নেতা ভালো, দল খারাপ। নেতা দেশ নিয়ে ভাবেন, কিন্তু দলের নেতাকর্মীরা তাকে ভুল তথ্য দেন। নেতা সব জানেন না, আমলারা তাকে ভুল বোঝান। নেতা পরিবর্তন চান, কিন্তু দলের লোকজন পরিবর্তন হতে দেয় না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বয়ান বহু পুরোনো।
শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশাল গঠনের সময়ও ব্যর্থতার দায় দেওয়া হয়েছিল চাটুকার পরিবৃত্তের ওপর। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলেও জনপরিসরে বহুবার শোনা গেছে, নেত্রী উন্নয়ন করেছেন, সমস্যা আওয়ামী লীগে। এখন কি আমরা ধীরে ধীরে আরেকটি নতুন সংস্করণের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে বার্তা দেওয়া হচ্ছে—নেতা সঠিক পথে আছেন, কিন্তু বিএনপি পুরোনো বৃত্তেই আটকে আছে?
২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর তারেক রহমান বলেছিলেন, গত ১৬ বছর ধরে ‘আমি ভালো আর সব খারাপ’ ধরনের একটি ধারণা দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পরও ওই প্রবণতার পরিবর্তন হয়নি বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, ‘বিশেষ একজন ভালো আর বাকি সবাই খারাপ’ এই ধারণা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি এবং বিপজ্জনক।
অথচ এখনও কলামের শিরোনাম হচ্ছে, ‘আস্থা গড়ছেন প্রধানমন্ত্রী, ক্ষয় করছে বিএনপি’। প্রধানমন্ত্রীকে আস্থার উৎস এবং তার দলকে আস্থা ক্ষয়ের কারণ হিসেবে আলাদা করে দেখার রাজনৈতিক কাঠামোটি কি শেষ পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতিকেই পুনরুত্পাদন করে না, যার বিরুদ্ধে তারেক রহমান নিজেই সতর্ক করেছেন?
বিষয়টি নিয়ে একটু গভীরে যাওয়া দরকার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এর একটি পরিচিত ধারণা হচ্ছে ‘রাজনৈতিক ব্যক্তিকেন্দ্রীকরণ’। এখানে রাজনৈতিক দল, নীতি, প্রতিষ্ঠান ও মতাদর্শের পরিবর্তে একজন নেতাকে রাজনৈতিক মূল্যায়নের প্রধান কেন্দ্র বানানো হয়।
একজন নেতা যখন দলের রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠেন, তখন দলের নীতি ও সাংগঠনিক কাঠামো তার ব্যক্তিত্বের আড়ালে চলে যেতে পারে। দল তখন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে নেতার রাজনৈতিক বাহন হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের দৈন্য তুলে ধরে রওনক জাহান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, দেশের কোনো বড় রাজনৈতিক দলই প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র চর্চা করে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অধ্যাপকের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে যে—নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী মনোনয়ন, নীতি নির্ধারণ ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে সব ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছেন শীর্ষ নেতৃত্ব। মূলত চার দশকের বেশি সময় ধরে প্রধান দলগুলো বংশানুক্রমিক ধারায় চলায় ভেতরে কাঠামোগত গণতন্ত্র গড়ে ওঠেনি।
এখানে মৌলিক বৈপরীত্য হচ্ছে, আমরা যদি দলকে একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠান বানাই, তারপর ওই দলের সব ভালো-মন্দ একজন নেতার ব্যক্তিগত চরিত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করি, তাহলে প্রতিষ্ঠান আরও দুর্বল হয়। কারণ দলের সাফল্য নির্ভর করে নেতার ওপর, আর দলের ব্যর্থতার দায় চলে যায় নিচের স্তরে।
এভাবে একটি দল সত্যিকারের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা ও দলীয় রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে কাজ করছেন নরওয়েজিয়ান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইঙ্গে আমুন্ডসেন। ‘রিসার্চগেইট’ প্রকাশিত তার এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র অনুপস্থিত। এর নেপথ্যে রয়েছে ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ, সীমিতসংখ্যক রাজনৈতিক অভিজাতের অনানুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এবং বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের প্রভাব।
বাংলাদেশের সমস্যাটি মূলত কাঠামোগত। প্রধানমন্ত্রীকে তার দলের প্রতিটি নেতাকর্মীর ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী করা যায় না। কোনো স্থানীয় নেতা দুর্নীতি করলে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে অপরাধী হয়ে যান না। কোনো দলীয় কর্মী অন্যায় করলে তার আইনগত দায় ওই ব্যক্তির।
কিন্তু রাজনৈতিক দায় আলাদা বিষয়। সরকার কোন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কী ধরনের নিয়োগ হচ্ছে, প্রশাসনের সঙ্গে দলের সম্পর্ক কেমন, দলের নেতারা ক্ষমতার সুবিধা কীভাবে ব্যবহার করছেন, সরকার বিরোধীদের সঙ্গে কী আচরণ করছে, দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা কীভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, এসবের সামগ্রিক রাজনৈতিক দায় নেতৃত্ব এড়াতে পারে না।
এখানে ব্যক্তিগত অপরাধের দায় এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির মধ্যে পার্থক্যটি লক্ষ্য রাখা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী যদি ভালো সিদ্ধান্ত নেন, কৃতিত্ব তার। তিনি যদি কার্যকর প্রশাসন গড়ে তোলেন, রাজনৈতিক কৃতিত্ব তার। তিনি যদি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করেন, তবে তার প্রশংসা প্রাপ্য।
তাহলে একই যুক্তিতে সরকারের ব্যর্থতা, মন্ত্রীর অদক্ষতা, দলীয় প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের রাজনৈতিক দায়ও তার নেতৃত্বের কাছে যাবে। কৃতিত্বের সময় নেতা সামনে থাকবেন, আর ব্যর্থতার সময় দলকে সামনে ঠেলে দেওয়া হবে, এভাবে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় না।
আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসও একই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নেতৃত্বকে দলীয় ব্যর্থতা থেকে আলাদা করে দেখার প্রবণতা ছিল। উন্নয়ন, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক সাফল্যের কৃতিত্ব প্রায় স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যেত। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতি, দখল, দলীয়করণ, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং রাজনৈতিক সহিংসতার দায় অনেক সময় ‘দলের কিছু খারাপ লোকের’ ওপর ঠেলে দেওয়া হতো।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বিভাজন টেকেনি। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
এর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘ ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির সঙ্গে দলকে আলাদা করে বিচার করার সুযোগ রাখেনি।
যারা বলেন, ‘নেতা ভালো, দল খারাপ’, তাদেরকে একটি প্রশ্ন মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। দল যদি সত্যিই এতটাই খারাপ হয়, তাহলে নেতৃত্ব ওই দলকে পরিবর্তন করতে পারেনি কেন? আর যদি নেতা পরিবর্তন করতে সক্ষম হন, তাহলে ওই পরিবর্তনের প্রমাণ কোথায়?
প্রশ্ন হলো, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দল কি এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে, যা তারেক রহমানের পরেও গণতান্ত্রিক থাকবে?
কারণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার দল বিএনপি পরস্পর বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সত্তা নয়। প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারম্যান এবং সরকার বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি সরকারের ওপর প্রভাব ফেলে, তাহলে ওই সংস্কৃতি পরিবর্তনের দায়িত্বও নেতৃত্বের।
আর যদি প্রধানমন্ত্রী সত্যিই দলীয় অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তাহলে সেটি আরও জোর দিয়ে বলা উচিত। প্রশ্ন হবে, তিনি কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন? দলীয় লোকজনকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না; যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না; দলের ভেতরে ভিন্নমত সহ্য করা হচ্ছে কি না; স্থানীয় নেতাদের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হচ্ছে কি না; সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা হচ্ছে কি না; সংসদীয় কমিটিকে কার্যকর করা হচ্ছে কি না; গণমাধ্যমকে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না।
এই জায়গাগুলোতে পরিবর্তন দেখা গেলে বলা যাবে, প্রধানমন্ত্রী দলীয় সংস্কৃতিকে বদলাচ্ছেন। তখন ‘প্রধানমন্ত্রী ভালো, বিএনপি খারাপ’ বলার প্রয়োজন থাকবে না; বলা যাবে, নেতৃত্ব দলকে বদলাচ্ছে।
সাজ্জাদ সাব্বির: এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। সূত্র: বিডিনিউজ২৪

