আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য “The Age of Longevity: Rethinking Systems for Longer Lives”, বাংলায় ‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থাপনা পুনর্বিবেচনা’ মানুষের আয়ু বাড়ছে, কিন্তু শুধু বেশি দিন বেঁচে থাকাই যথেষ্ট নয়। বাড়তি বছরগুলো যেন স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সঙ্গে কাটে, এবারের প্রতিপাদ্য সেই প্রয়োজনের কথাই সামনে এনেছে।
প্রশ্নটি তাই সরল: মানুষ বেশি দিন বাঁচছে, কিন্তু আমরা কি তাঁকে বেশি দিন ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ দিতে পারছি?
দীর্ঘ জীবন মানবসভ্যতার বড় অর্জন। চিকিৎসাবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি, টিকাদান ও রোগ নিয়ন্ত্রণের ফলে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি দিন বাঁচছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২০ কোটি। ২০৫০ সালে তা বেড়ে ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। পৃথিবী শুধু জনসংখ্যায় নয়, বয়সের কাঠামোতেও বদলে যাচ্ছে।
কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, নগরপরিকল্পনা, সামাজিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক কাঠামো বদলেছে? উত্তরটি খুব স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ দীর্ঘায়ু তখনই আশীর্বাদ, যখন অতিরিক্ত বছরগুলো শুধু জীবনের ক্যালেন্ডারে যোগ হয় না, জীবনের মানেও যোগ হয়।
প্রবীণ মানেই ‘বোঝা’, এই ধারণা বদলাতে হবে
আমাদের সমাজে একটি পুরোনো মানসিকতা এখনো সক্রিয়: বয়স বাড়লে মানুষ অক্ষম হয়ে পড়েন, তাঁর সিদ্ধান্তের মূল্য কমে যায়, শেষ পর্যন্ত তিনি পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যান। এই ধারণা শুধু ভুল নয়, ক্ষতিকরও।
একজন প্রবীণ মানুষ কেবল তাঁর বয়স নন। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সম্পর্ক আর জীবনসংগ্রামের গল্প। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আর শ্রেণিকক্ষে না দাঁড়ালেও তাঁর অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাজে লাগতে পারে। সাবেক কর্মকর্তা প্রশাসনের বাস্তবতা জানেন, সাবেক ব্যাংকার জানেন অর্থনীতির ওঠানামা, কৃষক জানেন মাটির ভাষা, শ্রমিক জানেন শ্রমের মর্যাদা। এই অভিজ্ঞতা অব্যবহৃত রেখে দেওয়া সমাজের একটি বড় সম্পদ নষ্ট করা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (WHO) বলছে, বয়স মানুষের সক্ষমতার একমাত্র নির্ধারক নয়। সক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করে সামাজিক ও শারীরিক পরিবেশের ওপর। নিরাপদ পরিবহন, হাঁটার উপযোগী পথ, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা আর সহায়ক সামাজিক কাঠামো থাকলে প্রবীণরা অনেক বেশি স্বাধীন ও সক্রিয় থাকতে পারেন।
সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো রোগ নয়, নিঃসঙ্গতা
বার্ধক্যের একটি নীরব সংকট হলো নিঃসঙ্গতা। যিনি একসময় সংসারের কেন্দ্র ছিলেন, সন্তানদের বড় করেছেন, কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছেন, অবসরের পর তাঁর চারপাশ হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়। সন্তান কর্মব্যস্ত, নাতি-নাতনি মোবাইলে মগ্ন, প্রতিবেশীর সঙ্গে আগের সম্পর্ক নেই, কর্মজীবনের পরিচিতরাও দূরে সরে গেছেন। ফলে একই ঘরে থেকেও একজন প্রবীণ একা হয়ে যেতে পারেন।
WHO বলছে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতা প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। অর্থাৎ প্রবীণদের যত্ন শুধু হাসপাতাল, ওষুধ কিংবা চিকিৎসকের প্রশ্ন নয়, এটি সামাজিক সম্পর্কেরও প্রশ্ন। তাই শুধু বৃদ্ধাশ্রম বানিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। দরকার এমন পরিবেশ, যেখানে প্রবীণ মানুষ নিয়মিত মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন, সামাজিক কাজে অংশ নেবেন, নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করবেন এবং নিজেকে সমাজের প্রয়োজনীয় অংশ মনে করবেন।
বাংলাদেশের জন্য সংকেতটি আরও জরুরি
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু জনমিতিক পরিবর্তন আমাদেরও নতুন বাস্তবতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের জন্য পরিকল্পনা কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠীর জন্য আলাদা আয়োজন নয়, এটি আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের প্রস্তুতি।
তবে আমাদের শহরগুলো কি প্রবীণবান্ধব? একজন বৃদ্ধ কি নিরাপদে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পারেন? গণপরিবহনে উঠতে গিয়ে তাঁকে কি ঝুঁকি নিতে হয় না? সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো তাঁর জন্য কতটা সহজ? এই প্রশ্নগুলো ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানের।
ডিজিটাল যুগে নতুন বৈষম্য
ব্যাংকিং, চিকিৎসা, টিকিট, সরকারি সেবা, সবকিছু ক্রমেই অনলাইননির্ভর হচ্ছে। প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোয়, ডিজিটালভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের বাদ পড়ার ঝুঁকিও তত বাড়ে। একজন তরুণ কয়েক মিনিটে অ্যাপে যে সেবা পান, একজন প্রবীণকে হয়তো সেটির জন্য অন্যের সাহায্য নিতে হয়। এটি শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, মর্যাদারও প্রশ্ন। ডিজিটাল সেবা এমন হওয়া উচিত, যা মানুষের স্বাধীনতা বাড়ায়, নির্ভরশীলতা নয়। স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল সহায়তা ডেস্ক, সহজ প্রশিক্ষণ ও বিকল্প সেবা চালু করা যেতে পারে।
অবসর মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়
আমাদের সমাজে অবসরকে অনেক সময় জীবনের শেষ অধ্যায় ভাবা হয়: চাকরি শেষ, কাজও শেষ। এই ধারণাও বদলানো দরকার। অবসর কর্মজীবনের সমাপ্তি হতে পারে, কিন্তু জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অবদানের সমাপ্তি নয়। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তরুণদের পড়াতে পারেন, অভিজ্ঞ সাংবাদিক নতুনদের প্রশিক্ষণ দিতে পারেন, সাবেক কর্মকর্তা নীতি-পরামর্শ দিতে পারেন, উদ্যোক্তা তরুণদের মেন্টর হতে পারেন, দক্ষ কারিগর হাতে-কলমে শেখাতে পারেন।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে তাই শুধু সামাজিক নিরাপত্তার ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে জাতীয় সম্পদ হিসেবেও দেখতে হবে। জাতিসংঘও ২০২৬ সালের বার্তায় কর্মসংস্থান, পেনশন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও আজীবন শিক্ষাকে দীর্ঘ জীবন অর্থবহ করার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
পরিবারকে নতুন করে ভাবতে হবে
রাষ্ট্রের দায়িত্ব অবশ্যই আছে, কিন্তু প্রবীণদের মর্যাদা রক্ষার প্রথম জায়গা পরিবার। যে বাবা-মা সন্তানকে বড় করেছেন, বয়সের ভারে তাঁদের প্রয়োজনকে কেবল ‘দায়’ ভাবলে সম্পর্কের মানবিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়।
তবে যত্ন মানে নিয়ন্ত্রণ নয়। ‘আপনি এখন বয়স্ক, এসব আপনার বোঝার বিষয় নয়’, এই মনোভাবও এক ধরনের অবমূল্যায়ন। প্রবীণ মানুষেরও নিজের মতামত, পছন্দ, ব্যক্তিগত সময় ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। তাঁর দরকার শুধু খাবার ও ওষুধ নয়, সম্মানও।
রাষ্ট্রের করণীয়
দীর্ঘায়ুর যুগে নীতিনির্ধারণে কয়েকটি বিষয়কে এখনই গুরুত্ব দেওয়া দরকার:
১. প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বয়সজনিত রোগ, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, পুনর্বাসন ও জেরিয়াট্রিক সেবা শক্তিশালী করা।
২. প্রবীণবান্ধব নগরপরিকল্পনা: ফুটপাত, রাস্তা, পার্ক, গণপরিবহন, হাসপাতাল ও সরকারি ভবনে প্রবীণদের চলাচল সহজ করা।
৩. সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ: বয়স্ক ভাতার পাশাপাশি একা থাকা, আয়হীন, অসুস্থ বা পারিবারিক সহায়তাবঞ্চিত প্রবীণদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে আলাদা সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা।
৪. ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি: সহজ প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সেবায় মানবিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা।
৫. দ্বিতীয় কর্মজীবনের সুযোগ: সক্ষম ও আগ্রহীদের জন্য খণ্ডকালীন কাজ, পরামর্শক ভূমিকা, মেন্টরশিপ ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম।
৬. আন্তঃপ্রজন্ম সম্পর্ক জোরদার করা: স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় কমিউনিটির মাধ্যমে তরুণ-প্রবীণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়।
৭. প্রবীণ নারীদের বিশেষ বিবেচনা: জীবনভর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে অনেক নারী বার্ধক্যে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় আলাদা গুরুত্ব দেওয়া।
শুধু ভাতা দিলেই কি দায়িত্ব শেষ?
রাষ্ট্রীয় সহায়তা দরকার, কিন্তু শুধু ভাতা দিয়ে প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়া যায় না। একজন মানুষ হয়তো মাসিক ভাতা পাচ্ছেন, কিন্তু হাসপাতালের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারছেন না। ওষুধ পাচ্ছেন, কিন্তু একাকিত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু ডিজিটাল ব্যবস্থায় তা পরিচালনা করতে পারছেন না। পরিবারের সঙ্গে থাকছেন, কিন্তু পরিবারের সিদ্ধান্তে তাঁর কোনো জায়গা নেই। তাহলে তাঁর জীবনকে কি সত্যিই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করা গেছে?
এখানেই এবারের প্রতিপাদ্য আমাদের প্রচলিত চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করে: দীর্ঘ জীবন তৈরি হয়েছে, এখন সেই দীর্ঘ জীবনের উপযোগী ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
নতুন সামাজিক চুক্তির সময়
বাংলাদেশকে প্রবীণদের নিয়ে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির কথা ভাবতে হবে, যার কেন্দ্রে থাকবে তিনটি শব্দ: স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও অংশগ্রহণ। প্রবীণদের শুধু সেবাগ্রহীতা নয়, অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। তাঁদের জন্য নীতি তৈরির সময় তাঁদের মতামত নিতে হবে। কারণ তাঁদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত যদি তাঁদের বাদ দিয়েই নেওয়া হয়, সেই নীতি যত ভালোই হোক, তার মানবিক ভিত্তি দুর্বল থেকে যায়।
WHO-এর ‘Decade of Healthy Ageing 2021–2030’ উদ্যোগও বয়সবাদ সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো, বয়সবান্ধব পরিবেশ গড়া, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ওপর জোর দেয়।
আজকের প্রবীণ, আগামীর আমরা
আয়ু বাড়ছে, এটি সভ্যতার সাফল্য। কিন্তু জীবনের শেষ দশকটি যদি কাটে রোগভোগ, একাকিত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা আর অবহেলার মধ্যে, নিজের প্রয়োজনের কথা বলার অধিকারটুকুও যদি হারিয়ে যায়, তবে সেই সাফল্য অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
তাই প্রশ্নটা এখন বদলে নিতে হবে। “কত দিন বাঁচব?” নয়, জানতে চাইতে হবে “যত দিন বাঁচব, কেমন করে বাঁচব?”
আজ যাঁরা প্রবীণ, তাঁদের হাতেই গড়ে উঠেছে আমাদের বর্তমান। আজ যাঁরা তরুণ, কালের পরিক্রমায় তাঁরাই হবেন প্রবীণ। কাজেই প্রবীণদের জন্য একটি মানবিক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গড়া করুণা নয়, নিজেদেরই আগামীর জন্য বিনিয়োগ। একটি রাষ্ট্র কতটা মানবিক, তা বোঝা যায় অর্থনীতির আকারে নয়, তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটি কেমন আছেন তা দেখে।
দীর্ঘ জীবন আমরা পেয়ে গেছি। এবার সেই জীবনকে সুন্দর, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ করার পালা। দীর্ঘায়ুর যুগের এটাই বড় পরীক্ষা, আর বাংলাদেশের সামনে এটাই এখন সময়ের ডাক।

