বাংলাদেশের সুশীলসমাজকে নিয়ে আমাদের অনেক ভয়। তারা জাতির বিবেক। কিন্তু সব সময় তাদের বিবেক জাগ্রত হয় না। তাদের ঘুম ভাঙে হঠাৎ, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে। তারা যখন কথা বলেন, তখনই সাধারণ মানুষ সর্বনাশের গন্ধ পায়। এই যেমন সাম্প্রতিক সময়ে। বাংলাদেশের সুশীল সমাজের সদস্যরা সম্প্রতি জোটবদ্ধ হয়ে দুটি বিবৃতি দিয়েছেন।
দেশে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হলে বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা উদ্বিগ্ন হতেই পারেন। যেকোনো অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সুশীল সমাজ সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না। সব অনাচার তাদের বিবেককে জাগ্রত করে না। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে মাত্র সাত মাস হলো। একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এই সরকারের পক্ষে রাতারাতি সবকিছু ঠিকঠাক করা সম্ভব নয়। ইউনূসের দেড় বছরের শাসনকালে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটে। সেখান থেকে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়। তার ওপর একটি মহল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে। এরকম একটা অবস্থায় বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। যা অনাকাঙ্ক্ষিত। তাতেই আমাদের সুশীল সমাজ জেগে উঠেছে। এই বিবৃতি দেখে আমার মনে হয়েছে, এত দিন কোথায় ছিলেন? বিশেষ করে ইউনূসের দেড় বছরের শাসনকালে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে ভয়াবহ অবনতি ঘটেছিল তখন আমাদের সুশীল সমাজ নীরব ছিল কেন?
অসমাপ্ত আত্মজীবনী বই বিক্রিতে বাধা দেওয়ার কারণে ৩৬ জন সুশীল হাহাকার করেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী তো কেবল একটি বই। কিন্তু ইউনূস আমলে যে উপর্যুপরি তিনবার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ভাঙচুর করা হয়েছিল, সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সব স্থাপনা ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছিল, তখন আমাদের সুশীল সমাজ কেন কোনো প্রতিবাদ করেননি। তখন কেন জাতির বিবেকরা ঘুমিয়ে ছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই পাওয়া যায় সুশীল সমাজের এখনকার অবস্থানের আসল রহস্য। অতীতে আমরা লক্ষ্য করেছি যখনই একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে তখনই সুশীল সমাজের কয়েকজন ব্যক্তি সেই সরকারের সমালোচনা করার জন্য মুখিয়ে থাকেন। পান থেকে চুন খসলেই নির্বাচিত সরকারের তীব্র নিন্দা করেন। তারা এমনভাবে একটি জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন যে নির্বাচিত সরকার সঠিকভাবে কাজ করছে না। ২০০১ সালেও আমরা দেখেছি সুশীল সমাজ শুরু থেকেই বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। বিএনপির বিরুদ্ধে একের পর নানা অভিযোগ এনে জনসমক্ষে সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করাই ছিল সুশীল সমাজের প্রধান কাজ। অবশেষে তারা সেনা সমর্থনে ক্ষমতা দখল করে।
সুশীল সমাজের একটি অংশ ক্ষমতা দখলের পুরোনো খেলা শুরু করেছে কিনা, সেটাই প্রশ্ন। এই সময় যখন দেশে সংকট সমাধানে দরকার ঐক্য এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ঠিক তখনই দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। এমনসব বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করা হচ্ছে, যেজন্য সরকার মোটেও দায়ী নয়। বরং সরকারের পক্ষ থেকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। সেই সময় সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে এধরনের বিবৃতি সন্দেহের উদ্রেক করে।
এই লক্ষণগুলো এদেশের জনগণের কাছে পরিচিত।দেশে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত করতে, বিরাজনীতিকরণের জন্য কৃত্রিমভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা অতীতেও হয়েছে। এরকম পরিস্থিতি তৈরি করেই ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সুশীল সরকার ক্ষমতায় এসেছিল।
এ রকম একটা পরিস্থিতি হঠাৎ করেই হচ্ছে, নাকি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তৈরি করা হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। আমরা যদি ২০০৬ সালের বাংলাদেশের চিত্র দেখি, তাহলে সেই চিত্রের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের চিত্রটি অনেকটাই মিলে যায়। ২০০৬ সালের শেষদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল। রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছিল তারা ক্ষমতার জন্য। দেশজুড়ে রাজপথ, রেলপথ অবরোধ, নানা রকম কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যবসাবাণিজ্য অচল করে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় সুশীলরা দুই পক্ষের বিরোধ উসকে দেওয়ার জন্য আদাজল খেয়ে নেমেছিলেন।
টেলিভিশনে, সংবাদপত্রে তাঁদের বিভেদজাগানিয়া লেখা এবং কথা জাতিকে বিভ্রান্ত করেছিল। রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার বদলে সংঘাতের পথে প্ররোচিত করেছিল একটি মহল। উদ্দেশ্য ছিল দেশে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি। আর এ সুযোগেই ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে এক-এগারো সরকার ক্ষমতা দখল করে। এক-এগারো সরকার ক্ষমতা দখল করেই বাংলাদেশকে ধ্বংসের এবং বিরাজনীতিকরণের যে কার্যক্রম শুরু করে, তা থেকেই বোঝা যায় যে ২০০৬ সালের শেষ দিক থেকে যে ঘটনাগুলো বাংলাদেশে ঘটেছিল, সবই ছিল পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি নীলনকশার সুনিপুণ বাস্তবায়ন। এবারও কি সে রকম ঘটনাই হচ্ছে? এই জন্যই কি সুশীল সমাজের ঘুম ভেঙেছে?
আমাদের সুশীল সমাজ যদি ইউনূসের ভয়াবহ অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করত, তাহলে এখনকার বিবৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠত না। কিন্তু আমাদের সুশীল সমাজের দ্বিমুখী আচরণের কারণেই আমরা উদ্বিগ্ন। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে নয়, সুশীল সমাজের সাম্প্রতিক তৎপরতায় দেশের মানুষ সন্দিহান। সুশীল সমাজের একটি অংশ কি আবারও নতুন খেলায় জড়িয়ে পড়েছে?
লেখক: অদিতি করিম, লেখক ও নাট্যকার

