ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা যখন বাংলার তরুণ সমাজকে আন্দোলিত করছিল, তখন সেই সংগ্রামের সামনের সারিতে উঠে এসেছিলেন এক তরুণী। নাম তাঁর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। মাত্র ২১ বছরের জীবনে তিনি শিক্ষকতা করেছেন, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে যুক্ত হয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন। বাংলার বিপ্লবী ইতিহাসে তাই তাঁর নাম আজও সাহস, আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের প্রতীক।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন প্রীতিলতা। তাঁর বাবা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভার হেড ক্লার্ক ছিলেন। মা প্রতিভাদেবী। ছয় ভাইবোনের মধ্যে প্রীতিলতা ছিলেন দ্বিতীয়। ছোটবেলায় মা তাঁকে আদর করে ‘রাণী’ বলে ডাকতেন।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব স্বচ্ছল না হলেও পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে শুরু হয় তাঁর শিক্ষাজীবন। মেধাবী ছাত্রী হিসেবে অল্প বয়সেই তিনি শিক্ষকদের নজর কাড়েন।
বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইতিহাসের শিক্ষিকা ঊষাদি তাঁকে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের সাহস ও সংগ্রামের গল্প শোনাতেন। এসব গল্প কিশোরী প্রীতিলতার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। একই সময়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে কল্পনা দত্তের সঙ্গে, যিনি পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
১৯২৮ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর প্রীতিলতা ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩০ সালের আইএ পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সম্মিলিত মেধাতালিকায় পঞ্চম স্থান অর্জন করেন। বৃত্তি নিয়ে এরপর তিনি কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হন।
দর্শনের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। উচ্চশিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নও ছিল তাঁর। কিন্তু একই সঙ্গে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাও ক্রমে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছিল।
শিক্ষকতা থেকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে
কলকাতায় থাকার সময় বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়। পরে চট্টগ্রামে ফিরে তিনি মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হন।
১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করে। সেই সময় প্রীতিলতা ধীরে ধীরে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামের নন্দনকানন গার্লস স্কুলে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব নেন। একদিকে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ানো, অন্যদিকে গোপনে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা—দুটি ভিন্ন জগতের দায়িত্ব তিনি একই সঙ্গে পালন করছিলেন।
পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ
১৯৩২ সালে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। ঔপনিবেশিক সমাজে ইউরোপীয়দের জন্য নির্ধারিত এই ক্লাবটি তৎকালীন ব্রিটিশ আধিপত্যের একটি প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। ক্লাবের প্রবেশপথে ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ-সংক্রান্ত একটি সাইনবোর্ড ছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সাইনবোর্ডটির সুনির্দিষ্ট ভাষা নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে মতভেদ রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ রাতে প্রীতিলতার নেতৃত্বে বিপ্লবীদের একটি দল পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণ চালায়। প্রায় ১৫ জনের দলটি অস্ত্র নিয়ে ক্লাবে প্রবেশ করে। হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় একজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হন।
অভিযানের একপর্যায়ে প্রীতিলতা নিজেও আহত হন। ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সহযোদ্ধাদের তথ্য প্রকাশ হয়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় তিনি সঙ্গে থাকা পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন।
সেদিনই, মাত্র ২১ বছর বয়সে, শেষ হয়ে যায় তাঁর জীবন।
ইতিহাসে প্রীতিলতার স্থান
প্রীতিলতার মৃত্যু ছিল একটি তরুণ জীবনের সমাপ্তি, কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ তাঁকে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত করে। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে শিক্ষিত তরুণী, শিক্ষক এবং বিপ্লবী—যে সময়ে নারীর সামাজিক ভূমিকা ছিল নানা বিধিনিষেধে আবদ্ধ।
তাঁর জীবন দেখিয়ে দেয়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন কেবল পুরুষ বিপ্লবীদের ইতিহাস ছিল না। নারীরাও সেই সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে জীবনও উৎসর্গ করেছেন।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জীবন তাই শুধু একটি বিপ্লবীর আত্মত্যাগের গল্প নয়; এটি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে একজন তরুণ নারীর দৃঢ় অবস্থানের ইতিহাস।
আত্মাহুতি দিবসে বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

