বাংলাদেশের নদীনির্ভর ভূগোল, অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। তবে নদীর ওপর নির্ভরশীলতা থাকা সত্ত্বেও গত পাঁচ দশকে দেশে ভয়াবহ পানি সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নদীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের জীবনে। মূল কারণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নদীর নাব্য নিয়ন্ত্রণকে দেখা হয়, যার নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে নেই।
উজানের দেশ হিসেবে চীন এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত—এই দুই দেশের নদী নিয়ন্ত্রণ ভূরাজনীতির বাস্তবতায় পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ফারাক্কা বাঁধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব:
১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো ধীরে ধীরে প্রাণ হারাতে শুরু করে। এর প্রভাব পড়ে অন্তত চারটি বিভাগের ১৯টি জেলায়। এই জেলাগুলোতে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ বসবাস করে। গড়াই, মধুমতি, হিসনা, মাথাভাঙ্গা, বড়াল ও ইছামতির মতো একসময় প্রবহমান মিঠাপানির নদীগুলো এখন অনেকাংশে নাব্য হারিয়েছে। অনেক নদীতে লবণাক্ততা বেড়েছে, ফলে কমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এর পাশাপাশি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এই নদীগুলোর প্রধান পানির উৎস পদ্মা নদী, যা গঙ্গার অববাহিকার অংশ। গঙ্গার পানি ভারত ও চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পদ্মার প্রবাহ ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবেও পরিবর্তিত হচ্ছে। পানির ন্যায্য হিস্যা থাকলেও বাংলাদেশ কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে অবস্থানে রয়েছে।
এই বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে শুধু একটি অবকাঠামো হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে পরিবেশ, অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক নদী পুনরুজ্জীবনের একটি কৌশলগত উদ্যোগ। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির অনুমোদনের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। এটি মূলত ফারাক্কার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলার একটি বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরও শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহের ঘাটতি কাটেনি। তাই নিজস্ব অবকাঠামোর মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় নির্মিতব্য প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজ শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করতে পারবে। পরে এই পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে বিভিন্ন শাখা নদীতে সরবরাহ করা হবে। এতে মৃতপ্রায় নদীগুলোতে আবার প্রবাহ ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি, সুপেয় পানি এবং বনসম্পদ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সুন্দরবনের কেওড়া ও অন্যান্য উদ্ভিদও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাদু পানির প্রবাহ বাড়লে কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ এবং উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পদ্মা ব্যারাজের গুরুত্ব পরিবেশের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে। ফলে খাদ্য উৎপাদন ও মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে। প্রকল্প থেকে বছরে আনুমানিক ৮ হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। নদী ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে পুনর্গঠনের লক্ষ্য নিয়ে হিসনা, মাথাভাঙ্গা, গড়াই, মধুমতি, চন্দনা, বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বড় চ্যালেঞ্জও সামনে:
এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হলে উজানে ভাঙন এবং ভাটিতে পলি জমার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, নদীর গঠনগত পরিবর্তন মোকাবেলা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বাড়ার অভিযোগ পুরোনো। তাই পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
এটিকে শুধু রাজনৈতিক সাফল্যের প্রকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পানি কৌশলের অংশ হওয়া প্রয়োজন। কারণ আগামী দিনে বিশ্বে পানিই হবে অন্যতম বড় সংকট। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ দেশের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা এখন জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়েও পরিণত হয়েছে।

