প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের পৃথিবী ছিল ভাঙন, অনিশ্চয়তা, হতাশা আর আধ্যাত্মিক শূন্যতায় আচ্ছন্ন। পুরোনো বিশ্বাসগুলো নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল, সভ্যতার অগ্রগতির আত্মবিশ্বাসে দেখা দিয়েছিল গভীর ফাটল। সেই অস্থির সময়ের মানসিক ভূগোলকে কবিতায় সবচেয়ে গভীরভাবে ধারণ করা কবিদের একজন টি. এস. ইলিয়ট।
আধুনিক মানুষের একাকিত্ব, সংশয়, বিচ্ছিন্নতা, বিশ্বাসের সংকট এবং ভেঙে পড়া সভ্যতার প্রতিচ্ছবি তার কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। তাই বিংশ শতাব্দীর আধুনিকতাবাদী কবিতার ইতিহাসে টি. এস. ইলিয়ট একটি অনিবার্য নাম।
টমাস স্টার্নস ইলিয়ট জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইসে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর তিনি প্যারিসের সরবোন এবং অক্সফোর্ডের মার্টন কলেজে দর্শন নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৪ সালে তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান। এরপর জীবনের বড় অংশ সেখানেই কাটান। ১৯২৭ সালে গ্রহণ করেন ব্রিটিশ নাগরিকত্ব।
১৯১৫ সালে প্রকাশিত ‘দ্য লাভ সং অব জে. আলফ্রেড প্রুফ্রক’ তাকে সাহিত্যজগতে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ (১৯২২), ‘দ্য হলো মেন’ (১৯২৫), ‘অ্যাশ ওয়েনসডে’ (১৯৩০) এবং ‘ফোর কোয়ার্টেটস’ (১৯৪৩)।
বিশেষ করে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ আধুনিক কবিতার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী রচনা। যুদ্ধোত্তর ইউরোপের মানসিক বিপর্যয়, সাংস্কৃতিক পতন এবং মানুষের আত্মিক নিঃসঙ্গতা এই কবিতায় যেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ভাষা পেয়েছে। আর ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-কে ইলিয়ট নিজেই তার শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে বিবেচনা করতেন।
তার কবিতার একটি বিখ্যাত পঙ্ক্তি—
“I have measured out my life with coffee spoons.”
বাংলায় যার ভাবার্থ দাঁড়ায়—
“আমি কফির চামচ দিয়ে মেপে মেপে আমার জীবন কাটিয়েছি।”
এই একটি পঙ্ক্তিতেই যেন আধুনিক মানুষের খণ্ডিত, পরিমিত ও অর্থহীন হয়ে পড়া জীবনের এক গভীর প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে।
কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ, সাহিত্য সমালোচনা, নাটক ও সম্পাদনার ক্ষেত্রেও ইলিয়ট ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ‘মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল’ এবং ‘দ্য ককটেল পার্টি’ তার উল্লেখযোগ্য নাটক। সাহিত্য সাময়িকী ‘দ্য ক্রাইটেরিয়ন’ সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ফ্যাবার অ্যান্ড ফ্যাবার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ব্যক্তিজীবনেও ইলিয়টের জীবন ছিল নানা টানাপোড়েনে ভরা। প্রথম স্ত্রী ভিভিয়েন হেই-উডের সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। ১৯৩৩ সালের পর তারা পৃথকভাবে বসবাস করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি এসমে ভ্যালেরি ফ্লেচারকে বিয়ে করেন।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৪৮ সালে টি. এস. ইলিয়ট লাভ করেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। একই বছর তিনি পান অর্ডার অব মেরিট। ১৯৬৪ সালে তাকে দেওয়া হয় প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম।
১৯৬৫ সালের ৪ জানুয়ারি লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন আধুনিক কবিতার এই অন্যতম প্রধান নির্মাতা।
ইলিয়ট এমন এক সময়ের কবি, যখন মানুষ সভ্যতার অগ্রগতির মাঝেও নিজের ভেতর ক্রমশ আরও একা হয়ে পড়ছিল। তার কবিতা সেই একাকিত্বকে শুধু ভাষা দেয়নি—প্রশ্ন করেছে বিশ্বাসকে, সভ্যতাকে, সময়কে এবং মানুষ নিজেকেই।
টি. এস. ইলিয়টের জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা।

