Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice রবি, আগস্ট 16, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • জলবায়ু ও পরিবেশ
      • লাইফস্টাইল
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » অপারেশন জ্যাকপট: নদী-সমুদ্রের অন্ধকার ঢেউয়ের আড়ালে লুকানো বিস্ফোরণ
    মতামত

    অপারেশন জ্যাকপট: নদী-সমুদ্রের অন্ধকার ঢেউয়ের আড়ালে লুকানো বিস্ফোরণ

    নিউজ ডেস্কUpdated:আগস্ট 16, 2026আগস্ট 16, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    অপারেশন জ্যাকপটের পর তলদেশ বিস্ফোরিত হওয়া একটি পাকিস্তানি জাহাজ। ছবি: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    একাত্তরে পুরো দেশ যখন পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত, তখন ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামক প্রতিরোধের এক অন্য রকম ঢেউ নীরবে জেগে উঠেছিল নদী ও সমুদ্রের গাঢ় অন্ধকারে।

    ১৬ অগাস্ট ১৯৭১। প্রথম প্রহরেই দেশের দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মোংলা এবং দুটি নদীবন্দর চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে (দাউদকান্দি ফেরিঘাটসহ) সমন্বিত আক্রমণ চালায় নৌ-কমান্ডোরা। একযোগে পরিচালিত ওই আত্মঘাতী অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন জ্যাকপট’। এই অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর ২৬টি সমরাস্ত্র ও পণ্যবাহী জাহাজ এবং গানবোট ডুবিয়ে দেওয়া হয়। নৌ-কমান্ডোদের এই সফল অপারেশনে বদলে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের গতিপথ।

    বিশেষ এই অপারেশনের অন্তরালের গদ্য তুলে আনতে বিভিন্ন সময়ে মুখোমুখি হয়ে কথা বলি জ্যাকপটের তিন নৌ-যোদ্ধার সঙ্গে। অপারেশন জ্যাকপটের বাছাই, প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও ঐতিহাসিক আক্রমণ নিয়ে তাদের বলা কথাগুলোই ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে এবং থাকবে। যা বাঙালির বীরত্বের ইতিহাসকেও গৌরবোজ্জ্বল করে তুলেছে।

    এটা ছিল সুইসাইডাল স্কোয়াড

    অপারেশন জ্যাকপট কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল? তা জানতে একবার মুখোমুখি হই নৌ-কমান্ডো মো. শাহজাহান কবির (বীরপ্রতীক) এর। একাত্তরে চাঁদপুর নদীবন্দর অপারেশনে অংশ নেওয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “এটি ছিল সুইসাইডাল অপারেশন। ট্রেনিংয়ের পর ৩০০ জনের ভেতর থেকে সিলেকশন করা হয় ১৬০ জনকে। চট্টগ্রামের জন্য ৬০ জন, মোংলার জন্য ৬০ জন, চাঁদপুরে ২০ জন ও নারায়ণগঞ্জের জন্য ২০ জন করে নৌ-কমান্ডো গ্রুপ তৈরি করা হয়। ওইসময় ফ্রান্স ফেরত সাবমেরিনার এ ডব্লিউ আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরীকে (বীরউত্তম ও বীরবিক্রম) চট্টগ্রাম, আহসান উল্লাহকে (বীরবিক্রম) মোংলায়, বদিউল আলমকে (বীরউত্তম) চাঁদপুর এবং নারায়ণগঞ্জ অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয় আবেদুর রহমানকে।

    ৯ অগাস্ট চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ—এই তিনটি গ্রুপকে ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে সামরিক বিমানে আনা হয় আগরতলায়, শালবনের ভেতর নিউ ট্র্যানজিট ক্যাম্পে। ওখান থেকে বাংলাদেশে ঢুকে অপারেশন সেরে ওখানেই ফিরতে হবে। একদিন পরেই দেওয়া হয় আর্মস-অ্যামুনেশন। প্রত্যেকের জন্য একটা লিমপেট মাইন, একটা কমান্ডো নাইফ, একজোড়া ফিনস, থ্রি নট থ্রিসহ কিছু অস্ত্র এবং প্রতিটি গ্রুপের জন্য একটা টু ব্যান্ডের রেডিও।

    নৌ-কমান্ডো মো. শাহজাহান কবির (বীরপ্রতীক), ছবি: লেখক।
    নৌ-কমান্ডো মো. শাহজাহান কবির (বীরপ্রতীক), ছবি: লেখক

    রেডিও হলো যুদ্ধে সিগন্যাল পাঠানোর মাধ্যম। গানে গানে সিগন্যাল! শাহজাহান কবিরের ভাষায়, “আমরা চাঁদপুর আসি ১১ অগাস্টে, উঠি রঘুনাথপুরে এক মামার বাড়িতে। অতঃপর রেডিওতে নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকি।

    বলা ছিল, ‘প্রত্যেকদিন তোমরা আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র ধইরা রাখবা। ওটার মাধ্যমে সিগন্যাল পাবা’। কেমন সিগন্যাল? আকাশবাণীতে সকাল ৭ বা সাড়ে ৭টায় বাজবে একটি গান, ‘আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান’। এ গান হলেই অপারেশনের যাবতীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। ২৪ ঘন্টা পর আরেকটা গান বাজবে, ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুর বাড়ি’। এ গানটি বাজলেই বুঝতে হবে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ওই দিন শেষে রাত বারোটার পর অবশ্যই অ্যাটাক করতে হবে।

    ১৩ অগাস্ট সকালে বাজল প্রথম গানটি। আমি, নুরুল্লাহ পাটোয়ারী, বদিউল আলম সঙ্গে সঙ্গে রেকি করতে বের হই। ২৪ ঘন্টা পর অর্থাৎ ১৪ অগাস্ট চূড়ান্ত নির্দেশনার গানটি বাজার কথা ছিল। কিন্তু ওইদিন সেটি না বেজে বাজল ১৫ অগাস্ট সকালে। ফলে আমরা অ্যাটাকের প্রস্তুতি নিই।

    লঞ্চ টার্মিনাল ও স্টিমার ঘাটসহ ছয়টি টার্গেট প্লেস ঠিক করি। আমার টার্গেট প্লেস ছিল লন্ডনঘাট জেটি। রাত সাড়ে এগারটার দিকে ডাকাতিয়া নদী দিয়ে নামি। পায়ে ফিনস, পরনে শুধু জাঙ্গিয়া। বুকে গামছা দিয়ে মাইন পেচিয়ে চিত সাঁতারে এগোই। এভাবে লন্ডনঘাটে এসেই জেটিতে মাইন সেট করে দিই। ৪৫ মিনিট পরই সেটার বিস্ফোরণ ঘটে।”

    মাইন ছাড়া অস্ত্র ছিল শুধু একটি কমান্ডো নাইফ

    মুক্তিযোদ্ধা নৌ–কমান্ডো মো. মতিউর রহমান (বীরপ্রতীক)। বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার সাতঘড়িয়া গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণগাঁও হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। জীবদ্দশায় আলাপ হয়েছিল তার সঙ্গে।

    মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ট্রেনিং নিতে তিনি চলে যান ভারতের বনগাঁ, টালিখোলা ক্যাম্পে। প্রায় দুই সপ্তাহ লেফট–রাইট আর ক্রলিং করানো হয় ওই ক্যাম্পে। তিনি বলেছিলেন যেভাবে, “ওই ক্যাম্পে একদিন আসেন ওসমানী সাহেব। সঙ্গে ছিলেন ভারতীয় নৌ–বাহিনীর প্রধান। একাত্তরে আটজন বাঙালি সাবমেরিনার জাহাজ আনতে গিয়েছিলেন ফ্রান্সে। তারা ওখান থেকেই পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে পালিয়ে চলে আসেন ভারতে। তারাও ওইদিন ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আসেন। প্রথমে সবাইকে ফল–ইন করানো হয়। পরে বাছাই করা হয় ৬০ জনকে। মেডিকেল টেস্টে বাতিল হয় ২০ জন। আমিসহ ৪০ জনকে বলা হলো একটা গ্রুপ করা হবে, যারা অপারেশনে গেলে মরতেও হতে পারে। আমরা রাজি হয়ে যাই, ‘মরতে হলে দেশের জন্য মরমু।’

    আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় মুর্শিদাবাদে ভাগীরথী নদীর পাড়ে। ওটা ছিল পলাশীর প্রান্তর। অন্যান্য ক্যাম্প থেকেও বাছাই করে আনা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। ‘অপারেশন জ্যাকপটে’ আমরা ছিলাম সুইসাইডাল স্কোয়াড। প্রশিক্ষণের শুরুতেই একটা ফরমে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ইন্ডিয়ান নেভি প্রশিক্ষণ দেয়।

    প্রথমদিকে প্রত্যেককে পায়ে ফিনস পরে চিৎ সাঁতারের অভ্যাস করানো হয়। বুকে গামছা বেঁধে ৪–৫ কেজি ওজনের মাটির ঢিবি বা ইট বেঁধে নদীতে চিৎ সাঁতার করানো হতো। সবচেয়ে কঠিন ছিল ডুব দিয়ে পানির নিচে লোহার প্লেটে মাইন লাগিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সাঁতার কেটে ফেরত আসা। কেউ মারতে এলে তাকে প্রতিহত করার যুদ্ধও শেখানো হয়। প্রতিদিন ১৭–১৮ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ হতো। বিশেষ কমান্ডো ট্রেনিং চলে প্রায় আড়াই মাস।”

    নৌ–কমান্ডোরা ছিলেন ১০ নম্বর সেক্টরের অধীনে। কোনো কমান্ডার ছিল না এই সেক্টরে। প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানী এটা নিয়ন্ত্রণ করতেন। অপারেশনের জন্য যখন নৌ–কমান্ডোদের বিভিন্ন সেক্টরে পাঠানো হতো, তখন তারা ওই সেক্টরের অধীনেই কাজ করতেন। অপারেশন শেষে আবার ১০ নম্বর সেক্টরের অধীনে চলে আসতেন।

    ট্রেনিং শেষেই অপারেশন জ্যাকপটের পরিকল্পনা করা হয়। নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরসহ দাউদকান্দি ফেরিঘাটের জন্য সাবমেরিনার আবিদুর রহমানের নেতৃত্বে ২০ জন নৌ–কমান্ডোকে পাঠানো হয়। মতিউর রহমান ছিলেন এ গ্রুপে।

    বীরপ্রতীক মতিউর বলেন, “প্রশিক্ষণের পর আমাদের পাঠানো হয় আগরতলায়, নিউ ট্রানজিট ক্যাম্পে। সেখানে প্রত্যেককে দেওয়া হয় একটি লিমপেট মাইন, ফিনস, সুইমিং কস্টিউম, নাইফ, কাঁধে ঝোলানোর চটের ব্যাগ, কিছু কাপড়চোপড়, বন্দরের ম্যাপ ও জোয়ার–ভাটার চার্ট প্রভৃতি। প্রতিটি গ্রুপকে একটি রেডিও দেওয়া হয়। সীমান্ত পার হলে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা পথ দেখিয়ে নিরাপত্তা দিয়ে আমাদের গন্তব্যে নিয়ে আসে। নারায়ণগঞ্জে মুসার চরে আমরা আত্মগোপন করে থাকি। নদীবন্দর থেকে সেটি ছিল প্রায় এক মাইল দূরে।

    লিমপেট মাইন গামছা দিয়ে বুকে বেঁধে জাহাজে লাগাতে হবে; বড় জাহাজে তিনটি আর ছোট হলে দুটি মাইনেই চলবে। ডুব দিয়ে আগে দেখতে হবে জাহাজের গায়ে শ্যাওলা আছে কিনা, থাকলে জায়গাটা পরিষ্কার করে মাইন ফিট করতে হবে। নোঙর করা অস্ত্র ও গোলা–বারুদপূর্ণ পাকিস্তানি জাহাজই টার্গেট। বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দ্রুত ফিরে যেতে হবে ট্রানজিট ক্যাম্পে, এমন নির্দেশনাই দেওয়া ছিল অপারেশন জ্যাকপটের নৌ–কমান্ডোদের। মাইন ছাড়া আমাদের কাছে অস্ত্র ছিল শুধু একটি কমান্ডো নাইফ। কিন্তু বুকে ছিল দেশপ্রেম আর মাতৃভূমিকে মুক্ত করার তীব্র বাসনা।

    নৌ–কমান্ডো মো. মতিউর রহমান (বীরপ্রতীক), ছবি: লেখক।
    নৌ–কমান্ডো মো. মতিউর রহমান (বীরপ্রতীক), ছবি: লেখক

    বলা হয়েছিল, ভারত থেকে সিগন্যাল আসবে রেডিওতে গানের মাধ্যমে। নির্ধারিত প্রথম গানটি বাজে ১৯৭১ সালের ১৩ অগাস্ট সকালে। তারপর আমরা রেকি করতে বের হই। আদমজী জুটমিলের মসজিদের উঁচু মিনারে উঠে বন্দরে আর্মি–পজিশন, জাহাজের পজিশন দেখে কমান্ডারকে গিয়ে বলি। রেডিওতে প্রথম গানটি শোনানোর ২৪ ঘণ্টা পর দ্বিতীয় গানটি বাজবে, ওইদিন রাতেই আক্রমণ করতে হবে। এমনটাই ছিল পরিকল্পনায়। কিন্তু দ্বিতীয় গানটি শোনানো হয় একদিন পর, অর্থাৎ ১৫ অগাস্ট সকালে। ফলে ওইদিন রাতেই নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে অপারেশনের প্রস্তুতি নিই আমরা।

    আবিদুর রহমানের নেতৃত্বে অপারেশনে আমি ছাড়াও অংশ নেন আবদুর রহিম, হেদায়েত উল্লাহ, আজহার হোসেন, আনোয়ার হোসেন, হাবিবুল হক, মাহবুব আহমেদ মিলন, জি এম আইয়ুব, আবদুল মালেক, আবদুল জলিল ও ফজলুল হক ভূঞা। আমার কাজ ছিল এক্সপ্লোসিভ দিয়ে নদীবন্দরের টার্মিনাল উড়িয়ে দেওয়া, যাতে অন্য কোনো জাহাজ ভিড়তে না পারে। এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে দ্রুত সরে আসি। সঙ্গের তিনজন একটি পাকিস্তানি মালবাহী জাহাজের গায়ে মাইন ফিট করে চলে আসে।

    নির্ধারিত সময় পর জাহাজ ও টার্মিনালে বিস্ফোরণ ঘটে। পাকিস্তানি আর্মি তখন এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। দূর থেকে আমরা বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনি। অন্যরকম আনন্দ লেগেছিল তখন। তারপর ফিরে যাই আগরতলায়, নিউ ট্রানজিট ক্যাম্পে।”

    এই অপারেশনে সংকেত ছিল ‘গান’

    “১২ মে, ১৯৭১। আমরা তখন ভারতের টাকিতে, ত্বকীপুর ইয়ুথ ক্যাম্পে। ক্যাম্পে তখন ৫ হাজারের মতো যুবক। সবাইকে ফল-ইন করিয়ে ১২০ জনকে সিলেক্ট করা হয়। শারীরিক গঠন আর সাঁতার জানা ছিল মাপকাঠি। বাড়ির একমাত্র ছেলে হলেই আনফিট করে দেওয়া হতো। নদীর পাড়ের ছেলেরা টিকে যায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যায়। ওই হিসেবে আমাকেও তারা নিয়ে নেয়।

    টাকি থেকে প্রথমে কল্যাণী এবং পরে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় পলাশীতে। ভাগীরথী নদীর তীরে জঙ্গল পরিষ্কার করে আমরা ক্যাম্প করি। এরপর শুরু হয় ট্রেনিং। প্রথমে শপথ নিই ‘দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করে আমি স্বেচ্ছায় এ আত্মঘাতী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি।’ ট্রেনিংয়ে ভারতীয় নৌবাহিনী আমাদের শেখায় বিশেষ ধরনের সাঁতার। পানির নিচে শরীর এবং ওপরে নাক-চোখ ভাসিয়ে সাঁতার দিতে হতো।

    এ পদ্ধতিতে সাঁতার কেটে নিঃশব্দে যে কোনো মানুষের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া যেত। সবচেয়ে কঠিন ছিল পানির নিচ দিয়ে সাঁতরে গিয়ে জাহাজে মাইন-অ্যাসেম্বল করা। নৌবাহিনীর তিন বছরের ট্রেনিং আমরা নিই তিন মাসে। ট্রেনিং চলাকালে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান, বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও কর্নেল এম এ জি ওসমানী সাহেব এসেছিলেন।”

    অপারেশন জ্যাকপটের কথা এভাবেই শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা নৌ-কমান্ডো মো. খলিলুর রহমান। জীবদ্দশায় মুখোমুখি হই তার। আয়জুদ্দিন ও ওয়ালিউর নেছার সপ্তম সন্তান খলিলুর রহমান। বাড়ি সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার ভাতশালা গ্রামে। তার মুখেই শুনি মোংলা অপারেশনের কথা।

    নৌ-কমান্ডো মো. খলিলুর রহমান, ছবি: লেখক।
    নৌ-কমান্ডো মো. খলিলুর রহমান, ছবি: লেখক

    তার ভাষায়, “অপারেশন জ্যাকপটে আমি ছিলাম মোংলা বন্দরের গ্রুপে। কমান্ডার ছিলেন আহসান উল্লাহ (বীরপ্রতীক)। ৭ অগাস্ট, ১৯৭১। ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে আমাদের নেওয়া হয় ব্যারাকপুর ক্যাম্পে। গঙ্গায় নামিয়ে একটি জাহাজ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। পরে ক্যানিং থেকে দেশি নৌকায় রায়মঙ্গল নদী পার হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনের ভেতর কৈখালি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পৌঁছি। ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন জর্জ মার্টিস, লেফটেন্যান্ট কফিল। প্র্যাকটিসের জন্যই স্থলপথে না নিয়ে ভয়াল নদীপথে আমাদের নিয়ে আসা হয়েছিল।

    সমুদ্রের পাশ দিয়ে হেঁটে সুন্দরবনের ভেতর প্রথমে উঠি কালাবগি নামের গ্রামে। পরে ক্যাম্প গড়ি সুতারখালিতে। অপারেশনের জন্য ২০ জনের তিনটি দলে ভাগ হই। দল তিনটির নেতা মজিবর রহমান, আফতাব উদ্দিন এবং আমি। আমাদের সাপোর্টের জন্য আসে ২০ জন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা। তাদের কমান্ডার ছিলেন খিজির আলী (বীরবিক্রম)। এরপর আমরা নির্দেশের অপেক্ষায় থাকি।

    চারটি বন্দরে আক্রমণের জন্য সবকটি গ্রুপকে একসঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হবে। কীভাবে? এর জন্য প্রতিটি গ্রুপকে দেওয়া হয় একটি করে রেডিও। বলা হয় তোমরা ১৩ অগাস্ট থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে আকাশবাণী ‘খ’ কেন্দ্র শুনবে। যে কোনো দিন পঙ্কজ মল্লিকের কণ্ঠে তোমাদের একটা গান শোনানো হবে ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান…।’ এ গান শুনলেই বুঝতে হবে প্রস্তুতির নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

    এর ২৪ ঘণ্টা বা তারও পরে শোনানো হবে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে একটি গান ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুর বাড়ি…।’ এ গান শুনলে ওইদিন শেষেই টার্গেটে অ্যাটাক করতে হবে।

    ১৩ অগাস্ট রেডিওতে আমরা প্রথম গানটি শুনলাম। কিন্তু দ্বিতীয় গানটি শোনানো হলো ৪৮ ঘণ্টা পর অর্থাৎ ১৫ অগাস্ট সকালে। টিম লিডার আহসান উল্লাহ সাহেব সবাইকে ডেকে অ্যাটাকের নির্দেশ দিলেন। প্রস্তুত হয়ে নিলাম। সাঁতার কাটার জন্য পায়ে শুধু ফিনস এবং গায়ে সুইমিং কস্টিউম। গামছা দিয়ে শরীরে পেঁচিয়ে নিলাম মাইনটি। জাহাজের গায়ে মাইন লাগানোর জন্য সঙ্গে ছিল একটি ড্যাগার।

    গেরিলারা রেকি করে আসে দিনের বেলায়। ওইদিন সন্ধ্যার পরই আমাদের শপথ করানো হলো ‘আমরা সবাই ভাই ভাই। দেশের জন্য জীবন দিতেও দ্বিধা করব না। কাউকে বিপদে ফেলব না এবং বিপদ দেখে সরে পড়ব না।’

    রাতে নৌকায় করে রওনা হলাম। স্রোত ছিল প্রতিকূলে। ফলে ভোরের দিকে পৌঁছলাম মোংলা বন্দরের অন্য তীরে, বানিয়াশান্তা গ্রামে।

    আমরা অবস্থান নিই বেড়িবাঁধের নিচে। কথা ছিল মধ্যরাতে অপারেশন করার। কিন্তু তা হলো না। তখন সূর্য উঠছে। শরীরে সরিষার তেল মেখে কস্টিউম পরে নিই। বুকে মাইন বেঁধে পানিতে নেমে দিবালোকেই অপারেশন করি। মোংলা বন্দরের জাহাজগুলোতে মাইন লাগিয়ে যে যার মতো সরে পড়ি।

    পানির ওপরে তখন পাকিস্তানিদের গানবোট। সকাল তখন ৯টার মতো। একে একে বিস্ফোরিত হতে থাকে জাহাজে লাগানো মাইনগুলো।”

    অপারেশন জ্যাকপটের খবর বড় করে প্রকাশ পায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে। ফলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কোনো যুদ্ধ হচ্ছে না বলে পাকিস্তান সরকার যে প্রচারণা চালাচ্ছিল তা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ অপারেশনগুলোর একটি হলো অপারেশন জ্যাকপট। স্বাধীনতা লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সুইসাইডাল ওই অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন বাংলার দামাল ছেলেরাই। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যা ছিল নৌ-কমান্ডোদের এক মরণকামড়। ফলে মুষড়ে পড়ে পাকিস্তান বাহিনী।

    আমরা ওই গর্বিত জাতি যে জাতি রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতাকে। একাত্তরে মুক্তির লড়াইয়ে আমাদের বিজয়ের পেছনে ছিল অপারেশন জ্যাকপট যোদ্ধাদের মতো বহু মুক্তিযোদ্ধার দুঃসাহসী অংশগ্রহণ। যা প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা অপরিহার্য। আগামী প্রজন্ম যদি সত্যের অনুসারী হয়, ন্যায়-নীতি আর নিষ্ঠাবোধ যদি অন্তরে থাকে, তবে অবশ্যই বুকের ভেতর মুক্তিযুদ্ধের এমন অবিনাশী ইতিহাসকে ধারণ করেই তারা এগিয়ে যাবে।

    • সালেক খোকন:লেখক ও গবেষক। সূত্র: বিডিনিউজ২৪
    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    আইন আদালত

    নিয়োগের ১৮ দিনের মাথায় আরও এক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ

    আগস্ট 16, 2026
    অর্থনীতি

    গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি

    আগস্ট 16, 2026
    আন্তর্জাতিক

    আফগানিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কীভাবে দমন করবে তালেবান সরকার?

    আগস্ট 16, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.