অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে এই খবর দিয়ে যে, ৪৫,০০০ ফিলিস্তিনি শিশু এখন ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত একটি পাঠ্যক্রমে পড়াশোনা করছে। এই সংখ্যাটি অধিকৃত অঞ্চলের মোট ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি এবং গত বছরের সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ।
এদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসবাসকারী তাদের অনেক শিক্ষককে শহরে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় খ্রিস্টান স্কুলগুলো ধর্মঘটের মাধ্যমে শিক্ষাবর্ষ শুরু করেছে।
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য, এটি দখলদার কর্তৃপক্ষের দ্বারা তাদের জাতীয় অধিকারের উপর আরও একটি হস্তক্ষেপ। ইসরায়েলের জন্য, এটি একটি ন্যায্য হস্তক্ষেপ, কারণ ফিলিস্তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ফিলিস্তিনি পাঠ্যপুস্তক এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত ফিলিস্তিনি শিক্ষকরা “ঘৃণা শেখায়”।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসারে, একটি দখলদার শক্তিকে অবশ্যই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম সহজতর করতে হবে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। জেনেভা কনভেনশনের প্রয়োগ তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সম্প্রতি হালনাগাদ করা ভাষ্যে বলা হয়েছে যে, একটি দখলদার শক্তি বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে তার নিজস্ব কাঠামো দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে বা নতুন পাঠ্যক্রম চাপিয়ে দিতে পারবে না।
তথাপি ফিলিস্তিনি শিক্ষায় ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ ব্যাপক এবং তা অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম ছাড়িয়ে অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং অতি সম্প্রতি গাজা উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত। বছরের পর বছর ধরে, একের পর এক ইসরায়েলি সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সরকারগুলোর কাছে সাহায্যের শর্ত আরোপ করে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (পিএ) তাদের পাঠ্যপুস্তক সংশোধনের জন্য চাপ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।
এদিকে, গাজার শিক্ষা ব্যবস্থার এই ধ্বংসযজ্ঞ পশ্চিমা দাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত এনজিওগুলোকে ইসরায়েল-অনুমোদিত পাঠ্যক্রম চালু করার সুযোগ করে দিয়েছে।
ইসরায়েলিদের এই যুক্তি যে, ফিলিস্তিনি শিশুদের স্কুলে ‘ঘৃণা করতে’ শেখা থেকে বিরত রাখার জন্য এসব করা প্রয়োজন, তা যাচাই-বাছাইয়ের মুখে টেকে না।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অর্থায়নে এবং ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি উভয় পণ্ডিতদের দ্বারা প্রস্তুতকৃত একটি গবেষণাসহ প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ফিলিস্তিনি পাঠ্যপুস্তকগুলো ইসরায়েলিদের প্রতি ঘৃণা ও অমানবিকীকরণকে উৎসাহিত করে না।
তাহলে ইসরায়েল আসলে ফিলিস্তিনি পাঠ্যপুস্তকে কী সংশোধন করতে চাইছে?
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ব্যবহৃত ইসরায়েলি-সম্পাদিত সংস্করণগুলোর সঙ্গে ফিলিস্তিনি পাঠ্যপুস্তকগুলোর তুলনা করে করা গবেষণায় দেখা গেছে যে, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের মতো ফিলিস্তিনি জাতীয় প্রতীক, ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্ব এবং ইতিহাসের উল্লেখগুলো অপসারণ বা পরিবর্তন করা হয়েছে।
২০২৫ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের উপর করা একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ইসরায়েলি পরিবর্তনগুলোর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে “প্যালেস্টাইন”-এর পরিবর্তে “ইসরায়েল” ব্যবহার করা এবং দখলদারিত্বের বাস্তবতা সম্পর্কিত অংশগুলো বাদ দেওয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইসরায়েল ফিলিস্তিনি পাঠ্যপুস্তক থেকে দখলদারিত্ব, ফিলিস্তিনি ইতিহাস এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের উল্লেখ মুছে ফেলতে চায়। এর কারণ এই নয় যে এগুলো “ঘৃণা শেখায়”, বরং কারণ হলো এগুলো ফিলিস্তিনি শিশুদের জাতীয় চেতনা শেখায়—এমন একটি বিষয় যার বিরুদ্ধে ইসরায়েল তার নিজের সৃষ্টির পর থেকেই লড়াই করে আসছে এবং দাবি করে যে “ফিলিস্তিনি বলে কোনো জাতি নেই”।
এই কারণেই পূর্ব জেরুজালেমে পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে শুধুমাত্র একটি ইসরায়েলি পাঠ্যপুস্তকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে বোঝা উচিত নয়। অনেক অভিভাবক, শিক্ষক এবং বিদ্যালয়ের আশঙ্কা হলো, ইসরায়েলি পাঠ্যক্রম গ্রহণ করার অর্থ হলো জেরুজালেমকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং এর ভেতর থেকে ফিলিস্তিনি পরিচয় মুছে ফেলাকেও মেনে নেওয়া।
শিক্ষা উপকরণ থেকে দখলদারিত্ব, নাকবা, শরণার্থী, প্রত্যাবর্তনের অধিকার, ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় প্রতীকের মতো ধারণাগুলো বাদ দিলে তা ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক পরিচয়কে সেই ঐতিহাসিক আখ্যান থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে, যা এই দাবিগুলোকে অর্থবহ করে তোলে।
যেখানে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি পাঠ্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ ও রূপদান করার সুযোগ পায়, সেখানে তার পশ্চিমা মিত্ররা ইসরায়েলি পাঠ্যক্রমে ইসরায়েলি শিশুদের কী শেখানো হচ্ছে, তা খুব কমই খতিয়ে দেখে।
তার বই ‘প্যালেস্টাইন ইন ইসরায়েলি স্কুল বুকস’-এর জন্য ইসরায়েলি ভাষাতাত্ত্বিক নূরিত পেলেদ-এলহানান অসলো-পরবর্তী বছরগুলোতে প্রকাশিত ইসরায়েলি ইতিহাস ও ভূগোলের পাঠ্যপুস্তকগুলো অধ্যয়ন করেন এবং বর্ণবাদী ধারণার ব্যাপক ব্যবহার ও ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব বিলোপের বিষয়টি আবিষ্কার করেন। উপসংহারে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, ইসরায়েলি শিক্ষার্থীরা ইসরায়েলি স্কুল থেকে স্নাতক হয়ে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় যোগ দেয় ফিলিস্তিনিদের প্রতি “বিদ্বেষ ও ভয় পোষণ করতে শেখানো” হয়ে এবং তাদের “জীবন-জগৎ” সম্পর্কে কোনো জ্ঞান ছাড়াই।
ইসরায়েলি গবেষক ইয়েল টেফ-সেকারের করা ইহুদি ইসরায়েলি স্কুলগুলোতে ব্যবহৃত ১২৩টি পাঠ্যপুস্তকের ওপর আরেকটি সাম্প্রতিক গবেষণায় শক্তিশালী জাতিগত কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, ইহুদিদের নিপীড়িত হওয়ার এক অবিরাম অনুভূতি এবং ফিলিস্তিনি আখ্যানের জন্য তুলনামূলকভাবে কম সুযোগ পাওয়া গেছে।
লেখক উল্লেখ করেছেন যে, আরব দেশগুলোর সাথে শান্তির ধারণাকে ইতিবাচকভাবে বর্ণনা করা হলেও, দখলদারিত্বকে “নিরপেক্ষভাবে, কোনো বিচার ছাড়াই” বর্ণনা করা হয়েছে, এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে কখনও কখনও অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিবর্তে জুডিয়া ও সামারিয়ার মতো ইসরায়েলি নামে উল্লেখ করা হয়।
আরেকজন ইসরায়েলি শিক্ষাবিদ, রয় উইনট্রবের সহ-রচিত একটি গবেষণাপত্রে অনুসন্ধান করা হয়েছে যে, ফিলিস্তিনি পরিচয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে রূপদানকারী অন্যতম কেন্দ্রীয় ঘটনা নাকবাকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় পাঠ্যক্রমে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইসরায়েলি পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষণ উপকরণে এই পরিভাষাটি “আংশিকভাবে উপস্থিত” এবং “অধিকাংশ শিক্ষণ উপকরণই ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বাহিনীর গৃহীত পদক্ষেপকে সমর্থন করে”। গবেষণাপত্রটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়: “পাঠ্যক্রমে কঠিন ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তা অভিজ্ঞতালব্ধ দুর্ভোগ ও অবিচারের সমালোচনামূলক উপলব্ধিকে উৎসাহিত করে না।”
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সম্পর্কের পাঠ্যক্রম নিয়ে সমস্যাটি শুধু শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পরিধি আরও বড়। এটি ক্ষমতার বিষয়। যখন এক পক্ষ ভূমি, চলাচল, অনুমতিপত্র, বাজেট এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে এবং অপর পক্ষ তার সন্তানদের কাছে যে ভাষায় সেই বাস্তবতা তুলে ধরে, তাকেও প্রভাবিত করতে পারে, তখন শ্রেণিকক্ষটিই সেই সংঘাতের আরেকটি ময়দানে পরিণত হয়।
ফিলিস্তিনি পাঠ্যপুস্তক নিয়ে সংগ্রামটি শুধু শিশুরা কী শিখবে তা নিয়ে নয়। এটি এই বিষয় নিয়েও যে, প্রথমত কোনটি বৈধ ইতিহাস হিসেবে গণ্য হবে, তা নির্ধারণ করার কর্তৃত্ব কার আছে।
- ইহাব জাবরিন: ইসরায়েলের অধিবাসী একজন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক, যিনি ইসরায়েলি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। সূত্র: আল-জাজিরা

