ক্ষমতা বলতে আমরা সাধারণত একজন শাসক, একটি সিংহাসন কিংবা দৃশ্যমান কোনো কর্তৃত্বের কথা ভাবি। ইতিহাসের রাজা-বাদশাহদের ছবিতে সেই ক্ষমতার প্রতীক ছিল তরবারি, সেনাবাহিনী কিংবা প্রাসাদ।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী লেখক ফ্রানৎস কাফকা এই ধারণাকে আমূল বদলে দেন। তাঁর মতে, আধুনিক ক্ষমতার কোনো নির্দিষ্ট মুখ নেই, দৃশ্যমান কেন্দ্রও নেই। বরং তা ছড়িয়ে থাকে নিয়ম, দাপ্তরিক প্রক্রিয়া, নথিপত্র এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে। এই কারণেই কাফকার সাহিত্য শুধু গল্প নয়; আধুনিক সমাজ ও ক্ষমতার কাঠামো বোঝার এক অনন্য উপায়।
অদৃশ্য ক্ষমতার ফাঁদ:
কাফকার বিখ্যাত উপন্যাস দ্য ট্রায়াল-এ জোসেফ কে. একদিন ঘুম থেকে উঠে জানতে পারে, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু তার অপরাধ কী, অভিযোগ কোথা থেকে এসেছে কিংবা বিচার কোথায় হবে—কোনো প্রশ্নেরই স্পষ্ট উত্তর সে পায় না।
সে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরে বেড়ায়। প্রতিটি কর্মকর্তার পেছনে আরেকজন কর্মকর্তা, প্রতিটি দরজার পর আরেকটি দরজা। শেষ পর্যন্ত তার জীবন শেষ হয়, কিন্তু রহস্যের সমাধান হয় না।
এই উপন্যাস দেখায়, যখন ক্ষমতার উৎস অদৃশ্য হয়ে যায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের চেনা যায় না, তখন প্রতিরোধও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ মানুষ জানেই না, তার প্রশ্ন কাকে করা উচিত।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো পরে আধুনিক নজরদারি রাষ্ট্র নিয়ে যে বিশ্লেষণ দেন, তার সঙ্গে কাফকার এই সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ফুকো দেখিয়েছিলেন, আধুনিক সমাজে মানুষ অনেক সময় নিজেই নিজের ওপর নজরদারি চালাতে শুরু করে। কাফকা সেই মানসিক অবস্থার মানবিক অভিজ্ঞতাকে গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
দ্য মেটামরফোসিস-এ গ্রেগর সামসা এক সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে একটি বিশাল পোকা হিসেবে আবিষ্কার করে। এই রূপান্তর বাস্তবের নয়, বরং একটি গভীর প্রতীক।
গ্রেগর ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। যতদিন সে কাজ করেছে, ততদিন পরিবার তার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু কাজ করার ক্ষমতা হারানোর পর সে পরিবারের কাছে বোঝায় পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু যেন অন্যদের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কাফকা এখানে এমন এক সমাজের চিত্র এঁকেছেন, যেখানে মানুষের মূল্য অনেক সময় তার উৎপাদনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। এই ভাবনা কার্ল মার্ক্সের বিচ্ছিন্নতা বা Alienation ধারণার সঙ্গেও সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে শ্রম ও মানবিকতা ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যায়।
ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস দ্য ক্যাসেল-এ একজন ব্যক্তি একটি দুর্গে পৌঁছানোর চেষ্টা করে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র বলে মনে করা হয়। কিন্তু সে কখনো সেখানে পৌঁছাতে পারে না।দুর্গটি সব সময় সামনে থাকলেও অধরা থেকে যায়।
এই উপন্যাসে কাফকা বোঝাতে চেয়েছেন, আধুনিক ক্ষমতা এমন এক কাঠামো, যার অস্তিত্ব সবাই অনুভব করে, কিন্তু তার প্রকৃত কেন্দ্র কোথায়, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না।
ফ্রানৎস কাফকা ও আলবেয়ার কামু—দুজনই মানুষের অস্তিত্ব ও অর্থহীনতার প্রশ্ন নিয়ে লিখেছেন। তবে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।
কামুর মতে, মানুষ অর্থ খোঁজে, কিন্তু পৃথিবী নীরব থাকে। এই সংঘাত থেকেই জন্ম নেয় বিদ্রোহ। দ্য মিথ অব সিসিফাস-এ তিনি দেখান, সিসিফাস বারবার পাথর ঠেলেও তার সংগ্রামের অর্থ নিজেই তৈরি করে।
অন্যদিকে কাফকার চরিত্রগুলো প্রতিনিয়ত লড়াই করতে চাইলেও জানে না, আসলে কার বিরুদ্ধে লড়বে। তাদের সামনে এমন একটি ব্যবস্থা, যার কোনো দৃশ্যমান মুখ নেই। ফলে প্রতিরোধও হয়ে ওঠে অস্পষ্ট ও ব্যর্থ।
তবে দুই লেখকের মিলও রয়েছে। দুজনই মনে করেন, অর্থহীনতার মুখোমুখি হলে মানুষ হয় আত্মসমর্পণ করে, নয়তো প্রশ্ন করতে থাকে। উত্তর না মিললেও প্রশ্ন করাটাই মানবিকতার অংশ।
আজ ‘কাফকায়েস্ক’ শব্দটি শুধু সাহিত্যিক পরিভাষা নয়; এটি একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার নাম। ধরা যাক, কোনো সরকারি অফিসে একটি কাজ করতে গিয়ে আপনাকে এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে পাঠানো হচ্ছে। এক জায়গায় বলা হলো একটি ফর্ম লাগবে, অন্য জায়গায় জানানো হলো সেই ফর্ম নির্দিষ্ট দিনে দেওয়া হয়, আবার আরেক দপ্তর নতুন নথি চাইলো।
প্রতিটি নিয়ম আলাদা করে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও পুরো প্রক্রিয়াটি হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য ও ক্লান্তিকর। এটাই কাফকার ভাষায় আধুনিক আমলাতান্ত্রিক বাস্তবতা।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতেও কাফকার পর্যবেক্ষণ বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক। ধরুন, হঠাৎ আপনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেল। জানানো হলো, কমিউনিটি নীতিমালা লঙ্ঘন হয়েছে। কিন্তু কোন নীতিমালা ভাঙা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। আপিল করলেও কেবল স্বয়ংক্রিয় বার্তা আসে। কোনো মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগও থাকে না।
এই অভিজ্ঞতা অনেকটাই দ্য ট্রায়াল-এর জোসেফ কে.-এর অবস্থার সঙ্গে মিলে যায়—অভিযোগ আছে, বিচার চলছে, কিন্তু বিচারক কে বা প্রক্রিয়া কী, তা অজানা।
একইভাবে কর্মক্ষেত্রেও প্রযুক্তির প্রভাব নতুন ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। কোনো কর্মী বহু বছর কাজ করার পর জানতে পারে, তার দায়িত্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পালন করবে। সে হয়তো পোকায় রূপান্তরিত হয়নি, কিন্তু নিজের গুরুত্ব হারানোর অনুভূতি গ্রেগর সামসার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজে দেয়।
কাফকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সম্ভবত মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে। জোসেফ কে. ধীরে ধীরে নিজেই সন্দেহ করতে শুরু করে, হয়তো সত্যিই সে কোনো অপরাধ করেছে।
ডিজিটাল যুগেও একই প্রবণতা দেখা যায়। মানুষ জানে তার অনলাইন কার্যক্রম কোথাও না কোথাও সংরক্ষিত হচ্ছে। ফলে অনেকেই কোনো নির্দেশ ছাড়াই নিজেকে সীমাবদ্ধ করতে শুরু করে। কিছু বিষয় আর খোঁজে না, কিছু মত প্রকাশ করে না, কিছু প্রশ্নও তোলে না। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই আধুনিক ক্ষমতার একটি সূক্ষ্ম রূপ।
কাফকার সাহিত্যে মুক্তির পথ খুব কমই দেখা যায়। তাঁর অধিকাংশ চরিত্র শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। এই কারণে অনেকেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে অতিরিক্ত হতাশাবাদী বলে মনে করেন।
তবু এখানেই তাঁর সততা। তিনি সহজ আশার গল্প বলেননি; বরং এমন এক বাস্তবতার ছবি এঁকেছেন, যেখানে মানুষ প্রায়ই এমন ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়, যার ব্যাখ্যা সে জানে না।
এই কারণেই কাফকার পাশাপাশি কামুকে পড়ার গুরুত্ব রয়েছে। একজন দেখান ক্ষমতার কাঠামো কতটা জটিল হতে পারে, অন্যজন দেখান সেই বাস্তবতার মধ্যেও মানুষের প্রতিরোধের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না।
ফ্রানৎস কাফকা মৃত্যুর আগে তাঁর বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু ব্রড সেই নির্দেশ মানেননি। তাঁর সিদ্ধান্তের ফলেই দ্য ট্রায়াল, দ্য ক্যাসেলসহ কাফকার বহু রচনা বিশ্বসাহিত্যের অংশ হয়ে ওঠে। বিদ্রূপের বিষয় হলো, নিজের ইচ্ছা পূরণ না হলেও সেই ঘটনাই কাফকাকে অমর করে রেখেছে।
আজ যখন কোনো সিদ্ধান্তের কারণ জানা যায় না, কোনো নিয়মের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না কিংবা একটি জটিল ব্যবস্থার ভেতর মানুষ নিজেকে অসহায় মনে করে, তখন কাফকার সাহিত্য নতুন করে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
তিনি আমাদের শেখান, সব প্রশ্নের উত্তর নাও মিলতে পারে। তবু প্রশ্ন করা বন্ধ করা উচিত নয়। আর সেই জায়গাতেই কাফকা ও কামুর ভাবনা এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়—অর্থহীনতার মধ্যেও মানুষ প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারায় না, আর সেই ক্ষমতাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
- কুলদা রায়: লেখক ও শিক্ষক।

