একটি নদী যখন ধীরে ধীরে কালো হয়ে যায়, পানিতে মাছ থাকে না, দুর্গন্ধে পাড়ে দাঁড়ানো যায় না, তখন তাকে শুধু ‘দূষণ’ বলা যথেষ্ট নয়। এটি একটি জনপদের জীবনীশক্তি ধ্বংসের প্রক্রিয়া।
নরসিংদীর হাড়িধোয়া নদীর বর্তমান চিত্র সেই নির্মম বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। একসময় এই নদী দিয়ে নৌকা ও পণ্যবাহী জলযান চলত, নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য জমে উঠেছিল। আজ শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক, গৃহস্থালি আবর্জনা ও দখলের চাপে নদীটি মৃতপ্রায়। প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর নাব্যতা কমেছে, জলজ প্রাণবৈচিত্র্য বিপন্ন হয়েছে, আর তীরবর্তী মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যে পড়ছে সরাসরি প্রভাব।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সমস্যাটি অজানা নয়, আইনও অজানা নয়, সমাধানের প্রযুক্তিও অজানা নয়। তবু নদী মরছে।
শোধনাগার আছে, কিন্তু চলে না
শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) থাকার কথা। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ইটিপি স্থাপন করাকেই চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়। সেটি ২৪ ঘণ্টা চলছে কি না, বর্জ্য সত্যিই পরিশোধিত হচ্ছে কি না, এই প্রশ্ন থেকে যায় আড়ালে।
সাম্প্রতিক পরিদর্শনে হাড়িধোয়ার তীরবর্তী একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ইটিপি বন্ধ থাকার তথ্য সামনে এসেছে। অথচ কাগজে-কলমে সেসব প্রতিষ্ঠানের গায়ে ‘পরিবেশবান্ধব শিল্প’-এর তকমা থাকতেই পারে।
এখানেই মূল প্রশ্ন: ইটিপি যদি শুধু দেখানোর জন্য থাকে, তাহলে সেটি পরিবেশ রক্ষার যন্ত্র, নাকি পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শন পার হওয়ার সাজসজ্জা?
অতীতেও নরসিংদীর বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে খরচ বাঁচাতে ইটিপি বন্ধ রাখার অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ পরিবেশ ধ্বংসের খরচ কারখানা মালিক বহন করছেন না। সেটি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে নদী, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও সাধারণ মানুষের ওপর।
নদী বাঁচানোর প্রকল্প, কিন্তু নদীকে মারছে কে?
হাড়িধোয়া পুনরুদ্ধারে সরকারি অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। পুনঃখনন, তীর সংরক্ষণ, সৌন্দর্যবর্ধন, সবই পরিকল্পনার অংশ। কিন্তু নদীতে প্রতিদিন নতুন করে বিষাক্ত বর্জ্য ঢুকলে কোটি কোটি টাকার খনন কী কাজে আসবে?
একদিকে নদী খনন, অন্যদিকে কারখানার পাইপ দিয়ে বর্জ্য নদীতে পড়া। এ যেন এক হাতে নদী বাঁচানোর প্রকল্প, আরেক হাতে নদী হত্যার আয়োজন।
প্রকল্পের টাকায় নদীর তলদেশ পরিষ্কার করা যায়। কিন্তু দূষণের উৎস বন্ধ না হলে নদী অল্প দিনেই আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। তাই পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত দূষণ বন্ধ, তারপর পুনর্বাসন।
শুধু কারখানা নয়, দায় প্রশাসনেরও
নদী দূষণের দায় শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঘাড়ে চাপিয়ে রাষ্ট্র দায়মুক্ত হতে পারে না। কারখানা নিয়ম ভেঙে বর্জ্য ফেললে প্রশ্ন উঠবে, নিয়ম বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কী করছে?
হাইকোর্ট ইতোমধ্যে হাড়িধোয়া রক্ষায় দূষণকারী ও দখলদারদের তালিকা তৈরি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা কার্যকর রাখা এবং নিয়মিত পানির গুণগত মান পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। অর্থাৎ ‘কী করা উচিত’ তার উত্তর খোঁজার সময় এখন আর নেই। প্রশ্ন হলো, যা করার কথা, তা করা হচ্ছে না কেন?
নদীকে শুধু পানি হিসেবে দেখলে ভুল হবে
নদী মানে শুধু পানি নয়। নদী মানে মাছ, কৃষি, নৌপথ, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং একটি জনপদের ইতিহাস। নরসিংদীর মানুষের সঙ্গে হাড়িধোয়ার সম্পর্কও তেমনই। একসময় এই নদীপথ ছিল পণ্য পরিবহনের সাশ্রয়ী মাধ্যম। নাব্যতা হারিয়ে সেই অর্থনৈতিক ভূমিকা এখন প্রায় বিলীন।
নদীর পানি ব্যবহার করা না গেলে, মাছ না থাকলে, জেলেরা জীবিকা হারালে এবং নদীপাড়ে বসবাসই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হলে সেটি আর নিছক পরিবেশগত সমস্যা থাকে না। এটি অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট।
সমাধান আছে, প্রয়োগের সদিচ্ছা কোথায়?
হাড়িধোয়া বাঁচাতে কোনো জাদুকরী প্রযুক্তি লাগবে না। দরকার কয়েকটি কঠোর ও পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপ:
১. নদীতীরবর্তী সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ইটিপি ২৪ ঘণ্টা সচল রাখা এবং অনলাইন মনিটরিং চালু করা।
২. ইটিপি বন্ধ রেখে উৎপাদন চালালে শুধু জরিমানা নয়, পুনরাবৃত্ত অপরাধে উৎপাদন বন্ধ, পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৩. নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলার পাইপলাইন শনাক্ত করে অপসারণ করা এবং দায়ী প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা।
৪. খনন বা সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের আগে ও পরে পানির মান, দ্রবীভূত অক্সিজেন, জীববৈচিত্র্য ও নাব্যতার পরিমাপ প্রকাশ্যে আনা।
৫. শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি গৃহস্থালি বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে স্থানীয় সরকারকে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নদী রক্ষার দায়িত্বকে প্রকল্পনির্ভর না রেখে জবাবদিহিনির্ভর করা।
হাড়িধোয়া কি আবার বাঁচবে?
এর উত্তর এখনো ‘হ্যাঁ’ হতে পারে। শর্ত একটাই: নদীকে কাগজে নয়, বাস্তবে বাঁচাতে হবে।
নদী খননের ছবি তুলে উন্নয়নের প্রচার করা সহজ। নদীতে বিষাক্ত বর্জ্য পড়তে না দেওয়া কঠিন। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সহজ কাজটি করা নয়, কঠিন কাজটিই নিশ্চিত করা।
আজ হাড়িধোয়া মরছে, কাল হয়তো অন্য কোনো নদীর পালা। একসময় বাংলাদেশের নদীগুলোকে ঘিরেই সভ্যতা, বাণিজ্য ও জনপদ গড়ে উঠেছিল। সেই নদীগুলোকেই যদি আমরা শিল্পায়নের বর্জ্যভান্ডারে পরিণত করি, তাহলে উন্নয়নের যে গল্প বলছি, তার ভেতরে থেকে যাবে এক ভয়াবহ প্রতারণা।
কারখানা অবশ্যই চলবে, শিল্প অবশ্যই হবে, অর্থনীতি অবশ্যই বড় হবে। কিন্তু কোনো শিল্পের লাভের হিসাব যদি একটি নদীর মৃত্যু দিয়ে শোধ করতে হয়, তাহলে সেই উন্নয়নকে উন্নয়ন বলা যায় না।
হাড়িধোয়া বাঁচানো তাই শুধু একটি নদী রক্ষার আন্দোলন নয়। এটি আমাদের উন্নয়ন-দর্শনকে নতুন করে প্রশ্ন করার সময়।

