গ্রেপ্তার ও অভিযানে দৃশ্যমান কিশোরেরা ধরা পড়ে, কিন্তু নেপথ্যের কাঠামো থেকে যায় অক্ষত। সমাধান খুঁজতে হবে পরিবার, শিক্ষা, নগর-পরিবেশ ও পুনর্বাসনের মধ্যে।
একদল কিশোর গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কারও হাতে স্মার্টফোন, কারও চোখে আগ্রাসন, কারও সঙ্গে মোটরসাইকেল। তাদের ঘিরে স্থানীয়দের আতঙ্ক। কোথাও মারামারি, কোথাও ছিনতাই, কোথাও মাদক, কোথাও আবার প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন। কিছুদিন পর অভিযান: কয়েকজন আটক, মামলা, ছবি, সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা। তারপর?
আবার সেই গলি। আবার নতুন মুখ। আবার নতুন দল।
তাহলে প্রশ্নটা আসলে কোথায়? আমরা কি কিশোর গ্যাং দমন করছি, নাকি শুধু কিশোরদের ধরে এনে সমস্যাটিকে সাময়িকভাবে আড়াল করছি?
কিশোর গ্যাংকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে সমস্যাটির একটি অংশই দেখা হবে। কারণ একটি কিশোর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অপরাধী হয়ে যায় না। তার পেছনে থাকে পরিবার, বন্ধুমহল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক পরিবেশ, মাদক, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী নেটওয়ার্কের প্রভাব।
অর্থাৎ কিশোর গ্যাংয়ের গল্পটি কেবল কয়েকজন কিশোরের গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজেরও গল্প।
গ্রেপ্তার হচ্ছে, কিন্তু গ্যাং কি শেষ হচ্ছে?
অপরাধ করলে আইনগত ব্যবস্থা নিতেই হবে। জননিরাপত্তা রক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না: গ্রেপ্তার ও মামলা কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান?
একজন কিশোরকে আটক করা হলো। মামলা হলো। সে কিছুদিন একটি প্রতিষ্ঠানে থাকল। এরপর একসময় আবার সমাজে ফিরে এল। কিন্তু তার জীবনে কী পরিবর্তন হলো? সে কি শিক্ষা ফিরে পেল? কোনো পেশাগত দক্ষতা অর্জন করল? মানসিক ও সামাজিক সহায়তা পেল? পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ পেল? পুরোনো অপরাধী চক্র থেকে বেরিয়ে আসার পথ পেল?
যদি এসব প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে কেবল আটক বা মামলা দিয়ে আমরা কী অর্জন করছি? সম্ভবত সাময়িক স্বস্তি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
কারণ একটি কিশোরকে সমাজে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় যদি তার হাতে ভবিষ্যতের কোনো পথ না থাকে, তাহলে সে আবার সেই পুরোনো গলিতেই ফিরে যেতে পারে।
এই কিশোরের পেছনে কারা?
‘কিশোর গ্যাং’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে কয়েকজন কিশোরের মুখ। কিন্তু তদন্তের প্রশ্নটি সেখানে থেমে গেলে চলবে না।
একজন কিশোর অস্ত্র পেল কোথা থেকে? মাদক এলো কোথা থেকে? অপরাধের অর্থ জোগাল কে? কারা তাদের ব্যবহার করছে? কারা তাদের আশ্রয় দিচ্ছে? কারা অপরাধের পর তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করা হলে অপরাধের দৃশ্যমান অংশটিই ধরা পড়বে। নেপথ্যের কাঠামো থেকে যাবে অক্ষত।
কিশোর অপরাধের দৃশ্যমান মুখ কিশোর হতে পারে; কিন্তু অপরাধের নেপথ্যের শক্তি সবসময় কিশোর নয়।
সুতরাং কিশোর গ্যাং নিয়ে তদন্ত হলে শুধু ‘কে অপরাধ করেছে’ নয়, ‘কে তৈরি করেছে, কে ব্যবহার করেছে এবং কে লাভবান হচ্ছে’, এই প্রশ্নগুলোরও উত্তর খোঁজা জরুরি।
পরিবারে সন্তান আছে, অভিভাবকত্ব কোথায়?
কিশোর অপরাধের আলোচনা হলেই পরিবারের দায়ের কথা ওঠে। নিঃসন্দেহে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু বাবা-মাকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
আজকের নগরজীবনে অনেক বাবা-মা দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে থাকেন। সন্তান বড় হয় স্কুল, কোচিং, বন্ধুমহল ও ডিজিটাল জগতের মধ্যে। একই ঘরে থেকেও বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের কথোপকথন নেই, এমন পরিবারও কম নয়। সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই ফোনে সে কী দেখছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, কোথায় যাচ্ছে, সেসব জানার সময় বা সক্ষমতা অনেক পরিবারের নেই।
অভিভাবকত্ব তাই শুধু অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়। সন্তানের মানসিক পরিবর্তন বোঝা, বন্ধুত্বের ধরন জানা, আচরণের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন হলে সময়মতো সহায়তা নেওয়াও এর অংশ।
তবে পরিবারকে দোষারোপের আগে রাষ্ট্র ও সমাজকেও প্রশ্ন করতে হবে: পরিবারগুলোকে সহায়তা করার মতো সামাজিক কাঠামো আমরা কতটা তৈরি করেছি?
স্কুল কি শুধু পরীক্ষার ফলাফল আর পরিক্ষার্থী তৈরি করবে?
একজন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল, তার ফলাফল কত, এসব নিয়ে আমাদের উদ্বেগের শেষ নেই। কিন্তু সে সহপাঠীর সঙ্গে কেমন আচরণ করছে? বুলিং করছে কি না? সহিংসতাকে কীভাবে দেখছে? মাদক সম্পর্কে তার ধারণা কী? অনলাইনে তার আচরণ কেমন? মানসিক সংকটে পড়লে সে কার কাছে যাবে? এসব প্রশ্ন শিক্ষা ব্যবস্থার মূল আলোচনায় কতটা জায়গা পায়?
শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার ফল তৈরি করে, তাহলে আমরা পরীক্ষার্থী তৈরি করতে পারি; কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করার নিশ্চয়তা দিতে পারি না।
একজন কিশোরের জীবনে খেলাধুলার মাঠ নেই, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নেই, বিতর্ক নেই, বই পড়ার পরিবেশ নেই, সামাজিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নেই, তখন অপরাধী চক্র যদি তাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হওয়ার অনুভূতি দেয়, সেটি তার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
সমাজ যখন বৈধ পরিচয়ের জায়গা সংকুচিত করে, অপরাধী চক্র তখন বিকল্প পরিচয়ের বাজার খুলে দেয়।
গলির অন্ধকারও অপরাধের অংশ
কোন এলাকায় অপরাধ বেশি হচ্ছে, কোথায় মাদক বিক্রি হচ্ছে, কোথায় আলো নেই, কোথায় পরিত্যক্ত স্থাপনা অপরাধীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে, কোথায় স্কুল থেকে ঝরে পড়া কিশোরের সংখ্যা বেশি, এসব তথ্য একত্র করে বিশ্লেষণ করা জরুরি। কিশোর গ্যাং দমনে তাই শুধু অভিযান নয়, তথ্যভিত্তিক পুলিশিং প্রয়োজন।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করতে হবে। অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ, প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে হবে।
অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধ ঘটার সুযোগ কমিয়ে দেওয়া। একটি অন্ধকার গলি, একটি পরিত্যক্ত ভবন, একটি মাদক বিক্রির স্পট কিংবা নজরদারিহীন একটি এলাকা কখনোই কেবল ‘পরিবেশগত সমস্যা’ নয়; এগুলো অপরাধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সংশোধনাগার যদি শুধু আটকের জায়গা হয়
কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে সংশোধন ও পুনর্বাসনের কথা বলা হয়। কিন্তু সংশোধন মানে কি শুধু আটক রাখা?
একজন কিশোরকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে হলে তার আচরণগত সহায়তা, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং, পরিবারকে সম্পৃক্ত করা এবং সমাজে ফেরার পর সহায়তার ব্যবস্থা প্রয়োজন। মুক্তির পর যদি সে আবার একই বন্ধুমহলে ফিরে যায়, একই পরিবেশে যায় এবং জীবিকার কোনো বৈধ পথ না পায়, তাহলে তাকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার দায়িত্ব কোথায়?
পুনর্বাসন তাই কোনো আনুষ্ঠানিক শব্দ নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
কিশোরকে আটকে রাখা সহজ; তাকে বদলে দেওয়া কঠিন। কিন্তু রাষ্ট্রের আসল সক্ষমতার পরীক্ষা সেখানেই।
বিচার হতে হবে দ্রুত, কিন্তু ন্যায়সঙ্গত
অপরাধের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিরও ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার অধিকার আছে।
তাই কিশোর অপরাধের মামলায় তদন্ত হতে হবে পেশাদার ও প্রমাণনির্ভর। ডিজিটাল প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ফরেনসিক তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ যথাযথভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে। বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকলে ভুক্তভোগী যেমন ক্লান্ত হন, তেমনি বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অপরাধ দমনের অর্থ শুধু বেশি মামলা নয়। সঠিক তদন্ত, যথাযথ প্রমাণ এবং ন্যায়সঙ্গত বিচার, তিনটিই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
কিশোর গ্যাং আসলে সমাজের আয়না
সবশেষে প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে: কিশোর গ্যাং কি শুধু গলির অপরাধ? না, এটি তার চেয়ে বড় কিছু।
এটি পরিবারে যোগাযোগের ঘাটতির প্রতিচ্ছবি হতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার, নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতার, মাদক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার, আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থার দুর্বলতারও প্রতিচ্ছবি হতে পারে। আর কখনো কখনো এটি বড়দের অপরাধী নেটওয়ার্কেরও প্রতিচ্ছবি।
তাই কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু কয়েকজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করা নয়। লড়াইটি হতে হবে সেই পরিবেশের বিরুদ্ধে, যেখানে একটি শিশু ধীরে ধীরে অপরাধকে স্বাভাবিক ভাবতে শেখে।
একটি কিশোরের হাতে যখন অস্ত্র ওঠে, তখন প্রশ্ন করা জরুরি: সে অস্ত্র ধরেছে কেন? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যদি আমরা শুধু কিশোরের হাতের দিকে তাকাই, তাহলে হয়তো হাতটি দেখতে পাব; কিন্তু যে হাত অস্ত্রটি তার হাতে তুলে দিয়েছে, সেটি অদৃশ্যই থেকে যাবে।
কিশোর গ্যাং তাই শুধু গলির অপরাধ নয়, এটি আমাদের সমাজের আয়না। সেই আয়নায় শুধু কিশোরের মুখ নয়, আমাদের নিজেদের মুখও দেখা যায়।
এখন সিদ্ধান্ত আমাদের: আমরা কি শুধু আয়নাটি ভাঙব, নাকি আয়নায় দেখা সমস্যাটিও বদলাব?

