শুক্রবার ওসলো থেকে একটি খবর এসেছে, যা অনেক মানুষের মনে আশা জাগিয়েছে। নরওয়ের নোবেল কমিটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারক নাভানেথেম নাভি পিল্লে। কমিটি বলেছে, শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের পথে তাঁর প্রচেষ্টার জন্যই এই সম্মান। তাঁর বয়স এখন ৮৫ বছর। পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে ১০ ডিসেম্বর, ওসলোতে।
খবরটা তিনি নিজেও সহজে বিশ্বাস করতে পারেননি। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী নোবেল ইনস্টিটিউটের পরিচালক ফোন করলে তিনি বলেছিলেন, আপনার মুখে না শোনা পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করব না। কমিটির প্রধান আগে মজা করে বলেছিলেন, নরওয়ের নম্বর থেকে ফোন এলে যেন ধরে নেন। ৮৫ বছর বয়সে এমন সম্মান পেলে মানুষ এভাবেই থমকে যায়। এই থমকে যাওয়া মুহূর্তটাই বলে দেয়, তিনি পুরস্কারের জন্য কাজ করেননি।
একই সপ্তাহে আরেকটি খবর এসেছে, সম্পূর্ণ উল্টো সুরের। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, নিদাল হাসানের ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড ৩ ডিসেম্বর ফোর্ট হুডে কার্যকর হবে এবং তা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ২০০৯ সালে ফোর্ট হুডে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। নিহতদের পরিবারের কষ্ট সত্যি। তাঁদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারও সত্যি।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে অন্য জায়গায়। ন্যায়বিচার পেতে কি একটি মৃত্যুকে সবার সামনে দেখাতে হয়? সিনেটর থম টিলিস মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করেও সরাসরি সম্প্রচারকে চরম ঘৃণ্য বলে মন্তব্য করেছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সও বলেছেন, তিনি এটি দেখবেন না। আর অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯০ বছর কোনো প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড হয়নি।
একটি বিশ্লেষণ এই দুই খবরকে পাশাপাশি রেখেছে। বিশ্লেষণটির মতে, একদিকে রাষ্ট্র তার ক্ষমতা দেখাচ্ছে। অন্যদিকে নোবেল কমিটি এমন একজনকে সম্মান জানাচ্ছে, যিনি সারা জীবন বলেছেন, ক্ষমতাকেও আইনের কাছে জবাব দিতে হবে। এই তুলনা রাজনৈতিক মত, তবে অনেক আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী একই ভয় থেকে কথাটা বলছেন। তাই পুরস্কারের সময়টা এত অর্থবহ।
এই আইনি ধারণার জন্ম হয়েছিল ভয়ংকর এক সময় থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখিয়েছিল, রাষ্ট্র আদেশ আর দেশপ্রেমের নামে ভয়ানক অপরাধ করতে পারে। তাই জাতিসংঘ সনদ ও সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা এল। এগুলো বলল, মানুষের মর্যাদা কোনো সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে না। বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দেন, এই ব্যবস্থা কখনো নিখুঁত ছিল না। তবু এর ভাষা দুর্বল মানুষের হাতে একটি দাবির হাতিয়ার তুলে দিয়েছে।
নাভি পিল্লের জীবন সেই হাতিয়ারকে ধার দেওয়ার গল্প। তিনি বড় হয়েছেন বর্ণবৈষম্যের দক্ষিণ আফ্রিকায়, যেখানে আইনই মানুষকে ভাগ করত। জাতিসংঘ জানায়, নোবেল কমিটির ভাষায় নেলসন ম্যান্ডেলা ও আরও অনেককে রক্ষার কাজ থেকে বড় আন্তর্জাতিক মামলার বিচারক হওয়া পর্যন্ত তাঁর কাজে একটি যোগসূত্র আছে। তিনি রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালে বিচারক ছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ছিলেন। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার হন।
রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে তাঁর ভূমিকা ইতিহাস বদলে দিয়েছে। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, তাঁর প্রভাবে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যা বলে স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই মামলায় আরও একটি নতুন পথ খুলেছিল। প্রথমবার শুধু প্রচারণা ছড়ানোর কারণে কারও বিরুদ্ধে গণহত্যায় উসকানির অভিযোগ আনা হয়। আগে যৌন সহিংসতাকে অনেক সময় যুদ্ধের পাশের ঘটনা ভাবা হতো। এই রায় বলল, এটি একটি জাতিকে ধ্বংসের অস্ত্রও হতে পারে।
আজ কেন এই পুরস্কার এত জরুরি, কমিটি নিজেই তা বলেছে। কমিটির মতে, এখন আন্তর্জাতিক আইন প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রমণের মুখে। কমিটি বিচারকদের ডেকেছে সেই মানুষ, যাঁরা শৃঙ্খলা আর বিশৃঙ্খলার মাঝখানের সরু রেখা পাহারা দেন। আর সেই বিচারকরাই আজ নিষেধাজ্ঞার মুখে। এই সময়ে সাহসী মানুষকে সম্মান জানানো তাই শুধু উৎসব নয়, একটি বার্তা।
নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও জানা দরকার। প্রশাসন বলছে, তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে। যুক্তরাষ্ট্র রোম সনদের সদস্য নয়, আর আদালত অসদস্য দেশের নাগরিকের বিচারের অধিকার দাবি করে। এটি গুরুতর আইনি বিতর্ক। পুরস্কারের কয়েক ঘণ্টা পরেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, নোবেল কমিটি পুরস্কারটির মর্যাদা নষ্ট করেছে, আর হোয়াইট হাউস আইসিসির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা একটি পার্থক্য দেখান। বিতর্কের আইনি পথ খোলা আছে। অসদস্য দেশ আদালতের এখতিয়ার নিয়ে আপত্তি তুলতে পারে। মামলা গ্রহণযোগ্য কি না, তা বিচারকদের সামনে চ্যালেঞ্জ করা যায়। নিরাপত্তা পরিষদও তদন্ত থামাতে পারে। এসব পথ ছেড়ে আদালতকেই শাস্তি দিলে বিচারকদের ওপর ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ তৈরি হয়। স্বাধীন বিচারের জন্য সেটি বিপজ্জনক।
পুরস্কার কি এই চাপ থামাতে পারবে? না। এটি কোনো বিচারককে নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচাবে না। কোনো সম্প্রচারও আটকাবে না। তবে জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, কমিটি বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে শান্তি টিকে থাকে স্থায়ী নীতির ওপর, শক্তিশালীর ইচ্ছার ওপর নয়। কয়েক দশকের নীরব কাজ আজ বিশ্বের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক হতাশ মানুষের কাছে এটাই আলো।
এই আলো শুধু বিচারকদের জন্য নয়। আইনজীবী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদেরও কাজ আছে। একটি রায় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা, একটি অন্যায়ের নথি রাখা, ক্ষমতার অবাধ দাবির সামনে প্রশ্ন তোলা, এগুলো ছোট কাজ নয়। এসব কাজই ন্যায়বিচারের সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের দেশের আইনের শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মীর জন্যও এটি একটি বার্তা।
নাভি পিল্লে একবার এমন জায়গায় কাজ শুরু করেছিলেন, যেখানে ন্যায়বিচারে বিশ্বাস রাখাই কঠিন ছিল। তবু তিনি থামেননি। আজ তাঁর হাতে নোবেল শান্তি পুরস্কার। এর মানে, ধৈর্য আর সাহস শেষ পর্যন্ত বৃথা যায় না। অন্ধকার যতই গাঢ় হোক, কেউ একজন প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলে বাকিরাও পথ খুঁজে পায়।

