জন্মদিনে স্মরণ | ১৫ অক্টোবর ২০২৬
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ফরাসি দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ মিশেল ফুকোর জন্মদিন আজ। ১৯২৬ সালের ১৫ অক্টোবর ফ্রান্সের পোয়াতিয়ে শহরে তাঁর জন্ম, আর ১৯৮৪ সালের ২৫ জুন প্যারিসে মৃত্যু। দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, রাজনৈতিক চিন্তা ও সাহিত্যতত্ত্বে তাঁর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
মূল প্রশ্ন
জ্ঞান কীভাবে তৈরি হয়, ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, আর কোন প্রক্রিয়ায় কিছু মানুষ ও আচরণকে স্বাভাবিক, অন্যদের অস্বাভাবিক বলা হয়, এসব প্রশ্ন ফুকো নতুনভাবে সামনে এনেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, জ্ঞান নিছক নিরপেক্ষ সত্যের অনুসন্ধান নয়। কোনটি জ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে, কার কথা গ্রহণযোগ্য হবে, কোন ধারণা প্রান্তে সরে যাবে, তার সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক আছে।
তাঁর বিশ্লেষণে ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্র বা শাসকের হাতে কেন্দ্রীভূত নয়। পরিবার, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, কারাগার ও দৈনন্দিন সম্পর্কের মধ্য দিয়েও তা কাজ করে। ক্ষমতা শুধু নিষেধ আরোপ করে না, মানুষের আচরণ, চিন্তা ও আত্মপরিচয়ও গড়ে তোলে।
উল্লেখযোগ্য কাজ
- পাগলামির ইতিহাস (১৯৬১): মানসিক অসুস্থতার সংজ্ঞা কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফল নয়। এর পেছনে কাজ করে সামাজিক মূল্যবোধ, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতা। সমাজ কাদের স্বাভাবিক বলে মানে এবং কাদের আলাদা করে রাখে, সেটাই ছিল তাঁর প্রশ্ন।
- শব্দ ও বস্তু (১৯৬৬): এই বই তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। ‘এপিস্তেমে’ ধারণার মাধ্যমে তিনি দেখান, প্রতিটি যুগে জ্ঞান উৎপাদন ও সত্য নির্ধারণের নির্দিষ্ট শর্ত থাকে। তাই জ্ঞানের ইতিহাস সরলরেখায় এগোনো অগ্রগতির গল্প নয়। যুগে যুগে চিন্তার ভিত্তিই বদলে যায়।
- শৃঙ্খলা ও শাস্তি: আধুনিক কারাগার ও শাস্তিব্যবস্থার বিকাশ বিশ্লেষণ করে তিনি দেখান, আধুনিক ক্ষমতা কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেয় না। পর্যবেক্ষণ, শ্রেণিবিন্যাস, প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানুষকে নির্দিষ্ট আচরণে অভ্যস্ত করে তোলে। সময়সূচি, নিয়ম, পরীক্ষা ও নথিপত্রের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও সেনাবাহিনীতেও তা কার্যকর থাকে।
- জৈবক্ষমতা: আধুনিক রাষ্ট্র ব্যক্তির শরীর ও জনসংখ্যাকে পরিচালনার বিষয় হিসেবে দেখে। জন্ম, মৃত্যু, স্বাস্থ্য, রোগ ও জনসংখ্যা তখন প্রশাসনিক জ্ঞান ও নীতির অংশ হয়ে ওঠে।
- যৌনতার ইতিহাস (গ্রন্থমালা): আধুনিক সমাজে যৌনতা কেবল দমন করা হয়েছে, এই প্রচলিত ধারণাকে তিনি প্রশ্ন করেন। চিকিৎসা, মনোবিজ্ঞান, আইন, ধর্ম ও রাষ্ট্রের আলোচনাই যৌন পরিচয় ও আচরণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করেছে বলে তিনি দেখান।
পদ্ধতি: বংশানুসন্ধান
ফুকোর ‘জিনিয়ালজি’ বা বংশানুসন্ধান পদ্ধতিতে কোনো ধারণাকে চিরন্তন বা স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয় না। খোঁজা হয়, কোন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে সেটি তৈরি হলো, কোন দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা পেল এবং সামাজিক কর্তৃত্বের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলো। এতে ইতিহাস মহান ব্যক্তির কাহিনি না হয়ে প্রান্তিক অভিজ্ঞতা, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার পরিবর্তনের বিশ্লেষণ হয়ে ওঠে।
পরিচয় ও প্রভাব
ফুকোকে প্রায়ই কাঠামোবাদী বা উত্তর-কাঠামোবাদী বলা হয়, কিন্তু তিনি নিজে এসব পরিচয় সহজে মেনে নেননি। সর্বজনীন তত্ত্ব গড়ার চেয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জ্ঞান, ক্ষমতা ও মানুষের পরিচয়ের গড়ে ওঠা বোঝাতেই তাঁর আগ্রহ ছিল। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি কলেজ দ্য ফ্রান্সে চিন্তাব্যবস্থার ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। দর্শনের পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আইন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক গবেষণায় তাঁর প্রভাব গভীর।
মৃত্যুর চার দশক পরও নজরদারি, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসাব্যবস্থা, যৌনতা, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও জ্ঞান উৎপাদনের রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় তাঁর ধারণা বারবার ফিরে আসে।
সমাপনী মূল্যায়ন ফুকোর গুরুত্ব কেবল
ক্ষমতার সমালোচনায় নয়। তিনি শিখিয়েছেন, আমাদের পরিচিত সত্য ও স্বাভাবিক বলে মানা ধারণাগুলোরও ইতিহাস আছে। কোনো প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ দাবি করলেই ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত হয় না, আর কোনো ধারণা প্রচলিত হলেই চিরন্তন সত্য হয়ে যায় না। সমাজকে বুঝতে হলে শুধু কে শাসন করছে তা দেখলে চলে না। দেখতে হয়, জ্ঞান কীভাবে তৈরি হচ্ছে, নিয়ম কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, আর মানুষ সেই নিয়মের মধ্য দিয়ে কীভাবে নিজেদের বুঝতে শিখছে।
জন্মদিনে মিশেল ফুকোর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা।

