যতদূর মনে পড়ে, এই বাঁধটি ফিলিস্তিন বিষয়ে জনমতকে দমন করে রেখেছে। এটি ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের সবচেয়ে জঘন্য হামলাগুলোকে আত্মরক্ষার অধিকার বলে আখ্যা দিয়ে দায়মুক্তি দিয়েছে।
২০০৬ সালে ফিলিস্তিনে অনুষ্ঠিত একমাত্র অবাধ নির্বাচনে হামাস জয়লাভ করার পর, এটি গাজার ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধ এবং জাতীয় ঐক্য সরকার বর্জনের কর্মসূচি তৈরি ও বজায় রেখেছিল।
এর চরম উৎকর্ষের সময়ে এটি কিয়ার স্টারমারের মতো একজন প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় এনেছিল, যিনি গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার সময় অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন এবং পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখাকে সমর্থন করেছিলেন।
এই বাঁধটি অত্যন্ত কড়া নজরদারিতে ছিল। যারা এর বিরোধিতা করার সাহস দেখিয়েছিল এবং যাদের আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের মতো অর্থ ছিল না, এটি তাদের রাজনৈতিক জীবনের ইতি টেনে দিয়েছিল। এটি সংবাদ উপস্থাপকদের সম্প্রচার থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। যারা এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার সাহস দেখিয়েছিল, তাদের বড়জোর ইহুদিবিদ্বেষী এবং নিকৃষ্টতম ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই- যা এই সংঘাতের সময়রেখায় এক মুহূর্তের সমান- বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে এবং বন্যার পানি পুরোদমে বইতে শুরু করেছে।
বাঁধ ভাঙার মূল হোতারা হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড এবং গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কি। দুজনেই ইহুদি, যদিও তুলনাটা এখানেই শেষ। মিলিব্যান্ড এবং পোলানস্কি সম্পূর্ণ ভিন্ন ফলাফলের কথা ভাবছেন।
একজন দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে বিশ্বাসী এবং অন্যজন বলেন, এই সংঘাতের অবসান ঘটানোর একমাত্র উপায় হলো এক রাষ্ট্রে আরব ও ইহুদিদের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে একত্রে বসবাস করা।
কিন্তু তারা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে এমন একটি স্থিতাবস্থা ভাঙছেন, যা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই চলে আসছে।
স্থিতাবস্থা ভাঙা
এই প্রথমবার একজন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রামকারীদের বললেন যে, তারা সঠিক পথেই আছেন।
এই প্রথমবার ব্রিটেন জাতিসংঘের এমন একটি ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে, যেখানে এই দখলদারিত্বকে বেআইনি বলা হয়েছে। এই প্রথমবার দেশটি ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসানের শর্তে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
“ব্রিটিশ সরকার দীর্ঘদিন ধরেই সঠিকভাবে বলে আসছে যে, বসতি স্থাপন অবৈধ। কিন্তু আমরা সামগ্রিকভাবে এই দখলদারিত্বের বৈধতার প্রশ্নে নীরব থেকেছি, যেটিকে ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বেআইনি বলে রায় দিয়েছিল,” গত মাসে এক বক্তৃতায় মিলিব্যান্ড বলেন।
আজ আমি ঘোষণা করছি যে, ব্রিটিশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অভিমত হলো, এই দখলদারিত্ব বেআইনি।
মিলিব্যান্ডের বিবৃতিটি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) ২০২৪ সালের পরামর্শমূলক মতামতের সিদ্ধান্তের প্রতি যুক্তরাজ্যের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট সমর্থন বলে মনে হচ্ছে। এই মতামতে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের অবৈধতা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অবশ্যই অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ছেড়ে যেতে হবে এবং সরকারগুলোকে ইসরায়েলের বেআইনি উপস্থিতি টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করা বন্ধ করতে হবে।
সপ্তাহান্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, যখন গ্রিন পার্টি প্রথম মূলধারার ব্রিটিশ রাজনৈতিক দল হিসেবে জায়নবাদকে বর্ণবাদের একটি রূপ বলে আখ্যা দেয়।
এই দুটি পদক্ষেপই ব্রিটেনে ইসরায়েল বিষয়ক বিতর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
কাউন্সিল ফর আরব ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর পরিচালক ক্রিস ডয়েল লিখেছেন, “গত তিন বছর ধরে… আমি উভয় দলের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং সাহায্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিয়েছি এবং আমরা বিভ্রান্ত ও প্রতারিত বোধ করে ফিরে এসেছি।”
মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা সরাসরি প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, কিংবা দাবি করছিলেন যে পুরো বিষয়টি খুবই জটিল। কক্ষে উপস্থিত আমার মতো কিছু লোক কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে কাজ করলেও, যা ঘটছিল তার অভ্যন্তরীণ দিকগুলো বোঝার ক্ষেত্রে তারা দৃশ্যত অক্ষম ছিলেন।
এখন দরজাগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়েছে।
দুই বছর আগে লেবার পার্টির এক সম্মেলনে, সামনের সারির মন্ত্রীরা ‘লেবার ফ্রেন্ডস অফ ইসরায়েল’ (এলএফআই) অনুষ্ঠানে দেখা করার জন্য লাইন দিতেন। গত সপ্তাহে লিভারপুলে, সামনের সারির একজন মন্ত্রীও ‘লেবার ফ্রেন্ডস অফ ইসরায়েল’ অনুষ্ঠানে যোগ দেননি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর সমান্তরাল চিত্রটি হলো, যদিও তা হুবহু এক নয়, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির রাজনীতিবিদদের এক প্রজন্মের ওপর আইপ্যাকের প্রভাবের হ্রাস।
এটা যেন রাত আর দিনের মতো। এলবিসি-র সেই সাক্ষাৎকারের পর থেকে (যেখানে স্টারমার গাজায় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার ইসরায়েলি অধিকারকে সমর্থন করেছিলেন) ফিলিস্তিনি ও মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশাধিকার ছিল খুবই কম এবং অনেক ক্ষেত্রে একেবারেই ছিল না। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন,” বলেছেন লেবার পার্টির একজন অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি।
কিন্তু আমাদের ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত নয়। স্টারমার যদি আরও ছয় মাস প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেকে যেতেন, তবে দলটি ফরাসি সমাজতন্ত্রীদের মতোই ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। বস্তুত, লেবার পার্টির উপদেষ্টাদের একটি প্রতিনিধিদল তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে ফ্রান্সে গিয়েছিল।
গাজা বিষয়ে নীতি পরিবর্তন করাটা ছিল আত্মরক্ষার বিষয়।
প্রগতিশীল ইহুদি সংগঠন ইয়াশাদ মিলিব্যান্ডের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। মিলিব্যান্ডের ঘোষণার জবাবে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে তাদের দাবি, মিলিব্যান্ডের নীতিগুলো “ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে না; এগুলো দখলদারিত্বকে লক্ষ্য করে। এই নীতিগুলো ইসরায়েল রাষ্ট্রের বৈধতা এবং আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ বসতি স্থাপন উদ্যোগের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করে।”
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “মূল ইসরায়েল থেকে বসতিগুলোকে আলাদা করার অর্থ এই নয় যে, চূড়ান্তভাবে সীমান্ত কোথায় হবে সে বিষয়ে কোনো রায় দেওয়া হচ্ছে; বরং এটি এই স্বীকৃতি যে, একতরফাভাবে বাস্তব পরিস্থিতিকে দিয়ে আগে থেকেই সেই প্রশ্নের সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া উচিত নয়।”
একটি বৈধ এবং একটি অবৈধ ইসরায়েল
‘প্রকৃত ইসরায়েল’ এবং বসতিগুলোর মধ্যেকার পার্থক্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই এবং কয়েক দশক ধরেই তা নেই।
যারা দ্বিমত পোষণ করেন, আমি তাদের জেরুজালেমের চারপাশে ঘুরে ১৯৬৭ সালের গ্রিন লাইনটি আসলে কোথা দিয়ে গেছে, তা খুঁজে বের করার জন্য আহ্বান জানাই। এটি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে।
আল আকসা মসজিদের নিচে খোঁড়া অসংখ্য সুড়ঙ্গে তৃতীয় মন্দিরের ভিত্তির প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ খুঁজে পাওয়া আরও সহজ হবে, যে ধরনের প্রমাণের অবশ্য কোনো অস্তিত্ব নেই।
কিন্তু একটি বৈধ ও একটি অবৈধ ইসরায়েলের মধ্যে পার্থক্যই জায়নবাদ বিষয়ে গ্রিন পার্টির বিবৃতির বিরুদ্ধে ইয়াশাদের পরবর্তী নিন্দার মূল কারণ।
এতে প্রস্তাবটিকে ইহুদি পরিচয়ের ওপর আক্রমণ ছাড়া আর কিছুই নয় বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
জায়নবাদ একটি তীব্র বিতর্কিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ শব্দ। কিন্তু অধিকাংশ ব্রিটিশ ইহুদির কাছে, ইহুদি জাতিসত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বিশ্বাসই তাদের ইহুদি পরিচয়ের মূল ভিত্তি এবং তারা একেই জায়নবাদের মৌলিক ধারণা হিসেবে বোঝে। এ কারণেই ইহুদিরা সিনাগগে গিয়ে জেরুজালেমের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করে এবং এ কারণেই ‘জায়ন’ ধারণাটি দুই সহস্রাব্দ ধরে ইহুদি সাম্প্রদায়িক জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ইহুদিদের বলা যে, তারা কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য যদি তারা সম্মিলিত ইহুদি পরিচয়ের সেই ধারণাটি ত্যাগ করে, তা- যেমনটা কেউ কেউ ব্যাখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন- কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর আক্রমণ নয়। এটি ইহুদি পরিচয়ের ওপর একটি আক্রমণ।
প্রস্তাবটি নিয়ে পোলানস্কির নিজেরই আপত্তি ছিল, যার পক্ষে তিনি ভোট দেননি এবং যার সংশোধনীগুলোও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। এরপর তিনি দলে সকল ইহুদিকে স্বাগত জানিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন।
কিন্তু যেভাবেই দেখা হোক না কেন, প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য ব্রিটিশ ইহুদিদের বর্ণবাদী বলা ছিল না। কিংবা জেরুজালেমমুখী সিনাগগে তারা প্রার্থনা করতে পারবে না, সেটাও নয়। সহস্রাব্দ ধরে আবির্ভূত জায়নবাদের নানা রূপকে এক করে দেখাও এর উদ্দেশ্য ছিল না।
এর উদ্দেশ্য ছিল তাদের স্বপ্ন ও প্রার্থনার ফসল, আজকের ইসরায়েল রাষ্ট্রকে বর্ণনা করা এবং লক্ষ্যবস্তু বানানো। কোনো কাল্পনিক রাষ্ট্র নয়, যেমন ‘এর সকল নাগরিকের জন্য একটি ইসরায়েল’।
সেটা চিরতরে চলে গেছে।
মৌলিক আইন অনুসারে, ইসরায়েল রাষ্ট্র শুধুমাত্র তার ইহুদি নাগরিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রকাশ।
ব্রিটেনের কেউ যদি মনে করে যে, ফিলিস্তিনিদের চলে যেতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তাদের জীবন যতটা সম্ভব দুর্বিষহ করে তোলার জন্য ইসরায়েলের বর্তমান অভিযানটি কেবল গাজার ফিলিস্তিনিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাহলে তারা দিবাস্বপ্নে বাস করছে।
এটি নাগরিকত্ব বা বাসস্থান নির্বিশেষে সকল ফিলিস্তিনির জন্য প্রযোজ্য। তারা ইসরায়েল, গাজা, পূর্ব জেরুজালেম বা অধিকৃত পশ্চিম তীরে যেখানেই থাকুক না কেন। এটি দক্ষিণ লেবাননের শিয়া মুসলমান এবং দক্ষিণ সিরিয়ার সুন্নি মুসলমানদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
মূল ইসরায়েলের কাছ থেকে সবাই একই রকম আচরণ পায়।
জায়নবাদের এক রূপের সঙ্গে অন্য রূপের পার্থক্য নিরূপণের প্রচেষ্টার বহুবিধ সমস্যার মধ্যে এটি কেবল একটি।
জায়নবাদের বহু রূপ
২০ বছর আগে ফিরে তাকালে দেখা যায়, এই একই উদারপন্থীরা তিনটি প্রধান বসতি ব্লক প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে যুক্তি দিচ্ছিলেন। আজ, এলএফআই এই বসতিগুলোকে নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত করতে মিলিব্যান্ডকে রাজি করানোর বৃথা চেষ্টা করেছে।
উদারপন্থী জায়নবাদীরা আপনাকে বিশ্বাস করাতে চাইবে যে, যদি ঘৃণ্য বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং তার উগ্র-ডানপন্থী ধর্মীয় জায়নবাদী বন্ধুদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হতো, তাহলে সবকিছু তিন বছর আগে হামাসের হামলার আগের দিন, অর্থাৎ ৬ অক্টোবরের অবস্থায় ফিরে যেত।
তারা আপনাকে গাবি আইজেনকোট, ইয়ার লাপিদ, নাফতালি বেনেট এবং সেই সমস্ত বিরোধী নেতাদের বিবৃতির কথা জানাতে ভুলে যায়, যারা গত তিন বছর ধরে গাজা ও অন্যত্র তাদের সেনাবাহিনীর অভিযানকে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন করে এসেছেন।
সকলেই গণহত্যা অস্বীকার করে। সকলেই জাতিগত নির্মূল অস্বীকার করে এবং আইজেনকোটের মতো কেউ কেউ, ই১ বসতি প্রকল্পের বিরুদ্ধে থাকলেও, বসতি সম্প্রসারণ বাড়ানোর পক্ষে।
তাদের কেউই আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে ক্ষমতা লাভ করতে চায় না, যদিও তা করতে তাদের বেগ পেতে হতে পারে।
বেনেট তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করার একজন কট্টর সমর্থক, সম্ভবত সাইপ্রাসকে কেন্দ্র করে। তিনি বলেন যে, ইরানের মোকাবিলা হয়ে গেলে তুরস্ক হবে ইসরায়েলের পরবর্তী আমালেক।
বাস্তবে ও ইতিহাসে, জায়নবাদের নানা রূপের মধ্যে একমাত্র আসল পার্থক্য হলো তারা কত দ্রুত কাজটি সম্পন্ন করে, তাদের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। আর সেই চূড়ান্ত গন্তব্য হলো, তাদের কল্পিত বাইবেলীয় এরেৎজ ইসরায়েল ভূমিতে আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
এই কারণে, ‘মূল ইসরায়েল’ উল্লেখযোগ্যভাবে দখলমুক্ত হতে অক্ষম। এটি কেবল লোকদেখানো পদক্ষেপ নিতে পারে।
একমাত্র ২০০৫ সালে এরিয়েল শ্যারনের প্রধানমন্ত্রীত্বকালে ইসরায়েল যখন গাজা থেকে বসতি স্থাপনকারীদের প্রত্যাহার করেছিল, তখন তারা গাজা থেকে প্রত্যাহার করা সংখ্যার চেয়ে বেশি বসতি স্থাপনকারীকে পশ্চিম তীরে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে সে বছর বসতি স্থাপনকারীর মোট সংখ্যা বৃদ্ধি নিশ্চিত করেছিল।
কিন্তু এটি তার ভূখণ্ডগত অর্জনকে সুরক্ষিত রাখে, ঠিক যেমনভাবে এটি ফিলিস্তিনি নেতাদের একের পর এক প্রজন্মের দেওয়া ছাড়গুলোকেও সুরক্ষিত রাখে।
আর এখানেই মিলিব্যান্ডের সমস্যা, অথবা আরও নির্দিষ্ট করে বললে, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে বাঁচাতে কিংবা ইসরায়েলকে তার নিজের ধ্বংস থেকে বাঁচাতে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সমস্যাটি।
এই বিষয়টি বাদ দিন যে, কোনো আলোচনা হচ্ছে না বা আগামী বহু বছর ধরে তার কোনো সম্ভাবনাও নেই। এটাও বাদ দিন যে, সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম ফিলিস্তিনি নেতারা হয় কারাগারে আছেন অথবা গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন।
নিজেকে শুধু একটি বাস্তবসম্মত প্রশ্ন করুন: জন্ম নেওয়া বা না নেওয়া কোন ইসরায়েলি নেতা পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম থেকে দশ লক্ষেরও বেশি ইহুদি বসতি স্থাপনকারীকে তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা, খামার এবং শিল্প এলাকা থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করতে সক্ষম?
দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান একবার বাস্তবায়িত হতে পারত। কিন্তু প্রায় সিকি শতাব্দী আগে ইসরায়েল আরব শান্তি উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।
পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ অফিসের এমন একজনও সদস্য নেই, যিনি বিশ্বাস করেন যে, ইসরায়েল যেকোনো নেতৃত্বের অধীনে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে জন্ম নিতে দেবে।
নেসেটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবগুলোও একই কথা বলে।
সুতরাং মিলিব্যান্ডের দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান ঠিক ততটাই মরীচিকা, যতটা প্রগতিশীল জায়নবাদীদের ‘প্রকৃত ইসরায়েল’-এর অস্তিত্বের পক্ষে যুক্তি দেওয়ার প্রচেষ্টা।
অস্তিত্ব নেই, অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনাও নেই।
ফিলিস্তিনের সংকোচন
এর পরিবর্তে, দিন দিন একটি একটি করে উপড়ে ফেলা জলপাই গাছের মধ্য দিয়ে যা টিকে আছে, তা হলো যেকোনো রূপে ফিলিস্তিনের অবিরাম ক্ষয় ও সংকোচন।
এই অভিযানে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ জড়িত। সেনাবাহিনী একটি নাগরিক সেনাবাহিনী এবং সকল রাজনৈতিক মতাদর্শের ইহুদি নাগরিকদের পূর্ণ সমর্থন এর প্রতি রয়েছে।
বৈশ্বিক নিষ্ক্রিয়তা মানেই সম্মতি। ইসরায়েল বৈশ্বিক জনমত সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন এবং দ্রুত সম্প্রসারণের একটি সুযোগ যখন প্রায় শেষ হতে চলেছে, তখন তারা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালে সম্প্রসারণের হার গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এমন সাহসী ইসরায়েলি আছেন, যারা ফিলিস্তিনিদের এবং বসতি স্থাপনকারীদের লাঠি ও বন্দুকের মাঝে নিজেদের জীবন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। আরও সাহসী ইসরায়েলি আছেন, যারা সমস্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটি আঙুলেই গোনা যায়।
দ্বি-রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমর্থকরা যুক্তি দেন যে, একক রাষ্ট্র ব্যবস্থা স্থায়ী সংঘাতের পথ খুলে দেয়। কিন্তু বর্তমানে একটি যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। শুধু এর তীব্রতাই ওঠানামা করে।
এই সংঘাতের অবসান তখনই ঘটবে, যখন আরব ও ইহুদিরা একই পরিসরে সমান নাগরিক হিসেবে সহাবস্থান করবে। সেই পরিসরকে কী নামে ডাকা হবে এবং তা একটি বা দুটি রাষ্ট্র হবে, নাকি সেগুলোর একটি জোট হবে- এসব বিষয়ে অনেক সৃজনশীল সমাধান রয়েছে।
আপনি যে নামেই ডাকুন না কেন, এর নাগরিকদের জাতি বা ধর্ম নির্বিশেষে ন্যায়বিচারের সামনে সমতা, আবাসন, জমি, পানি, নিরাপত্তা, আকাশপথের সমান ভাগের মতো মৌলিক বিষয়গুলো ভাগ করে নিতে হবে।
গ্রিন পার্টির প্রস্তাবটি ব্রিটেনের প্রবীণ প্রজন্মের ধর্মপ্রাণ ইহুদিদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর হতে পারে। এটি প্রকৃতপক্ষে ইহুদি বা উদারপন্থী হিসেবে তাদের পরিচয়কে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এটি ইসরায়েল সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিঘ্নিত করতে পারে। কিন্তু সেই ধাক্কাটি শেষ পর্যন্ত কল্যাণকরও প্রমাণিত হতে পারে।
ব্রিটেনের সিনাগগগুলোতে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদে প্রার্থনা করার সময় ধর্মপ্রাণ ইহুদিরা অন্তত এই ভেবে সান্ত্বনা পেতে পারেন যে, আধাসামরিক পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালাবে না, থুতু ফেলবে না, লাঠি দিয়ে পেটাবে না বা কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করবে না এবং ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী জনতা নিয়মিত তাদের উপাসনালয়ে হামলা চালাবে না।
আল আকসা মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসলিমদের কিংবা চার্চ অফ দ্য হোলি সেপালকারে প্রার্থনা করতে আসা খ্রিস্টান উপাসকদেরও এটাই সাপ্তাহিক অভিজ্ঞতা।
এটিও ‘প্রকৃত ইসরায়েল’-এরই একটি ফসল, যা একটি ইহুদি আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র এবং সকল অ-ইহুদিকে সম্ভাব্য বা বাস্তব হুমকি হিসেবে গণ্য করে।
এই পরিস্থিতি চলতে দিলে আন্দোলন করার মতো কোনো ফিলিস্তিনই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
ইসরায়েল ও তার সমর্থকরা ঠিক এটাই করতে চাইছে।
- ডেভিড হার্স্ট: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক।

