ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধে ছয় সপ্তাহ ধরে সহিংসতা বৃদ্ধির পর, এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয় এবং গত সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন বলছেন যে, তেল আবিব যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার জন্য ‘ট্রিগারের ওপর হাত রেখেছে’ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আলোচনা ব্যর্থ হলে বিধ্বংসী পরিণতির হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, তখন অঞ্চলটি এক চরম উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে।
এই সংঘাতের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই, যা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে কৌশলগত প্রতিধ্বনি সহ একটি অপ্রত্যাশিত সংঘাত হিসেবে বাস্তব সময়ে সংঘটিত হচ্ছে—যার মধ্যে সুদানও রয়েছে, যেখানে চলমান গৃহযুদ্ধ ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং অভ্যন্তরীণ শান্তির ভঙ্গুর আশাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে।
সুদানের জন্য এই দূরবর্তী সংঘাতটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা সহজ নয়, কিন্তু তা অপরিহার্য। কূটনৈতিক ব্যস্ততা থেকে শুরু করে পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক জোট এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা পর্যন্ত—মার্কিন-ইরান যুদ্ধটি সেইসব প্রণোদনা ও সীমাবদ্ধতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে, যা সুদানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং শান্তির সম্ভাবনাকে রূপ দিয়েছিল।
সুদানের ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়া কখনোই বাহ্যিক প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না। গত দুই বছর ধরে- যুদ্ধবিরতি আলোচনাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং সুদানের যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার অন্তত একটি অলীক আবহ বজায় রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ, ইউরোপীয় শক্তি এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের কূটনৈতিক চাপই ছিল মূল চালিকাশক্তি।
কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়া এবং তেহরানের ব্যাপক পাল্টা আক্রমণের ফলে ওয়াশিংটনের কৌশলগত সক্ষমতা ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে। প্রধান রাজধানীগুলো আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি রোধ, সামরিক জোট পরিচালনা এবং আন্তঃসীমান্ত ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ের তীব্রতা কমানোর দিকে কূটনৈতিক মনোযোগ পুনর্নির্দেশ করছে।
যখন পরাশক্তিগুলো আরও তাৎক্ষণিক সংকটে নিমগ্ন থাকে, তখন অন্যান্য সংঘাতের প্রতি মনোযোগ কমে যায় এবং প্রভাবও হ্রাস পায়।
সুদানের শান্তি আলোচনা সেই প্রভাব খাটানোর ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে: নিষেধাজ্ঞার চাপ, সৈন্য প্রত্যাহারের প্রণোদনা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার হুমকি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ অন্যদিকে সরে গেলে সুদানের যুদ্ধরত পক্ষগুলোর জন্য চুক্তি অমান্য করার খরচ কমে যায়। যখন বৈশ্বিক মনোযোগ বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন সংঘাতের পক্ষগুলো প্রায়শই আপোস করার পরিবর্তে নিজেদের অবস্থান আরো দৃঢ় করে।
আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস
উদাহরণস্বরূপ, ২০১১ সালে যখন কায়রো ও তিউনিসের আরব গণঅভ্যুত্থানের দিকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ ঘুরে যায়, তখন দারফুরের ওপর থেকে কূটনৈতিক মনোযোগ সাময়িকভাবে উবে যায় এবং সহিংসতা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। প্রধান শক্তিগুলোর অবহেলার কারণে স্থানীয় সংঘাতগুলো আরও গভীর হয় এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাগুলো থমকে যায়।
শিক্ষাটি স্পষ্ট: বৈশ্বিক মনোযোগ যখন অন্য দিকে থাকে, তখন প্রান্তিক সংঘাতগুলো কম নয়, বরং আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
সুদান আজ একই ঝুঁকির সম্মুখীন। মার্কিন নীতিনির্ধারকরা আঞ্চলিক সংকট ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে সুদানের যুদ্ধরত গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ কমে যাচ্ছে। এই বিলম্ব শুধু শান্তি প্রক্রিয়াকেই মন্থর করে না, বরং তা বাস্তব ক্ষেত্রে দর কষাকষির প্রণোদনাকেও নতুন রূপ দেয়।
সুদানের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এটিকে অন্য এক ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে। এর লোহিত সাগর উপকূল এবং পোর্ট সুদানের ওপর নিয়ন্ত্রণ এটিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথের ঠিক ওপরে স্থাপন করেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১৫ শতাংশ সুয়েজ খাল করিডোর দিয়ে যাতায়াত করে—এই পথের স্থিতিশীলতা বৈশ্বিক তেল বাজার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার কোনো ব্যাঘাত বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়।
আজকের আন্তঃসংযুক্ত নিরাপত্তা পরিবেশে কোনো সংঘাতই বিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যমান থাকে না—এবং এই সংযোগগুলোকে উপেক্ষা করলে বৃহত্তর শক্তিগুলোর ছায়ায় সুদানের যুদ্ধ আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
যুদ্ধ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর সামুদ্রিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি সংঘাতের মুখে রয়েছে। যখন পরাশক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তাদের সম্পৃক্ততার হিসাব-নিকাশ বদলে যায়।
এর ফলে সুদান একটি ছায়া সংঘাত থেকে বেরিয়ে এসে একটি কৌশলগত সম্পদে—কিংবা দায়ে—পরিণত হতে পারে। যেসব বহিরাগত পক্ষ একসময় শান্তির পথ বা পুনর্গঠন প্রকল্পে অর্থায়ন করত, তারা এর পরিবর্তে পোর্ট সুদানকে উন্মুক্ত, সুরক্ষিত এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রভাবের বাইরে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগ দিতে পারে।
এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সুদানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর বাস্তব পরিণতি বয়ে আনবে। যদি বহিরাগত শক্তিগুলো সুদানকে সামুদ্রিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, তবে তাদের নীতিগত লক্ষ্য গণতান্ত্রিক রূপান্তর থেকে সরে গিয়ে লেনদেনমূলক স্থিতিশীলতার দিকে ঝুঁকে পড়বে। এর ফলে সুশীল সমাজের কর্মী এবং শান্তি কর্মীরা সংকীর্ণ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারেন।
এদিকে, ইরানের সার্বিক মনোভাবের কারণে শঙ্কিত আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের জোট আরও পুনর্বিন্যাস করতে পারে। সুদানের গোষ্ঠীগত জোটের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত উপসাগরীয় দেশগুলো হয় তেহরানকে প্রতিহত করতে তাদের সামরিক সম্পৃক্ততা আরো গভীর করতে পারে, অথবা নিজেদের দেশের কাছাকাছি মূল স্বার্থ রক্ষার জন্য পিছু হটতে পারে। উভয় পরিস্থিতিতেই, সুদানের যুদ্ধকে রূপদান ও সীমাবদ্ধ করতে সাহায্যকারী বাহ্যিক শক্তিপ্রবাহগুলো নতুন পথে চালিত হবে।
এই পুনর্গঠন আপনাআপনি শান্তি আনবে না। এটি প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি করবে, এবং সুদানের বিভিন্ন গোষ্ঠী যদি প্রতিদ্বন্দ্বী বহিরাগত পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়, তবে তা আরও বিভাজনকে উস্কে দেবে।
অর্থনৈতিক ধাক্কা
সংঘাত অর্থনৈতিক শক্তি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে না—এবং আজকের আঞ্চলিক উত্তেজনা ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক তেল বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। জ্বালানির উচ্চ মূল্য, সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকি প্রিমিয়াম সুদানের মতো ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক পরিবেশকে আরও খারাপ করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করছে।
যুদ্ধের আগে থেকেই সুদানের সরকারি অর্থব্যবস্থা চরম দুর্দশার মধ্যে ছিল এবং তারপর থেকে তা আরও খারাপ হয়েছে। অতি মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং লাগামহীন খাদ্যমূল্য এখন মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে, বিশ্বব্যাপী তেলের মূল্যবৃদ্ধির মতো বাহ্যিক অর্থনৈতিক ধাক্কাগুলো সুদানের সাধারণ পরিবার এবং সরকারি পরিষেবাগুলোর ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করছে।
সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর জন্য অর্থনৈতিক অবনতি প্রায়শই যুদ্ধ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে তোলে। চোরাচালানের জ্বালানি, সোনার খনি, বাণিজ্য পথের চেকপয়েন্ট ও বন্দরসহ বিভিন্ন সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ একটি টিকে থাকার কৌশল হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে- সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আপোসের চেয়ে সংঘাত চালিয়ে যাওয়াকে অর্থনৈতিকভাবে বেশি যৌক্তিক বলে মনে করতে পারে।
এছাড়াও, বাহ্যিক আর্থিক সহায়তা হ্রাস পেতে পারে, কারণ বৈশ্বিক অংশীদাররা আঞ্চলিক সংকট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত নিজস্ব বাজেটীয় চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং ঝুঁকি প্রিমিয়াম নিয়ে হিমশিম খাওয়া উপসাগরীয় দেশগুলো সুদানের প্রক্সিগুলোর জন্য অর্থায়ন কমিয়ে দিতে পারে। একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত প্রতিরোধে ব্যস্ত পশ্চিমা সরকারগুলো বৈদেশিক সাহায্য এবং শান্তি-প্রতিষ্ঠার তহবিল অন্যত্র পুনর্বন্টন করতে পারে।
এর ফলস্বরূপ সংঘাতের প্ররোচনা আরও কঠোর হয়ে ওঠে। যখন অর্থনৈতিক অস্তিত্ব বিবাদমান সম্পদের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে বিশ্বাসযোগ্য যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অনুপস্থিতিতে, তখন পক্ষগুলো নিরস্ত্রীকরণ বা আলোচনায় বসতে অনিচ্ছুক হয়।
সুতরাং, মার্কিন-ইরান সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু নয়। এটি সুদানের ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি গুরুতর হুমকি। ট্রাম্পের ভাষায় অবিরাম মনোযোগের দাবিদার একটি অনির্দিষ্টকালের অভিযান—যার সঙ্গে উপসাগর জুড়ে ইরানের পাল্টা আক্রমণও যুক্ত—অন্যান্য সংকট থেকে বিশ্বের মনোযোগ কমিয়ে দেয়, বাহ্যিক প্রণোদনার ধরন পাল্টে দেয় এবং এমন অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তোলে যা শান্তির চেয়ে যুদ্ধ অর্থনীতিকেই বেশি সুবিধা দেয়।
তেহরানের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা উপসাগরের ওপর ড্রোনের দ্বারা সুদানের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না। কিন্তু এই সংঘাতগুলোর ফলে সৃষ্ট কৌশলগত পরিবর্তন—যেমন কূটনৈতিক প্রভাব হ্রাস, ভূ-রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের পুনর্নির্ধারণ এবং অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক ধাক্কা—সুদানের যুদ্ধ ও শান্তি প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটকে প্রভাবিত করবে।
যদি বিশ্ব জনমতের পাতাগুলোকে এই বাস্তবতার মোকাবিলা করতে হয়, তবে তাদের অবশ্যই “প্রাথমিক” ও “গৌণ” যুদ্ধের মধ্যকার ভ্রান্ত বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আজকের এই আন্তঃসংযুক্ত নিরাপত্তা পরিবেশে কোনো সংঘাতই বিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যমান থাকে না—এবং এই সংযোগগুলোকে উপেক্ষা করলে বৃহত্তর শক্তিগুলোর ছায়ায় সুদানের যুদ্ধ আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই সপ্তাহে বার্লিনে তৃতীয় আন্তর্জাতিক সুদান সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ায়, মার্কিন-ইরান সংঘাত যেভাবে সুদানের ভবিষ্যৎকে নতুন রূপ দিচ্ছে, তা বিবেচনা করে আলোচনার পরিধি অবশ্যই বৈঠক কক্ষের বাইরেও প্রসারিত করতে হবে। এই সংঘাত কেবল একটি দূরবর্তী উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং এটি সুদানের মানবিক সংকটের একটি সক্রিয় চালিকাশক্তি।
- ওসামা আবুজাইদ: খার্তুম-ভিত্তিক একজন উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ গবেষক। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

