বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একই সময়ে বেশ কয়েকটি মূল্যস্ফীতিমুখী (ইনফ্লেশনারি) উপাদান সক্রিয় হয়েছে। একদিকে সুদের হার কমানো হয়েছে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি বন্যার কারণে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মে ২০২৬ সালে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়ায়, যা গত ১৬ মাসের সর্বোচ্চ। জুনে কিছুটা কমে তা ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে আসে। তবে বন্যার কারণে জুলাইয়ে আবারও মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে চলতি বাজেটে সরকার মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সুদহার বা রেপো রেট ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ১০ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। একইভাবে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (SLF) বা ব্যাংকগুলোর জন্য সর্বোচ্চ সুদহার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে।
নীতিগতভাবে সুদের হার কমালে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ কমে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ হলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার কমানোর ফলে ঋণের চাহিদা বাড়লে সেই অতিরিক্ত অর্থের উৎস কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ অর্থনীতিতে নতুন টাকা প্রবেশের ধরন মূল্যস্ফীতির গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
সাম্প্রতিক সময়ে নগদ অর্থের ব্যবহারও বেড়েছে। ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকটের কারণে অনেক গ্রাহক আমানতের পরিবর্তে হাতে নগদ অর্থ রাখছেন বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা নগদ অর্থ বেড়েছে বা ব্যাংক আমানত কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায়, এই অর্থ রিজার্ভ মানির অংশ হওয়ায় এটি ভবিষ্যতে অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সময়ে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বাড়িয়েছে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোতে তারল্য সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে একদিকে আমানত কমলেও অন্যদিকে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির চাপ তৈরি হচ্ছে।
বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ মানি থেকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রিজার্ভ মানি বা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, মানি মাল্টিপ্লায়ার প্রায় ৫ দশমিক ২। ফলে এই অর্থ পুরোপুরি বাজারে প্রবাহিত হলে তা প্রায় এক লাখ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ সরবরাহ তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, এ ধরনের প্রণোদনা বাজেট অর্থায়নের মাধ্যমে হলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তুলনামূলক কম হতে পারত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ। যেখানে পূর্বাভাস ছিল ৮ শতাংশ। বছরের প্রথম ছয় মাসে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ শতাংশ।
এই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক রেকর্ড ৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার নিট বৈদেশিক মুদ্রা কিনেছে। এর একটি অংশ বাজার থেকে টাকা শুষে না নেওয়ায় অর্থ সরবরাহ বেড়েছে।
অন্যদিকে গত ছয় মাসে ব্রড মানি বা ব্যাপক অর্থ সরবরাহ বেড়েছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। নতুন করে রিজার্ভ মানি বৃদ্ধি, সুদের হার কমানো এবং নীতি সুদহার হ্রাস—সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে ব্রড মানির প্রবৃদ্ধি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে আমানত বাড়ানোও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় প্রকৃত আমানত সুদহার নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।
সরকার নির্ধারিত ৪ শতাংশ স্প্রেড সীমার বিপরীতে বাস্তবে গড় স্প্রেড রয়েছে ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৬টি ব্যাংক এই সীমার ওপরে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর প্রকৃত আমানত সুদহার প্রায় ঋণাত্মক ২ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রাখলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমানত বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সুদের হার কমানোর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে।
তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৫ সালে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা মার্চ ২০২৬ সালে নেমে আসে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে। স্বাধীনতার পর এটি সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি।
জুন ২০২৬ সালে তা আনুমানিক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে, যেখানে পূর্বাভাস ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি। ডিসেম্বর ২০২৫ সালে সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং জুন ২০২৬ সালে তা ২৫ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়। পূর্বাভাস ছিল ২১ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নীতি সুদহার কমালেই বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়বে না। সরকারি ঋণের চাপ কমানো এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব মডেল অনুযায়ী, জুন ২০২৭ সালে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। অথচ সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বাভাস ও সরকারি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে পার্থক্য থাকলে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
তবে অর্থনীতির আরেকটি বাস্তবতা হলো—দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই ঋণ যদি উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে অপব্যবহার হয়, তাহলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও আসতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হলে মুদ্রানীতির প্রতিটি সিদ্ধান্ত তথ্য, মডেলিং ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নিতে হবে।
- লেখক: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

