়ের পাশাপাশি হৃদস্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, অনেকেই টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর আশায় বাজারে পাওয়া বিভিন্ন সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর করেন। তবে এসব পণ্যের কার্যকারিতার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং কিছু ক্ষেত্রে এগুলো নিরাপদ নাও হতে পারে। তাই কোনো ধরনের ওষুধ কিংবা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
টেস্টোস্টেরন হ্রাসে শরীরে কী প্রভাব পড়ে
শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। শুরুতে এসব পরিবর্তন খুব বেশি চোখে না পড়লেও সময়ের সঙ্গে তা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পেশির শক্তি ও ভর কমে যাওয়া, শরীরে চর্বি বাড়া, যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া, ক্লান্তি এবং মেজাজের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
টেস্টোস্টেরনের ঘাটতির অন্যতম প্রভাব পড়তে পারে পেশির ওপর। নিয়মিত ব্যায়াম করার পরও আগের মতো পেশির শক্তি বা গঠন ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে শরীরে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়তে পারে, বিশেষ করে পেটের চারপাশে মেদ বাড়তে দেখা যায়। ফলে শরীরের গঠনেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে পারে।
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে যৌনস্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়ে। যৌন আগ্রহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি কিছু পুরুষের ক্ষেত্রে ইরেকশন ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে। শুক্রাণু উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে, ফলে সন্তান ধারণের সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এর প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়তে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, উদ্যম কমে যাওয়া কিংবা অবসাদের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। স্মৃতিশক্তি ও দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো পরিবর্তনও কারও কারও মধ্যে দেখা যেতে পারে।
টেস্টোস্টেরন হাড়ের স্বাস্থ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন এই হরমোনের মাত্রা কম থাকলে হাড়ের ঘনত্ব কমে যেতে পারে। ফলে হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শরীরে টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি থাকলে রক্তস্বল্পতার মতো কিছু সমস্যাও দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি শরীরের বিপাকক্রিয়া, ওজন এবং সামগ্রিক শক্তির মাত্রার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে এসব উপসর্গের সবগুলোই যে টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার কারণে হবে, এমন নয়। অন্যান্য শারীরিক সমস্যা, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ কিংবা জীবনযাপনের কারণেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
তাই শুধু উপসর্গ দেখে টেস্টোস্টেরন কমে গেছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এ ধরনের একাধিক লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা যাচাই করে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণ চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু হরমোনের মাত্রা বাড়ানোর চেষ্টা না করে এর পেছনে থাকা কারণের চিকিৎসা করাই বেশি কার্যকর। তাই নিজের ইচ্ছায় হরমোন, ওষুধ বা কোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

