ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে একটি সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত পাঁচ সেনাসদস্যের প্রাণহানির ঘটনা দেশজুড়ে শোকের সৃষ্টি করেছে। শনিবার জোড়হাট বিমানঘাঁটিতে অবতরণের সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। ভারতীয় বিমানবাহিনী জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো সবাই উড়োজাহাজটির ক্রু সদস্য ছিলেন।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় নির্মিত আন্তোনভ অ্যান-৩২ মডেলের উড়োজাহাজটি একটি নিয়মিত সামরিক দায়িত্ব পালন শেষে ঘাঁটিতে ফিরছিল। অবতরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। দুর্ঘটনার পরপরই বিমানটিতে আগুন ধরে যায় এবং ঘটনাস্থলে ব্যাপক ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, দুর্ঘটনাস্থল থেকে ঘন কালো ধোঁয়া আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। উড়োজাহাজটির বিভিন্ন অংশ ছিটকে পড়ে এবং সেটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
ভারতীয় বিমানবাহিনী এক বিবৃতিতে নিহত সেনাসদস্যদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার পেছনে যান্ত্রিক ত্রুটি, আবহাওয়াজনিত সমস্যা কিংবা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
তবে বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, উড়োজাহাজটির সহ-পাইলট জীবিত রয়েছেন। যদিও তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
আন্তোনভ অ্যান-৩২ ভারতীয় বিমানবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন উড়োজাহাজ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, সীমান্ত অঞ্চল এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এটি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। সেনা সদস্য, সামরিক সরঞ্জাম ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী পরিবহনে দীর্ঘদিন ধরে এই উড়োজাহাজ ব্যবহার করছে ভারত।
বর্তমানে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বহরে প্রায় ১০০টি অ্যান-৩২ রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল, লাদাখ এবং অন্যান্য দুর্গম এলাকায় এই উড়োজাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
সাম্প্রতিক এই দুর্ঘটনা আবারও ভারতীয় বিমানবাহিনীর পুরোনো পরিবহন উড়োজাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি সামরিক বিমান দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে প্রাণহানিও হয়েছে।
২০১৯ সালে অরুণাচল প্রদেশে একই ধরনের একটি অ্যান-৩২ উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ১৩ জন নিহত হন। সেই ঘটনার পরও নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। তবে নতুন এই দুর্ঘটনা দেখাচ্ছে, বিষয়টি এখনও বিমানবাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এটি শুধু একটি উড়োজাহাজ হারানোর ঘটনা নয়, বরং সামরিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিমানবাহিনীর পরিচালন সক্ষমতার সঙ্গেও জড়িত।
তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে যদি কোনো প্রযুক্তিগত বা কাঠামোগত দুর্বলতা শনাক্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। আপাতত নিহত সেনাসদস্যদের স্মরণ করছে ভারত, আর পুরো দেশ অপেক্ষা করছে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানার জন্য।

