কিছু কিছু প্রেমের গল্প শেষ হয়ে যায় না। মানুষ দূরে সরে যায়, সময় পেরিয়ে যায়, জীবন অন্যদিকে বাঁক নেয়—তবু কোনো এক গভীর স্মৃতির ভেতর সেই গল্প বেঁচে থাকে। মৈত্রেয়ী দেবীর জীবনও যেন তেমনই এক দীর্ঘ গল্প, যার এক প্রান্তে প্রেম, অন্য প্রান্তে সাহিত্য; কোথাও রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য, কোথাও সমাজের মানুষের জন্য ছুটে চলা। আর সেই জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সাহিত্যিক প্রকাশ—‘ন হন্যতে’।
মৈত্রেয়ী দেবী জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে। তখন ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের অধীন। তার বাবা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ছিলেন দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক; মা সুরমা দেবী ছিলেন ভারতের প্রথম দিককার নারী ডক্টরেটদের একজন। এমন এক পরিবারে বেড়ে ওঠার ফলে বই, দর্শন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি তার কাছে বাইরের কোনো জগত ছিল না—শৈশব থেকেই এগুলো ছিল তার ঘরেরই অংশ।
তবে তার শৈশবের স্মৃতিতে শুধু বই আর বিদ্যার জগৎ ছিল না। বরিশালের আগৈলঝাড়ার গৈলা গ্রামের প্রকৃতি ও মানুষের জীবনও তার মানসগঠনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি যতই বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, নিজের শিকড়ের সেই মাটির গন্ধ তার ভেতর থেকে হারিয়ে যায়নি।
মাত্র ষোলো বছর বয়সেই তার সাহিত্যজীবনের শুরু। ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উদিত’। বিস্ময়ের বিষয়, বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা সাহিত্যের তখনকার আকাশে রবীন্দ্রনাথ সূর্যের মতো; সেই আকাশে এক কিশোরী কবির প্রথম বইয়ের পাশে তার আশীর্বাদ হয়ে থাকা নিঃসন্দেহে ছিল অসাধারণ ঘটনা।
মৈত্রেয়ী শুধু কবিতা লিখেই থেমে থাকেননি। দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৩৬ সালে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তার চিন্তার জগতে এই শিক্ষারও প্রভাব পড়েছিল। ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, মানুষের অস্তিত্ব ও জীবনের অর্থ নিয়ে তার লেখায় যে গভীর অনুসন্ধান দেখা যায়, তার পেছনে এই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির ভূমিকা ছিল।
কিন্তু মৈত্রেয়ী দেবীর জীবনকে যে ঘটনাটি পরবর্তী সময়ে অন্য মাত্রা দেয়, তা প্রেমের।
যৌবনে তার পরিচয় হয় বিদেশি পণ্ডিত মির্চা এলিয়াদের সঙ্গে। সেই সম্পর্ক গভীর হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ের ভারতীয় সমাজ ও পারিবারিক বাস্তবতা এমন সম্পর্ককে সহজভাবে গ্রহণ করার মতো ছিল না। পরিবারে এই সম্পর্ক আলোড়ন তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৪ সালে তার বিয়ে হয় বিজ্ঞানী মনোমোহন সেনের সঙ্গে।
জীবন তখন যেন অন্য পথে এগিয়ে গেল।
মনোমোহন সেন ছিলেন বিজ্ঞানী এবং মংপুর সিনকোনা কারখানার ব্যবস্থাপক। সিনকোনা থেকে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী ওষুধ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে তিনি গবেষণা করতেন। স্বামীর কর্মসূত্রে মৈত্রেয়ী দেবীর জীবনে আসে মংপু—পাহাড়, মেঘ, বৃষ্টি আর নিস্তব্ধতার এক অন্য পৃথিবী।
আর সেই মংপুতেই তার জীবনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
মৈত্রেয়ীর আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে চারবার মংপুতে গিয়েছিলেন। কবির সঙ্গে তার আলাপ, কথোপকথন, একসঙ্গে কাটানো সময়—সবকিছুই পরবর্তীতে তার স্মৃতির অমূল্য সম্পদ হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ তখন বাংলা সাহিত্যের মহীরুহ, আর মৈত্রেয়ী ছিলেন তার স্নেহভাজন এক তরুণ লেখক। সেই সান্নিধ্যকে তিনি শুধু স্মৃতিতে রেখে দেননি, শব্দে ধরে রেখেছেন।
১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয় ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’। বইটি পড়লে রবীন্দ্রনাথকে শুধু কবি হিসেবে নয়, একজন জীবন্ত মানুষ হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়। তার কথাবার্তা, অভ্যাস, রসবোধ, চিন্তা—সবকিছু মৈত্রেয়ীর স্মৃতির ভেতর দিয়ে নতুন আলোয় ধরা পড়ে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পরবর্তীতেও তিনি লিখেছেন—‘স্বর্গের কাছাকাছি’, ‘কবি সার্বভৌম’, ‘রবীন্দ্রনাথ গৃহে ও বিশ্বে’সহ একাধিক গ্রন্থ।
তবে মৈত্রেয়ী দেবীর সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক পরিচয় তৈরি হয় আরও পরে।
‘ন হন্যতে’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে।
একটি পুরোনো প্রেম, এক অসম্পূর্ণ সম্পর্ক, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান এবং স্মৃতির গভীরে চাপা পড়ে থাকা অনুভূতি—এসবকে অবলম্বন করে লেখা এই আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ আলোড়ন তোলে।
‘ন হন্যতে’—অর্থাৎ যাকে হ*ত্যা করা যায় না, যে বিনষ্ট হয় না।
নামটিই যেন পুরো বইটির দর্শন।
প্রেম কি সত্যিই শেষ হয়ে যায়? মানুষ কি কাউকে জীবন থেকে সরিয়ে দিলেই তার স্মৃতি মুছে ফেলতে পারে? সময় কি অনুভূতিকে হ*ত্যা করতে পারে? মৈত্রেয়ী দেবী এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি; বরং নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যে রূপ দিয়ে পাঠককে সেই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড় করিয়েছেন।
‘ন হন্যতে’ তাই নিছক প্রেমের উপন্যাস নয়। ব্যক্তিগত জীবনের ভেতর দিয়ে এখানে উঠে এসেছে ঔপনিবেশিক ভারতের সমাজ, সংস্কৃতির সংঘাত, নারীজীবনের সীমাবদ্ধতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং মানুষের মনের জটিলতা। নিজের জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত অধ্যায়কে তিনি এমনভাবে সাহিত্যে রূপ দিয়েছিলেন যে তা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত থাকেনি—তা হয়ে উঠেছিল বহু মানুষের অনুভূতির গল্প।
১৯৭৫ সালে ভারতীয় লেখিকা সংঘের পক্ষ থেকে ‘ন হন্যতে’-র জন্য তিনি সম্মান পান। পরের বছর, ১৯৭৬ সালে, এই উপন্যাসের জন্য তিনি লাভ করেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। বইটি পরে ইংরেজিতেও অনূদিত হয়।
কিন্তু মৈত্রেয়ী দেবীর জীবন কেবল সাহিত্য আর ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্যে আটকে থাকেনি।
তার ভেতরে ছিল সমাজের জন্য কিছু করার তাগিদ।
১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দা*ঙ্গা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘কাউন্সিল ফর প্রমোশন অব কমিউনাল হারমনি’। মানুষের পরিচয়কে ধর্মের দেয়ালে আটকে না রেখে সম্প্রীতির সমাজ গড়ার পক্ষে তিনি কাজ করেন।
বিশ্বের নানা দেশেও তিনি শান্তি ও মানবিকতার কথা বলেছেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। বিভিন্ন দেশে রবীন্দ্রনাথ এবং বিশ্বশান্তির প্রশ্নে বক্তৃতা দেন। তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী পদকে সম্মানিত করে।
এরপর আসে ১৯৭১।
বাংলাদেশের মুক্তিযু*দ্ধ শুরু হলে মৈত্রেয়ী দেবী নীরব থাকেননি। ভারতের বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়ে তিনি বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার সংগ্রামের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে কাজ করেন।
তবে তার ভূমিকা শুধু বক্তৃতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ ছিল না।
কলকাতা থেকে দূরে বাদু গ্রামে প্রায় ৯ বিঘা জমির ওপর তিনি গড়ে তোলেন একটি সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগ। সেখানে কৃষিকাজ, মাছ চাষ, মৌমাছি পালন, গরু ও হাঁস পালনের ব্যবস্থা ছিল। শরণার্থী শিবিরের অনাথ শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘খেলাঘর’। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে ঘরহারা শিশুদের জন্য এই উদ্যোগ ছিল তার মানবিকতার এক বাস্তব প্রকাশ।
একজন লেখক মানুষের দুঃখ নিয়ে লিখতে পারেন। কিন্তু মৈত্রেয়ী দেবী শুধু লেখেননি—দুঃখী মানুষের কাছে গিয়েছেন, তাদের জন্য কাজও করেছেন।
১৯৭৭ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। সাহিত্যিক হিসেবে সাহিত্য অকাদেমি, আর সমাজসেবী হিসেবে পদ্মশ্রী—দুটি স্বীকৃতিই যেন তার জীবনের দুই দিককে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেয়।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ‘খেলাঘর’-এর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। মানুষের জন্য কাজ করাই যেন তার কাছে সাহিত্যেরই আরেক রূপ ছিল। একদিকে তিনি লিখেছেন মানুষের মনের অদৃশ্য ক্ষত নিয়ে, অন্যদিকে বাস্তব জীবনে চেষ্টা করেছেন মানুষের ক্ষত সারাতে।
১৯৯০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় মৈত্রেয়ী দেবীর মৃ*ত্যু হয়।
তার জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধা।

