কিছু আবেগ বড্ড বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। হয়তো, সেগুলো বরাবরই এমন ছিল। যেমন ধরুন লজ্জার কথা: শারীরিক ক্ষমতা বা চেহারার মতো ব্যক্তিগত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো কিছুর জন্য লজ্জা পাওয়াকে সাধারণত নিরুৎসাহিত করা হয়। কিন্তু, চারিত্রিক ত্রুটি বা ক্ষতিকর কোনো কাজের জন্য লজ্জা না পাওয়াকে ভালো চোখে দেখা হয় না এবং সেটাই স্বাভাবিক।
ভুক্তভোগীকে লজ্জা দেওয়াটা কলঙ্ক আরোপের রূপও নেয়, কিন্তু সেটা অন্য দিনের আলোচনার বিষয়। আপাতত, লজ্জার অভাব এবং তা কীভাবে গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করে, সে সম্পর্কে নিউ ইয়র্কারের একটি সাম্প্রতিক শিরোনাম আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্রথমে বিষয়টি একটু বাড়াবাড়ি মনে হলেও, ভেবে দেখলে, রাজনীতি তো একটি আচরণগত বিজ্ঞান।
দেশে একটি সোশ্যাল মিডিয়ায় মিম বারবার ফিরে আসছে, যদিও যিনি এটিকে নতুন করে জনপ্রিয় করেছেন, তিনি ক্রমাগত সমালোচিত হচ্ছেন: “কোই শর্ম হোতি হ্যায়, কোই হায়া হোতি হ্যায়” (“লজ্জা আর শালীনতা বলে একটা ব্যাপার আছে”)।

শুধু রাজনৈতিক মহলেই নয়, বরং ক্ষমতাধর বহু মহল এবং তাদের অনুগামীদের মধ্যেও এই উভয়ের অভাব কেবল গণতন্ত্রেরই ক্ষতি করছে না, এটি জবাবদিহিতার ধারণাকেও ক্ষুণ্ণ করছে, যা সকল মানবিক প্রচেষ্টা ও ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আবশ্যক, বিশেষ করে সেইসব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যেগুলো প্রতিনিধিত্বমূলক হওয়ার ভান করে।
একটি সামাজিক চুক্তি, তা সংবিধানে আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করুক বা ঐতিহ্যে বিধিবদ্ধ হোক, যদি তা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক আইনি যাচাই ও ভারসাম্যের উপর নির্ভর করে, তবে তা ব্যাহত হবে। কারণ সামান্য ‘লজ্জা ও শালীনতা’ কেবল ক্ষতিকর কার্যকলাপই দমন করবে না, এটি লক্ষ লক্ষ মানুষকে মামলা-মোকদ্দমার খরচ থেকেও বাঁচাবে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে ব্যবস্থার উপর আস্থা হারানোর হাত থেকে রক্ষা করবে। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের জন্য সরকারি যানবাহন ও বাসস্থান দীর্ঘদিন ধরেই সিভিল সার্ভিস সংস্কার সমীক্ষার বিষয় হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে, কারণ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মেয়াদ বৃদ্ধি ও পরামর্শমূলক পরিষেবা প্রদান করা হচ্ছে যাতে তারা যানবাহন ধরে রাখতে পারেন এবং যে বাসস্থানগুলোকে তারা নগদায়নের প্রস্তাব দিয়েছেন, সেগুলো খালি করতে অস্বীকার করেন। এই আলোচনা এখন সরকারি পদাধিকারীদের জন্য বিমান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
| “লজ্জাহীনতা বিশ্বের ক্ষতি করছে” |
ঋণগ্রস্ত দেশগুলোতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে বিমান রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার বিষয়টি বাহ্যিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই সমস্যাজনক। একটি যুক্তি হলো, এতে যে সময় সাশ্রয় হয় তার প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বিবরণ প্রয়োজন। নিরাপত্তার দিকটি আরও বেশি বিরক্তিকর, কারণ যারা নিরাপত্তা বিপন্ন করছে, তারা বর্তমানে বা অতীতে কোনো না কোনো সময়ে রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল।
যখন এই বিমানগুলো ব্যক্তিগত ভ্রমণের জন্য (অপ)ব্যবহার করা হয়, তখন বিষয়টির চারপাশের পরিস্থিতি আরও উত্তাল হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট সভাসদদের যুক্তিগুলো পরিস্থিতিকে চরম অযৌক্তিক করে তোলে। পাঞ্জাবের প্রধান নির্বাহী মরিয়ম নওয়াজকে নিয়ে সাম্প্রতিক একটি ঘটনায়, প্রথমে তাকে সমালোচকদের তিরস্কার করতে শোনা যায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, একজন মুখ্যমন্ত্রীর কোনো কাজই পুরোপুরি ব্যক্তিগত নয়, যার মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন যে লন্ডনে তার মেয়ের স্নাতক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক কাজও সম্পন্ন হয়েছে। এরপর তার মুখপাত্ররা ঘোষণা করেন যে, তিনি এই ভ্রমণের খরচ নিজের পকেট থেকে দিয়েছেন। যেহেতু এই বিমানগুলোর উড্ডয়ন-ঘণ্টার একটি সীমা থাকে, তাহলে বিমানের অবচয়ের কী হবে?
মুখ্যমন্ত্রীর এই খামখেয়ালিপনার সবচেয়ে সোচ্চার সমালোচকরা পিটিআই-এরই লোক- সেই একই লোক, যারা প্রধানমন্ত্রী ভবন আর বানিগালার মধ্যে ইমরান খানের হেলিকপ্টার ভ্রমণ যে ট্যাক্সি ভাড়ার চেয়েও সস্তা, তা বোঝাতে গিয়ে আধভাঙা খাটুনি করেছিল। কিন্তু যে ব্যক্তি মনে করে নারীদের বাইক চালানো থেকে নিরুৎসাহিত করা উচিত, কারণ তার মতে তারা “ভয়ংকর চালক”, তার কাছ থেকে লজ্জা আর শালীনতা আশা করাটা অনেকটা জেলিফিশকে মেরুদণ্ড দেখাতে বলার মতো। যারা যুক্তরাজ্যে অর্থ পাচারের একটি মামলায় ফেরত আনা শত শত কোটি পাউন্ড এক অপরাধীকে উপহার হিসেবে ফিরিয়ে দিয়েছে, তাদের আবার “কোনো লজ্জা আছে কি…” জিজ্ঞেস করার ধৃষ্টতা।
‘সম্মান’ এমন একটি শব্দ যার ব্যবহারে সতর্কতা প্রয়োজন। দুর্বৃত্তদের হাতে, যখন এটি নারীদেহে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তা ‘সম্মান রক্ষার্থে’ হত্যার হাতিয়ারে পরিণত হয়। যেসব সমাজ শালীনতাকে উৎসাহিত করে, সেখানে সম্মানবোধের বশে ক্ষমতা ও দায়িত্বের পদে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষমা চাইতে এবং/অথবা পদত্যাগ করতে প্ররোচিত করা হয়। কিছু সংস্কৃতিতে, মানসম্মানহানির শিকার কর্মকর্তারা এই চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
বিশ্ব পশ্চাৎপদ হচ্ছে। আশা করা যায়, এটি একটি সাময়িক পর্যায় যা কেটে যাবে। জাতিসংঘে আমরা বক্তৃতা ছিঁড়ে ফেলা, মঞ্চের দিকে জুতো ছুঁড়ে মারা এবং দীর্ঘ ভাষণের মতো কাণ্ডকারখানার কথা শুনেছি। কিন্তু ‘নির্লজ্জ বাহিনীর’ প্রধানদের ৯ কোটি ১০ লক্ষ মানুষের ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’কে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দেওয়া এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য করে হত্যায় ব্যবহৃত একটি পরীক্ষামূলক যন্ত্র নিয়ে উল্লাস করা- এসব কেবল এই ব্যক্তিদেরই নয়, বরং যে ব্যবস্থাগুলো তাদের ক্ষমতার আসনে বসায় এবং তাদের সুবিধাভোগীদেরও প্রতিফলিত করে। এই নির্লজ্জতা প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের ক্ষতি করছে।
এদিকে দেশে ফিরে, কর ফাঁকিদাতা, অর্থ পাচারকারী, সুযোগসন্ধানী এবং সন্দেহজনক চরিত্রের লোকেরা তাদের তীর্থযাত্রা চালিয়ে যাচ্ছে। কবি আক্ষেপ করেছিলেন: “কাবা কিস মুঁহ সে যাও গে গালিব/ শর্ম তুম কো মগর নহি আতি” (“কাবায় কী মুখ দেখাবে/ কিন্তু তুমি তো নির্লজ্জ”)। যারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন, তারা একটি অনূদিত সিন্ধি প্রবাদে সান্ত্বনা খুঁজে নিতে পারেন: “রাজারা তারাই, যারা লজ্জার ভারে ভারাক্রান্ত নন।”
- শাহজাদ শারজিল: একজন কবি। তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থটি হলো ‘রিন্দানা’ শিরোনামের একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধ সংকলন। সূত্র: দ্য ডন

