বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৮৭৬ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যিক তাঁর অসাধারণ গল্প, মানবিক চরিত্র ও সমাজবাস্তবতার চিত্রণের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রায় এক শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
শরৎচন্দ্রের অসংখ্য সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যে ‘দেবদাস’ সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং চলচ্চিত্রে সবচেয়ে বেশি ফিরে আসা একটি চরিত্র। প্রেম, ব্যর্থতা, অহংকার, অনুশোচনা ও আত্মবিধ্বংসী যন্ত্রণার এক জটিল মানবিক রূপ হিসেবে দেবদাস আজও দর্শকের কাছে পরিচিত। এই উপন্যাস অবলম্বনে উপমহাদেশে বিভিন্ন ভাষায় বহু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশেও নির্মিত হয়েছে দুটি সিনেমা, যেখানে দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করেছেন দুই প্রজন্মের দুই জনপ্রিয় অভিনেতা—বুলবুল আহমেদ ও শাকিব খান।
‘দেবদাস’ মূলত একটি অসম্পূর্ণ প্রেমের গল্প। দেবদাস ও পার্বতী একে অন্যকে ভালোবাসলেও পারিবারিক অবস্থান, সামাজিক প্রথা ও নিজেদের দুর্বলতার কারণে তাদের সম্পর্ক পূর্ণতা পায় না। নিজের ভালোবাসার পক্ষে সময়মতো দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে না পারাই দেবদাসের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়। পরে যখন সে নিজের ভুল বুঝতে পারে, তখন আর কিছুই ফিরে পাওয়ার সুযোগ থাকে না।
শরৎচন্দ্রের এই গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর চরিত্রগুলোর মানবিক দুর্বলতা। দেবদাসের দ্বিধা, পার্বতীর আত্মসম্মান এবং চন্দ্রমুখীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা—সবকিছু মিলিয়ে গল্পটি শুধু একটি প্রেমকাহিনি নয়, বরং মানুষের আবেগ ও সিদ্ধান্তের জটিলতার প্রতিচ্ছবি। এ কারণেই সময়ের পরিবর্তন হলেও ‘দেবদাস’ বারবার নতুন করে দর্শকের কাছে ফিরে আসে।
বুলবুল আহমেদের দেবদাস
বাংলাদেশে প্রথমবার বড় পর্দায় শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ নিয়ে আসেন নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম। ১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করেন বুলবুল আহমেদ। পার্বতীর ভূমিকায় ছিলেন কবরী এবং চন্দ্রমুখীর চরিত্রে অভিনয় করেন আনোয়ারা।
বুলবুল আহমেদের অভিনয়ে দেবদাস চরিত্র পেয়েছিল গভীর আবেগ ও বিষণ্ণতার এক অনন্য প্রকাশ। তাঁর সংলাপ বলার ধরন, চোখের অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল।
এই সিনেমায় কবরীর পার্বতী চরিত্রে দেখা গেছে ভালোবাসার পাশাপাশি আত্মসম্মানের দৃঢ়তা। অন্যদিকে আনোয়ারার চন্দ্রমুখী হয়ে উঠেছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মানবিকতার প্রতীক।
১৯৮২ সালের ‘দেবদাস’ শুধু একটি প্রেমের গল্পের চলচ্চিত্রায়ন ছিল না; এটি ছিল শরৎচন্দ্রের আবেগঘন চরিত্রগুলোকে ঢাকাই সিনেমার নিজস্ব ভাষায় তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস।
শাকিব খানের দেবদাস
দীর্ঘ সময় পর আবারও ঢাকাই সিনেমায় ফিরে আসে শরৎচন্দ্রের অমর সৃষ্টি ‘দেবদাস’। ২০১৩ সালে নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম দ্বিতীয়বারের মতো এই উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এবার দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করেন শাকিব খান। পার্বতীর চরিত্রে ছিলেন অপু বিশ্বাস এবং চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় অভিনয় করেন মৌসুমী।
শাকিব খানের জন্য দেবদাস চরিত্র ছিল তাঁর প্রচলিত বাণিজ্যিক সিনেমার চরিত্রগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি অভিনয়ের সুযোগ। চরিত্রটির আবেগ, হতাশা ও মানসিক দ্বন্দ্ব তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি।
পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে শাকিব খান জানিয়েছিলেন, ‘দেবদাস’ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া একজন অভিনেতার জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা। তবে সিনেমাটির শুটিংয়ের সময় তিনি একই সঙ্গে একাধিক চলচ্চিত্রের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ফলে চরিত্রটির জন্য যতটা প্রস্তুতি ও সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা পুরোপুরি দিতে পারেননি বলে তিনি মনে করেন।
শাকিবের মতে, ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে তিনি আবারও দেবদাস চরিত্রে নতুনভাবে অভিনয় করতে চান। আরও বেশি প্রস্তুতি নিয়ে চরিত্রটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
দেবদাস কেন এখনো জনপ্রিয়?
প্রায় এক শতাব্দী পরও দেবদাস চরিত্র মানুষের মনে জায়গা ধরে রেখেছে, কারণ এটি শুধু একটি ব্যর্থ প্রেমের গল্প নয়। এটি মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত, সামাজিক বাধা, আত্মসম্মান, ভালোবাসা ও অনুশোচনার গল্প।
দেবদাসের মধ্যে যেমন আছে দুর্বলতা, তেমনি আছে বাস্তব জীবনের অনেক মানুষের পরিচিত এক মানসিক দ্বন্দ্ব। পার্বতীর মধ্যে আছে ভালোবাসার সঙ্গে আত্মমর্যাদার লড়াই, আর চন্দ্রমুখীর মধ্যে রয়েছে নিঃশর্ত ভালোবাসার মানবিক সৌন্দর্য।
এই কারণেই শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ শুধু একটি উপন্যাস নয়, বরং বাংলা সংস্কৃতির এক দীর্ঘস্থায়ী আবেগের নাম। ঢাকাই সিনেমায় বুলবুল আহমেদ ও শাকিব খানের অভিনয় সেই আবেগকে দুই ভিন্ন সময়ে দুই ভিন্ন প্রজন্মের দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

