রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার আকাশযুদ্ধ এই সংঘাতের শুরু থেকেই এক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলো রাশিয়ার নতুন ধরনের দূরপাল্লার জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোন মোতায়েন। এই ড্রোনের কারণে আকাশপথের হামলা থেকে ইউক্রেনের শহরগুলোকে রক্ষা করা বেশ কঠিন হয়ে গেছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ফাইনান্সিয়াল টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল ইউরি ইহনাত জানান, রাশিয়া ব্যবহৃত নতুন ‘গেরান-৫’ ড্রোনের মাধ্যমে চালানো হামলার মাত্র ৬০ শতাংশ প্রতিহত করতে পারছে ইউক্রেন। অথচ অন্যান্য মডেলের ড্রোনের ক্ষেত্রে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ৯৫ শতাংশ হামলা সফলভাবে ঠেকিয়ে দিতে পারে।
গেরান-৫ ড্রোনের বেলনাকার ফিউজেলেজ (মূল দেহ) এবং সোজা ডানার কারণে—এটিকে প্রথাগত দূরপাল্লার ড্রোনের চেয়ে ক্রুজ মিসাইলের মতোই বেশি দেখায়। রাশিয়ার সূত্রগুলো জানায়, এটি ১,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এবং সর্বোচ্চ প্রায় ৬,০০০ মিটার উচ্চতায় উড়তে পারে—যা এর পূর্বসূরি ড্রোনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
আগের মডেলগুলোর তুলনায় ‘গেরান-৫’ ড্রোন অনেক বেশি দ্রুত গতিসম্পন্ন, যার আনুমানিক সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৬০০ কিলোমিটার। এছাড়া এই সংস্করণে যুক্ত হয়েছে ‘অ্যান্টি-জ্যামিং’ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এই সব বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে ইউক্রেনের ভূমি-ভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য—এই ড্রোনগুলো মাঝআকাশে প্রতিহত করা বিশেষভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইহনাত জানান, গত আগস্ট থেকে রাশিয়া এই গেরান-৫ ড্রোন ব্যবহার শুরু করে। তারপর থেকে এগুলো ঠেকাতে ইউক্রেনকে ব্যাপকভাবে তাদের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় যুদ্ধবিমান দিয়ে সরাসরি তাড়া করে এসব ড্রোন ভূপাতিত করতে বাধ্য হচ্ছে দেশটি।
গেরান-৫-এর কার্যকারিতা কেবল তার গতি বা পাল্লার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ ইউরি কনুতভের মতে, এই ড্রোনগুলোতে ডিজিটাল ভূখণ্ডের মানচিত্র যুক্ত ‘মেশিন ভিশন’প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা এসব ড্রোনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও নির্দিষ্ট করার সক্ষমতা দেয়।
২০২২ সালে রাশিয়া পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালায় ইউক্রেনে। এরপরে ইউক্রেনের আকাশে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা ছিল প্রত্যাশিত কৌশলের—যেখানে উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর করেছিল। সেসময় বিমানের দুটি নির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল: শত্রুপক্ষের বিমানের সাথে সরাসরি আকাশযুদ্ধে লিপ্ত হওয়া এবং পদাতিক বাহিনীকে সহায়তা দিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো।
তবে দ্রুতই সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। উভয় পক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে যুদ্ধবিমানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে থাকায়—ইউক্রেনের আকাশযুদ্ধটি কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখা বা ‘স্ট্যান্ড-অফ’ কৌশলের দিকে মোড় নেয়। যেখানে যুদ্ধবিমান সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর ওপর না গিয়ে— আরও দূরে অবস্থান করে হামলা চালানোর কৌশল বেশি বেশি প্রয়োগ করতে থাকে।
২০২৩ সাল থেকে রাশিয়ার বিমানবাহিনী ব্যাপকভাবে ‘গ্লাইড বোমা’ ব্যবহার শুরু করে। স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী ডানা এবং নেভিগেশন প্রযুক্তি যুক্ত এই বোমাগুলো লক্ষ্যবস্তু থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূর থেকে নিক্ষেপ করা যায়, ফলে বেশিরভাগ বিমান-বিধ্বংসী ব্যবস্থার নাগালের বাইরে থেকেই হামলা করা যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে বোমা ফেলার ক্ষেত্রে এটি ছিল তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ এক মাধ্যম।
কিন্তু খুব শিগগিরই আকাশযুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে ড্রোন। এতে কোনো বৈমানিকের জীবন হারানোর ঝুঁকি ছিল না। তাছাড়া গঠনগত দিক থেকে সহজ হওয়ায় কম খরচে বিপুল পরিমাণে তৈরি করা যায়। ছোট আকারের ড্রোনগুলো উভয় পক্ষই ফ্রন্টলাইন বা যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি ব্যবহার করেছে, অন্যদিকে বড় ও দূরপাল্লার ড্রোনগুলো ইউক্রেন ও রাশিয়ার ভেতরের গভীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
শুরুর দিকের দূরপাল্লার ড্রোনগুলোর অবশ্য বড় সমস্যাও ছিল। কারণ, তখন সহজেই এগুলোকে ভূপাতিত করা যেত। প্রোপেলারচালিত হওয়ার দরুন এগুলো বেশ ধীরগতির হতো। গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়ার ব্যবহৃত প্রধান দূরপাল্লার ড্রোনের মধ্যে ছিল প্রোপেলারচালিত গেরান-১ এবং গেরান-২—যেগুলো মূলত ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের উন্নত রুশ সংস্করণ।
২০২৫ সালে প্রথম জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোন ‘গেরান-৩’ যুদ্ধক্ষেত্রে নামানো হয়। গেরান-২-এর গতি যেখানে ছিল ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার, সেখানে গেরান-৩-এর গতি ঘণ্টায় ৩৩০ কিলোমিটারে উন্নীত হয়। অর্থাৎ, এটি আগের সংস্করণটির চেয়ে অনেক দ্রুতগতির ছিল। তবে গেরান-২-এর আড়াই হাজার কিলোমিটার পাল্লার তুলনায় গেরান-৩-এর পাল্লা ছিল মাত্র ৬০০ কিলোমিটার। তবে গেরান-৩ আরও উঁচুতে উড়তে পারত, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে এর ঝুঁকি কমায়।
ওই বছরের শেষের দিকে ইউক্রেনের আকাশে আবির্ভূত হয় জেটচালিত গেরান-৪, যার সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ৫০০ কিলোমিটার এবং পাল্লা ৮৫০ কিলোমিটার। আর ২০২৬ সালের আগস্টে অধিকতর গতি ও দীর্ঘতর পাল্লা নিয়ে রুশ বাহিনী প্রথমবারের মতো ব্যবহার করে গেরান-৫ ড্রোন।
ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা– গেরান-৫ ড্রোনে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশের বিশদ তথ্য প্রকাশ করেছে, যা এর সরবরাহ শৃঙ্খলে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর ব্যাপক নির্ভরতাকে তুলে ধরে। এই ড্রোনের জেট ইঞ্জিনটি চীনের তৈরি, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছে এটির ডিজিটাল প্রসেসর এবং জার্মানির প্রস্তুতকৃত ট্রানজিস্টর এতে যুক্ত করা হয়েছে।
যন্ত্রাংশের এই তালিকা থেকে বোঝা যায়, পশ্চিমাদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়া অত্যন্ত সহনশীল ও বিকল্প একটি সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে পেরেছে। যার মাধ্যমে দেশটি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য প্রযুক্তি সংগ্রহ করছে। এরপর সেগুলো দেশে এনে সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ড্রোন উৎপাদন করছে।
একই সাথে রাশিয়া এই নতুন জেটচালিত ড্রোনগুলো বিপুল পরিমাণে উৎপাদনেও সক্ষম হচ্ছে। ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের মতে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আসন্ন শীত ও শরৎকালীন অভিযান শুরুর আগে—ড্রোন মজুত বাড়াতে রাশিয়া এখন গেরান-৪ এবং গেরান-৫ উৎপাদনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত বিপর্যয়কর প্রমাণিত হতে পারে, কারণ পশ্চিমা বিশ্বের সরবরাহ করা ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে। গেরান-৫ ড্রোন ধ্বংস করার ক্ষেত্রে একমাত্র এই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রই সত্যিকার অর্থে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে।
গত আগস্টে ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার উপ-প্রধান মেজর জেনারেল ভাদিম স্কিবিটস্কি এই আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, রাশিয়ার এই নতুন জেটচালিত ‘গেরান’ ড্রোনগুলোকে মাঝআকাশে প্রতিহত করতে ইউক্রেনের এখন নতুন ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন।
- মেরিনা মিরন: কিংসবেরি কলেজ লন্ডনের ওয়ার স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের পোস্টডক্টোরাল গবেষক। রড থর্নটন একই প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিভাগের ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রভাষক। সূত্র: এশিয়া টাইমস

