অনেক বাবা-মা অভিযোগ করেন ছেলেমেয়েরা কথা শোনে না, তারা অবাধ্য হয়ে উঠছে। দিন যত যাচ্ছে, বাবা-মায়ের সাথে সন্তানদের দ্বন্দ্ব ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তত বেড়ে চলেছে। আমরা যত পেছনে ফিরে তাকাব, দেখব পরিবারগুলো অনেক বেশি সুখী ও সুন্দর ছিল, পারস্পরিক বোঝাপড়াটাও ছিল দারুণ। কিন্তু এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাবা-মার সাথে সন্তান কথা বলতে গেলেই যেন বিবাদ শুরু হয়; এমন কি ছোট ছোট বাচ্চারাও এখন মুখে মুখে তর্ক করে। নিজের ইচ্ছামতো সব কিছু করার প্রবণতা তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে।
এর পেছনে নানা কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো পশ্চিমা কৃষ্টি-কালচারকে অন্ধভাবে আমদানি করা। আমরা ভালো-মন্দ বিচার না করে গণহারে তাদের তত্ত্ব ও সংস্কৃতিগুলোকে গ্রহণ করেছি। ফলে আমাদের পরিবার ব্যবস্থাপনায় এমন এক ধারণা ঢুকে পড়েছে যে, বাচ্চাদের অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া উচিত।
অবশ্যই আল্লাহ তাআলা প্রতিটি মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, কিন্তু প্রতিটি স্বাধীনতারই একটি সুনির্দিষ্ট সীমা থাকে। আমরা যখন কোনো দেশে বাস করি, তখন সেখানকার আইন-কানুন আমাদের মেনে চলতে হয়; অর্থাৎ যা খুশি তা করার স্বাধীনতা পৃথিবীর কোথাও নেই। স্বাধীনতার অর্থ যদি হয় ‘যা খুশি তা করা’, তবে সেই অর্থে কোনো মানুষই স্বাধীন নয়। এখন প্রশ্ন হলো, আপনি নিজেকে কী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবেন? একজন ইমানদার নিজেকে আল্লাহর বিধিবিধান দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবেন, আর অন্য কেউ মানুষের তৈরি নিয়মের মধ্যে নিজেকে বাঁধবে। আমরা আমাদের পরিবারে তথাকথিত স্বাধীনতা দেওয়ার নামে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, যেখানে সন্তানরা বাবা-মায়ের আনুগত্যের মাহাত্ম্য ও গুরুত্বই আর বুঝতে চায় না।
কিশোর ও তরুণ বয়সে সন্তানরা মা-বাবার কথা শুনতে চায় না। তারা উগ্র ও উদ্ধত হয়ে ওঠে, মুখে মুখে তর্ক করে এবং মা-বাবা যা বলেন তার ঠিক উল্টোটা করতে পছন্দ করে। এমনকি মা-বাবা কিছু বললে তাতে তাদের মেজাজও গরম হয়ে যায়। এর পেছনে একটি বয়সভিত্তিক শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের বিষয় তো রয়েছেই। জীবনের এই নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছালে মানুষের মধ্যে কিছুটা ঔদ্ধত্য তৈরি হয়। তবে এখানে বাবা-মাকেও অভিভাবক হিসেবে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। সবসময় গায়ের জোরে কিংবা হুকুম জারি করে সবকিছু করানো যায় না। অনেক অভিভাবক এখানেই ভুল করে থাকেন।
অন্যদিকে সন্তানদেরও অনুধাবন করতে হবে যে, পৃথিবীতে মা-বাবার চেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী আর কেউ হতে পারে না। ব্যতিক্রম বাদ দিলে, সাধারণত বাবা-মাই সন্তানের সবচেয়ে বড় নিস্বার্থ পরম বন্ধু। তাঁরা নির্মোহভাবে সন্তানকে ভালোবাসেন এবং কল্যাণ চান। পাশাপাশি তাঁরা সন্তানের চেয়ে অভিজ্ঞতায় অনেক সমৃদ্ধ; পৃথিবীর আলো-বাতাস ও ঘাত-প্রতিঘাত তাঁরা সন্তানের চেয়ে বেশি দেখেছেন। ফলে তাঁদের বোঝাপড়া অনেক বেশি পরিপক্ব। তরুণ বা কিশোর বয়সে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাই বাবা-মায়ের অভিমতকে অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক।
তবে সন্তানদের এই মানসিকতা গড়ে তোলার জন্য বাবা-মাকেও সচেতন হতে হবে এবং সঠিক প্যারেন্টিং কৌশল রপ্ত করতে হবে। এর জন্য আলাদা কোনো পশ্চিমা ধারণার প্রয়োজন নেই; কোরআন ও হাদিসে যে দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে, সেটাই যথেষ্ট। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা তা অনুসরণ করি না। অনেক বাবা-মা শাসনের নামে গায়ের জোর প্রয়োগ করতে চান, যা বড় ধরনের ত্রুটি। আর পশ্চিমা ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে সন্তানরাও বাবা-মায়ের অনুগত হতে চায় না।
এর পাশাপাশি নানা ফিতনার কারণে সামগ্রিকভাবেই মানুষের মেজাজে উগ্রতা ও অস্থিরতা বেড়েছে। আজ প্রতিটি ঘরেই অসহিষ্ণুতা, ধৈর্যহীনতা ও মেজাজের উগ্রতা ছড়িয়ে পড়েছে। শান্ত ও সহনশীল মেজাজের মানুষ খুঁজে পাওয়া এখন ভার। শৈশবের সেই সারল্য ও শান্ত মেজাজ আজ বিলুপ্তপ্রায়। দু-তিন বছরের ছোট ছোট শিশুদের আচার-আচরণেও এখন মারমুখী ভাব ও উগ্রতা ভেসে ওঠে।
এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো সুন্নাহসম্মত জীবনধারা থেকে দূরে সরে যাওয়া। আমরা ঠিক সময়ে ঘুমাই না, রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত অপ্রয়োজনে আড্ডা দিই কিংবা জেগে থাকি। যেখানে রাতকে আল্লাহ তাআলা বিশ্রামের জন্য আবৃত করে দিয়েছেন, সেখানে আমাদের লাইফস্টাইল হয়ে পড়েছে সুন্নাহবিরোধী। তার ওপর যুক্ত হয়েছে মোবাইলের স্ক্রিন আর ডোপামিনের প্রভাব। এসব ফিতনা থেকে বাঁচতে হলে এবং পরিবারকে রক্ষা করতে হলে আমাদের সুন্নাহসম্মত জীবনে ফিরে আসতেই হবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, সন্তানরা শুনে বা পড়ে যতটা শেখে, তার চেয়ে অনেক বেশি শেখে দেখে। শুধু শিশু নয়, এটি সব মানুষেরই স্বাভাবিক চরিত্র, মানুষ দৃষ্টান্ত দেখে শেখে। অনেক বাবা-মা নিজে মোবাইল টিপতে টিপতে সন্তানকে বলেন, ‘মোবাইল রাখো, পড়তে বসো।’ সন্তান তখন ভাবে, নিশ্চয়ই এই যন্ত্রের ভেতরেই পৃথিবীর সব সুখ লুকিয়ে আছে, তাই অভিভাবক নিজে এটি ছেড়ে উঠতে পারছেন না! আপনি যদি সন্তানকে মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখতে চান, তবে আগে নিজের অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস ছাড়ুন। আপনাকে সন্তানের সামনে রোল মডেল হতে হবে।
আপনি যদি নিজ বাবা-মায়ের সামনে বিনয়ী হন, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বা ঘরে ফেরার পর নিজের মা-বায়ের জুতো জোড়া সযত্নে সোজা করে দেন এবং পরম ভক্তিতে তাঁদের সামনে মাথা নিচু করে কথা শোনেন, তবে আপনার সন্তানও তা দেখতে পাবে। তখন সে আপনার সামনে উঁচু গলায় কথা বলতে বা ঔদ্ধত্য দেখাতে ভয় পাবে। সন্তানকে কোনো পরিবেশ দিচ্ছেন, কার সাথে মেলামেশা করাচ্ছেন সেটিই তার আচরণ নির্ধারণ করে দেয়। তাকে উশৃঙ্খলা বা অসুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ থেকে সরিয়ে দ্বীনি ও সঠিক আদর্শের পরিবেশ দিতে হবে।
আমরা মুখে অনেক উপদেশ দিই, কিন্তু সমাজে তার প্রভাব পড়ে না; কারণ আমরা যা বলি, তা নিজেরা আমল করি না। কথার চেয়ে নিজেদের আমল ও আচরণই সবচেয়ে বড় দাওয়াত। আমরা নিজেরা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারলে ইনশাআল্লাহ সন্তানরাও তা থেকে শিক্ষা নেবে এবং অনুগত হবে।
সূত্র:জাগো নিউজ (শায়খ আহমাদুল্লাহর বক্তব্য অবলম্বনে)

