বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার প্রসারে যাঁরা পথ দেখিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মাতৃভাষায় শিক্ষার বিস্তার ছাড়া একটি জাতির প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তোলা এবং বাংলাকে বিজ্ঞানচর্চার উপযোগী ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
মাতৃভাষায় শিক্ষার দৃঢ় প্রত্যয়
ইংরেজি ভাষার প্রভাব ও শিক্ষায় বাঙালির পিছিয়ে পড়ার বাস্তবতা উপলব্ধি করে কুদরাত-এ-খুদা বাংলা ভাষায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চার পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর এই চিন্তার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শন।
১৯৩৬ সালে তৎকালীন সরকারের শিক্ষা সপ্তাহ উদ্যাপনের দায়িত্বে ছিলেন কুদরাত-এ-খুদা। ওই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ‘শিক্ষার সাঙ্গীকরণ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। সেখানে তিনি মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মাতৃভাষা ছাড়া শিক্ষা পূর্ণতা লাভ করে না।
এই দর্শন কুদরাত-এ-খুদার চিন্তা ও কর্মকে আরও অনুপ্রাণিত করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিদেশি ভাষার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলায় বিজ্ঞান ও শিক্ষার প্রসার ঘটাতে পারলেই জ্ঞানচর্চা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার বিস্তার
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় ও সহজবোধ্য করে তুলতে কুদরাত-এ-খুদা নিজেই বহু গুরুত্বপূর্ণ বই রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- বিজ্ঞানের সরস কাহিনী
- বিজ্ঞানের সূচনা
- জৈব রসায়ন (চার খণ্ড)
- পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প সম্ভাবনা
- পরমাণু পরিচিতি
- বিজ্ঞানের পহেলা কথা
তাঁর লেখা ‘যুদ্ধোত্তর বাংলার কৃষি ও শিল্প’ বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত হয়। ‘বিজ্ঞানের বিচিত্র কাহিনী’ স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের তালিকায় স্থান পেয়েছিল। এসব রচনার মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানকে শুধু উচ্চশিক্ষার পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
বিজ্ঞান সাময়িকী প্রকাশে উদ্যোগ
বিজ্ঞানচর্চাকে আরও গতিশীল করতে তিনি বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) থেকে ১৯৬৩ ও ১৯৭২ সালে ‘পুরোগামী বিজ্ঞান’ এবং ‘বিজ্ঞানের জয়যাত্রা’ নামে দুটি বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন।
তাঁর এই উদ্যোগ ছিল বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের পাশাপাশি বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও গবেষণার প্রসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণায় স্বীকৃতি
বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘তামগা-ই-পাকিস্তান’ ও ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাবে ভূষিত করে।
স্বাধীন বাংলাদেশেও তাঁর অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়। ১৯৭৬ সালে তিনি একুশে পদক এবং ১৯৮৪ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হন।
ড. কুদরাত-এ-খুদা ১৯৭৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর রেখে যাওয়া গবেষণা, বিজ্ঞানবিষয়ক সাহিত্য ও মাতৃভাষায় শিক্ষার দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক।
বিজ্ঞানচর্চায় মাতৃভাষার গুরুত্ব
একটি জাতির অগ্রগতি কেবল প্রযুক্তি ও গবেষণার পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না; সেই জ্ঞান কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ড. কুদরাত-এ-খুদা সেই সত্য উপলব্ধি করেছিলেন বহু আগেই।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার যে ভিত্তি তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, তা আজও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা। মাতৃভাষায় জ্ঞান অর্জন ও বিজ্ঞানকে সর্বজনীন করার তাঁর স্বপ্ন নতুন প্রজন্মের কাছে এক মূল্যবান উত্তরাধিকার।
এই মহতী কর্মবীরের প্রয়াণ দিবসে আমাদের শ্রদ্ধা

