কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল নিজেকে টেকসই উন্নয়নের আলোকবর্তিকা হিসেবে তুলে ধরে আসছে। এই ভাবমূর্তির একটি বড় অংশ হলো দেশটির খাদ্য প্রযুক্তি শিল্প, বিশেষ করে পরীক্ষাগারে উৎপাদিত ও কোষ-চাষকৃত খাদ্যের ক্ষেত্রে এর সাম্প্রতিকতম অগ্রগতি।
গত এপ্রিলে, ইসরায়েলি ফুড টেক কোম্পানি সেলেস্তে বায়ো বিশ্বের প্রথম পরীক্ষাগারে তৈরি চকোলেট বার উৎপাদন করেছে বলে জানা গেছে। কোম্পানিটি একটি নিজস্ব প্রযুক্তির কথা প্রচার করে, যা কোকো শিল্পের “ভঙ্গুর বৃষ্টিবনের উপর ব্যয়বহুল নির্ভরতা” দূর করতে সক্ষম।
সেলেস্তে বায়ো-এর পেছনে রয়েছে মন্ডেলেজ ইন্টারন্যাশনাল, যা ক্যাডবেরি ও ওরিও-র মতো ব্র্যান্ডের শত কোটি ডলারের মূল সংস্থা। এর ফলে পরীক্ষাগারে তৈরি চকোলেট সাধারণ গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েল প্রায়শই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় খাদ্য প্রযুক্তি স্টার্টআপ দেশগুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এর প্রবক্তারা দাবি করেন যে, প্রচলিত কৃষির তুলনায় পরীক্ষাগারে উৎপাদিত খাদ্যে কম সম্পদের প্রয়োজন হয় এবং এটি পশু জবাইয়ের বিকল্প হতে পারে – আর এই সবকিছুই ঘটছে গাজায় চলমান গণহত্যা ও দুর্ভিক্ষের মধ্যেই।
ফুডওয়াশিং, অর্থাৎ মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য টেকসই খাদ্য সংগ্রহের পদ্ধতির ব্যবহার, ইসরায়েলের বৃহত্তর গ্রিনওয়াশিং কর্মসূচির একটি মূল অংশ। রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে তার মানবাধিকার লঙ্ঘনকে আড়াল করতে “পরিবেশবান্ধব” উদ্যোগের প্রচার করে।
কিন্তু ইসরায়েলের অবৈধ দখল এবং ফিলিস্তিনি ভূমির ধ্বংসযজ্ঞ জলবায়ু ন্যায়বিচারের পরিপন্থী এবং এটি পরিকল্পিতভাবে পরিবেশের উপর সর্বনাশ ঘটাচ্ছে। রাষ্ট্রের অন্যান্য সকল দিকের মতোই ইসরায়েলের খাদ্য প্রযুক্তি শিল্পও ফিলিস্তিনি সম্পদ চুরির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব টেকসই উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ইসরায়েল যে পানি ও শক্তি সংরক্ষণের বড়াই করে, তা ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়, যার ফলে তারা তাদের নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়।
পরিবেশগত বিপর্যয়
ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিবেশের আরও ক্ষতি করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, ফিলিস্তিনি জলবায়ু কৌশল উদ্যোগ (Pelantiness Initiative for Climate Strategy) জানায় যে, ১৯৪৮ সালের নাকবা থেকে শুরু করে ইসরায়েল ও তার মিত্ররা ফিলিস্তিনি জনগণের কাছে “সামরিক ও সংঘাত-সম্পর্কিত জলবায়ু ক্ষতিপূরণ” বাবদ ১৪৮ বিলিয়ন ডলার ঋণী। তারপর থেকে ইসরায়েল গাজায় বোমা হামলা অব্যাহত রেখেছে।
গাজার উপর ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ চলাকালীন, দেশটি এই ছিটমহলে দুই লক্ষ টনেরও বেশি বিস্ফোরক ফেলেছে , যার ফলে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে। জুলাই মাসে, অক্সফামের নির্দেশে তৈরি একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, গত তিন বছরে গাজার বর্জ্য জল পরিশোধন কেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে, যা একটি পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “পয়ঃনিষ্কাশন শোধনাগারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন কয়েক লক্ষ ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য পানি পরিবেশে এবং ভূমধ্যসাগরে নির্গত হচ্ছে, যা একাধারে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক জরুরি অবস্থা এবং পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, যার পরিণতি গাজার সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।”
অধিকৃত ফিলিস্তিন জুড়ে পরিবেশ ধ্বংস করার ইসরায়েলের সংকল্প বর্তমান গণহত্যার অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান, যার মধ্যে রয়েছে গাজার কৃষি জমিতে নিয়মিত রাসায়নিক আগাছানাশক স্প্রে করে হাজার হাজার ডুনাম আবাদি জমি ধ্বংস করা।
এছাড়াও, ইসরায়েলের জল-বর্ণবৈষম্য নীতি সক্রিয়ভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে। মানবাধিকার সংস্থা আল-হাক ব্যাখ্যা করেছে যে, কীভাবে ইসরায়েলের মিঠা পানির সরবরাহ অস্বীকার করা ফিলিস্তিনিদের লবণাক্ত পানি পরিশোধনের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য করে, যা এমন একটি প্রক্রিয়া যা “সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং সমুদ্রের স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে”।
একই সময়ে, ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ফিলিস্তিনিদের টেকসই জীবনযাত্রার চর্চাকে ব্যাহত করছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ জিরো ওয়েস্ট প্যালেস্টাইন’-এর প্রতিষ্ঠাতা নাজল্লা আবদেল্লাতিফ ‘মিডল ইস্ট আই’-কে বলেছেন যে, তিনি এমন ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনি কৃষকদের সঙ্গে দেখা করেছেন, যাদের ভূগর্ভস্থ পানির উৎস ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় পানি সরবরাহকারী সংস্থা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
আবদেল্লাতিফ বলেন, “কাছাকাছি বসবাসকারীরা ক্রমাগত তাদের পানির পাইপগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে এবং চুরি করছে, যা তাদের পানির নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং চড়া দামে তারা নিজেদের পানির উৎস পুনরায় কিনতে পারছে না। এটি তাদের খামার ও জীবিকা নির্বাহের সামগ্রিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।”
সম্পদের বঞ্চনা
আবদেল্লাতিফ বলেছেন, ইসরায়েলের উৎপাদিত খাদ্য শিল্প ফিলিস্তিন দখলদারিত্বকে স্বাভাবিকীকরণে আরও সাহায্য করে।
তিনি বলেন, “এটি তাদের দমন-পীড়ন ও ঔপনিবেশিকতাকে সবুজের আড়ালে ঢাকার এবং ‘সবুজ’ ও ‘টেকসই’ একটি ভাবমূর্তি দিয়ে বিশ্বের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার একটি উপায়। এর মাধ্যমে তারা ফিলিস্তিনের পরিবেশ ও সেখানকার মানুষের ওপর যে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে, সেই সত্যটিকেও উপেক্ষা করে।”
রামাল্লার নিকটবর্তী বিলিন গ্রামের একটি খামারের একজন প্রতিনিধি মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছেন যে, বর্ণবৈষম্যমূলক প্রাচীর থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে অবস্থিত খামারটি বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের কারণে জমি বাজেয়াপ্তকরণ এবং ইসরায়েলি অভিযানের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিণতির ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রতিনিধি বলেন, “এলাকা সি-তে থাকার কারণে আমরা ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত।”
আমাদের নিজেদের সম্পদ কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদের বর্জ্য নিয়ে কী করব বা কীভাবে তা সরাব, তা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাও আমাদের নেই… [ইসরায়েল] আমাদের ভূমিতে তার বর্জ্য, বিশেষ করে অত্যন্ত বিষাক্ত বর্জ্য, ফেলতেই থাকে। এই দখলদারিত্ব আমাদের জলবায়ু সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
প্রতিনিধিটি আরও বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিশ্বমঞ্চ থেকে বাদ দেওয়ার জন্য তাদের বিরুদ্ধে ‘গ্রিনওয়াশিং’কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, পরিবেশগত উদ্যোগগুলো থেকে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদলকে বয়কট করতে পশ্চিমাদের অস্বীকৃতি এই অপরাধে তাদের সহযোগী করে তোলে: “পশ্চিমারা ইসরায়েলের ‘গ্রিনওয়াশিং’-এর ভাষা গ্রহণ করে চলেছে এবং আমাদের অংশগ্রহণ ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে এমন সব জায়গা থেকে আমাদের বাদ দেওয়ার জন্য তা আমাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করছে।”
সরকারগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপের অভাবে, ভোক্তাদেরই এই বিষয়ে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে হবে। তাদের দেখতে হবে তাদের খাদ্যের উৎস কোথায় এবং নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে: যে সংস্থা গাজায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংকট তৈরি করেছে, আমাদের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে তাদের কি কোনো ভূমিকা থাকা উচিত?
- আসমা বারাকাত: অধিকৃত পশ্চিম তীরে কর্মরত একজন ফিলিস্তিনি ফ্রিল্যান্স লেখিকা। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

