গত রাতে আমি আবার হগওয়ার্টসের স্বপ্ন দেখলাম। সত্যিই, হ্যারি পটার ও হগওয়ার্টস—যে বোর্ডিং স্কুলের পটভূমিতে এই সিরিজটি তৈরি—পুনরায় দেখার এটাই উপযুক্ত সময়। কারণ এখানে পাকিস্তানে আমরা সম্ভাব্য সবচেয়ে ‘বিভ্রান্তিকর’ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। নিশ্চিতভাবেই, ‘কনফান্ডাস চার্ম’ যেন সবার ওপরেই প্রয়োগ করা হয়েছে। আর তার ফল হলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়েও বেশি বিভ্রান্তি।
চলুন শুরু থেকে শুরু করা যাক। ইদানীং, আমাদের মধ্যে থাকা ভবিষ্যদ্বক্তারা, যেমন প্রফেসর ট্রেলাওনি, খুব কমই তাদের ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক করতে পেরেছেন। দিনের পর দিন তারা অশুভ ইঙ্গিত দিয়ে আমাদের বলছিলেন যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে।
প্রথমে এসেছিল সোহেল আফ্রিদির বিদায় নিয়ে সতর্কবার্তা। কয়েক দিনের মধ্যেই আমাদের আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। আর তারপর চা পাতা খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থার পূর্বাভাস দিয়েছিল। স্পষ্টতই, ওটাই ছিল একমাত্র প্রদেশ যেখানে একটি অকার্যকর সরকার ছিল—বাকি সবাই ট্রাইউইজার্ড কাপ জেতার পথে এগিয়ে চলেছে।
কিন্তু এই পাতা-পাঠকদের কোনো পরিণতির সম্মুখীন হতে হয় না। প্রকৃতপক্ষে, তাদের যোগ্যতার জন্য তাদের নিয়োগ দেওয়াও হয়নি। তাদের অনেকের কাজ ছিল না প্রতিবেদন করা, বিশ্লেষণ করা বা যোগাযোগ স্থাপন করা।
বরং, আরামদায়ক চাকরিতে থেকে তারা হ্যারি পটার সিরিজের ‘হাউলার’ চরিত্রটির মতোই কাজ করে—যারা বিরাগভাজন হয়েছে, তাদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেয় এবং কাজ শেষ হলে ‘আত্ম-ধ্বংস’ হয়ে যায়।
বার্তা পাঠানোর সঙ্গে মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতার তেমন কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না—এই ‘সাংবাদিকদের’ জন্যও নয়, কিংবা সেই রাজনীতিবিদদের জন্যও নয়, যারা একই ধরনের সতর্কবার্তা টুইট করেন।

যাই হোক না কেন, সমস্যাটা বার্তাবাহকদের নিয়ে ততটা নয়, যতটা তাদের পথপ্রদর্শক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে। যারা তাদের একদিন অযোগ্যতার ঘোষণা দিতে, তো পরদিনই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বলেন। এরপর আলোচনার পথ বেছে নেন, যা স্পষ্টতই সফল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না—কারণ কোনো পক্ষই আলোচনা করতে চায়নি। তারা কেবল জিততে চেয়েছিল।
ভেবে দেখুন, কয়েক সপ্তাহ ধরে পিটিআই ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ এবং তাঁর স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসার জন্য চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু যখন আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো, ততক্ষণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সন্ত্রাসবাদের দিকে ঘুরে গেল।
সরকার তার বেশিরভাগ শক্তি ব্যয় করেছিল এটা বোঝাতে যে, দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ভালো আছেন এবং তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন, আর পিটিআই অকারণে শুধু শুধু হৈচৈ করছে। আর তারপরেই সবকিছু পাল্টে গেল।
হ্যারি পটার সিরিজের চতুর্থ বইয়ে হারমাইনি ও ক্রাম নামের চরিত্রটির ক্ষণস্থায়ী প্রেমের সম্পর্কের মতোই আকস্মিকভাবে আলোচনায় সন্ত্রাসবাদের প্রসঙ্গ চলে এলো।
কিন্তু প্রেমের গল্পের মোড়টি যেখানে অসম্পূর্ণ ছিল, আমাদের রাজনীতিতে সন্ত্রাসবাদের দিকটির ক্ষেত্রে তেমনটা বলা যায় না। সন্ত্রাসবাদ এবং এর কারণগুলো নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনা হয়ে আসছে। কিন্তু মনে হয়, ক্ষমতার আসনে থাকা ব্যক্তিদের কাছে বিষয়টির মূল কারণ অস্পষ্টই রয়ে গেছে।
স্মরণকালেরও আগে থেকে রাষ্ট্রের পুরো মনোযোগই ছিল এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করার ওপর যে, পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের পেছনে বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে। হামলাকারী গোষ্ঠীগুলোকে বলা হয় ফিতনা আল-হিন্দুস্তান এবং ফিতনা আল-খাওয়ারিজ।
পাকিস্তানে যখন হামলা হয়, তখন তা কাবুলের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কারণ সাধারণত হামলাকারীর পরিচয় সীমান্তের ওপারের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যা ‘ডুরান্ড লাইন’ নামেও পরিচিত।
অভিযান চালানো হয় এবং এতে হামলার গতি কমে আসে। সবকিছুই ছিল বহিরাগত শত্রুদের কারণে। হঠাৎ করেই দেখা গেল, পেশোয়ারে পিটিআই সরকারের অসহযোগিতামূলক মনোভাবের কারণেই সন্ত্রাসবাদ ঘটছে।
এই বিষয়টি পটার সিরিজে সিরিয়াস ব্ল্যাকের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর মতোই তীব্র আঘাত হানে।
এই হামলার জন্য এখন কাকে দোষ দেওয়া যায়? পিটিআইকে, নাকি আফগান তালেবানকে? আরও বিভ্রান্তি। আমার আশঙ্কা, পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে, কারণ জরুরি অবস্থা ও অযোগ্য ঘোষণার কথা আবার শুরু হয়েছে। এখন আরও শোরগোল শুরু হবে।
এর কোনোটির দ্বারাই এটা বোঝানো হচ্ছে না যে, অপর পক্ষ, অর্থাৎ পিটিআই, এখানে নায়ক। এটি ক্রিচার নামের এলফটির মতোই আত্মকরুণাময় এবং সহনীয়।
দলটি কোনো কৌশল বা পরিকল্পনা ছাড়াই ‘দীর্ঘ পদযাত্রা’ ঘোষণা করেছে; এমনকি টিটিএপি-র মতো মিত্রদের সঙ্গেও পরামর্শ করেনি।
সত্যি বলতে, দলটি শুধু তার সমর্থকদের ক্রমবর্ধমান ক্রোধ থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। আর ঘোষণাটি হয়ে যাওয়ার পর, দলের নেতৃত্ব (যদি একে নেতৃত্ব বলা যায়) একটি পরিকল্পনা ঠিক করতে বসেছিল।
তারা যে সমাধানটি খুঁজে পেয়েছিল তা হলো, আলোচনা এবং একটি সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের আশা করা, যা তাদের মিছিলটি বাতিল করার সুযোগ দেবে। আর সেটাও তো ঠিক সেভাবে কাজ করেনি, তাই না? ঠিক যেমন শিশু হ্যারি পটারকে হত্যা করার ভলডেমোর্টের পরিকল্পনাটি করেছিল।
সুতরাং এখন দলটি আগের চেয়েও বড় বিপদে পড়েছে। কারণ শাসকগোষ্ঠী আগের চেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ এবং সমর্থকরা যে সন্তুষ্ট হবে, তার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
এ এক বিরাট উভয়সংকট; ঠিক ওয়ার্মটেইলের মতো, যে নিরাপদ পথ বেছে নিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ‘অন্ধকার জগতে’ যোগ দিয়েছিল এবং যার পরিণতি হয়েছিল মৃত্যু।
তুলনামূলকভাবে, পিপিপি বেশ ভালোভাবেই চাল চেলেছে বলে মনে হয়। কারণ দলটি এত ঘন ঘন পক্ষ ও অবস্থান বদলানোর শিল্পে পারদর্শী হয়ে উঠেছে যে, এর অবস্থান আসলে কোথায়, তা বোঝা কঠিন। আদৌ কি এর কোনো অবস্থান আছে?
এটি সরকারকে সমর্থন করে, কিন্তু টক শোতে বসে বিলাপকারী মার্টেলের মতো আচরণ করে। এবং গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে এমনটাই করে আসছে।
এর সূত্রগুলো সবাইকে বলে আসছিল যে, এটি জরুরি অবস্থা এবং সংঘাতের বিরোধী। কিন্তু সাম্প্রতিক পিটিআই-সরকার আলোচনায় বেরিয়ে এসে সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে তাদের উদ্বেগ ও দৃঢ় অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছে।
যেন দলটি সিন্ধুর ‘ব্যবস্থা’ ছাড়া অন্য কিছুতে বিশ্বাস করার জন্য পরিচিত।
আর একবার যখন মহসিন নাকভি (ডলোরেস আমব্রিজের মতো, যিনি দেখতে মিষ্টি ও আদুরে হলেও ছিলেন বাজপাখি) খাইবার পাড়ি জমালেন, পিপিপি গভর্নর প্রাদেশিক সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠক করতে কোনো দ্বিধা করেননি।
প্রকৃতপক্ষে, পিপিপি সেভেরাস স্নেপের মতো—তাকে পছন্দ করা কঠিন এবং তাকে ভালো লোক হিসেবে আখ্যা দেওয়াও কঠিন।
একমাত্র মৃত্যুই তাকে মুক্তি দিতে পারত। পিপিপির ক্ষেত্রে হয়তো কেবল ক্ষমতা থেকে সরে গেলেই তা সম্ভব হবে—যদি আদৌ কখনো হয়।
পুনশ্চ: এই লেখাটি হয়তো শুধু তাদেরই ভালো লাগবে, যারা এখনও হ্যারি পটার সিরিজের কথা মনে রেখেছেন। বাকিদের জন্য তো রয়েছেই সেইসব মারাত্মক ভুল আর সেগুলোর ভবিষ্যদ্বাণী।
- আরিফা নূর: একজন সাংবাদিক। সূত্র: দ্য ডন

