গ্রামীণ নারীরা শুধু কৃষিশ্রমিক নন, তাঁরা কৃষি ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাঁদের শ্রমের স্বীকৃতি, জমি ও ঋণে ন্যায্য অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা—কেবল সমতার প্রশ্ন নয়, কৃষির ভবিষ্যতেরও শর্ত।
আজ ১৫ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘Rural Women Farmers Caring for Mother Nature’—প্রকৃতির যত্নে গ্রামীণ নারী কৃষক।
কৃষিতে নারীর শ্রম
কৃষিশ্রমশক্তির ৫৮ শতাংশ নারী। ৫৮ শতাংশ নারী হলে তাঁদের অংশগ্রহণ শুধু বড় নয়, প্রচলিত হিসাবে পুরুষের তুলনায়ও বেশি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বড় হলেও নীতি ও পরিসংখ্যানে তাঁদের অবদান অনেকটাই আড়ালে। ফসল উৎপাদন, গবাদিপশু পালন, মৎস্য, বীজ সংরক্ষণ ও ফসল-পরবর্তী কাজে তাঁদের ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএন উইমেনের হিসাবে, ২০২১ সালে অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজের অর্থনৈতিক মূল্য ছিল ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার অবৈতনিক শ্রম, যা ওই বছরের জিডিপির ১৮.৯ শতাংশ। এর ৮৫ শতাংশ করেছেন নারীরা। অর্থাৎ অর্থনীতিতে নারীর অবদান শুধু মাঠের কাজেই সীমাবদ্ধ নয়।
গবাদিপশু পালনে নারীর অবদান
জাতিসংঘের নিবন্ধ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র গবাদিপশুর খামারগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ পরিচালনায় নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ময়মনসিংহের ২০০ নারীকে নিয়ে ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গবাদিপশু পালনে যুক্ত নারীদের ক্ষমতায়ন সূচক অন্য নারীদের তুলনায় ১৬ পয়েন্ট বেশি। তবে তাঁদের ৭৫ শতাংশের ক্ষমতায়নের মাত্রা ছিল মাঝারি। অর্থাৎ পশুপালনে নারীর অংশগ্রহণ সুযোগ তৈরি করলেও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে পূর্ণ ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও বাজারসুবিধা জরুরি।
জমির মালিকানায় বড় ব্যবধান
জাতিসংঘের একই নিবন্ধে বলা হয়েছে, গ্রামীণ নারীদের প্রায় ১৩ শতাংশের একক বা যৌথ জমির মালিকানা রয়েছে; পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৭০ শতাংশ। জমির মালিকানা সীমিত হলে ঋণ পাওয়া, উৎপাদনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কৃষি উদ্যোগ সম্প্রসারণের সুযোগও সংকুচিত হয়।
কৃষিতে কাজ করেও মজুরিতে পিছিয়ে নারী
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএওর) ২০২৩ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কৃষিতে মজুরিভিত্তিক কাজে নারীরা পুরুষের প্রতি এক ডলার আয়ের বিপরীতে গড়ে ৮২ সেন্ট পান। অর্থাৎ এটি বাংলাদেশের একক পরিসংখ্যান নয়; কৃষিতে নারী-পুরুষের আয়বৈষম্যের বৈশ্বিক চিত্র তুলে ধরে।
সমান সুযোগ না থাকলে উৎপাদনশীলতাও বাধাগ্রস্ত হয়
এফএওর গবেষণায় সমান আকারের খামারে নারী ও পুরুষ কৃষকের উৎপাদনশীলতার ব্যবধান ২৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যবধানের পেছনে জমি, ঋণ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিতে অসম প্রবেশাধিকারের বিষয়টি তুলে ধরে। অর্থাৎ সমস্যাটি নারীর সক্ষমতায় নয়, সুযোগের বৈষম্যেও।
নারীর সমতা বিশ্ব অর্থনীতিরও বড় সাফল্য
এফএওর ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে, কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানো গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ১ লাখ কোটি ডলার যোগ হতে পারে এবং খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৫০ লাখ কমতে পারে। এগুলো বৈশ্বিক সম্ভাবনার হিসাব, বাংলাদেশের জন্য সরাসরি পূর্বাভাস নয়।
নারীর জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই
জলবায়ু সংকটে নারীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে অভাবনীয় সাফল্য দেখা দিতে পারে। বীজ সংরক্ষণ, স্থানীয় আবহাওয়া বোঝা, খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় গ্রামীণ নারীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অংশগ্রহণ ও প্রয়োজনীয় সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত না হলে সেই জ্ঞান কৃষির টেকসই উন্নয়নে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন।
পরিশেষে,স্বীকৃতি শুধু আনুষ্ঠানিক পরিচয় নয়, অধিকার পাওয়ার পথ। নারীকে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, তাঁদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, ন্যায্য মজুরি ও জমির অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি সুবিধাভোগীর তালিকায় প্রকৃত নারী কৃষকদের অন্তর্ভুক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষিবিদ নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)সিটিজেন্স ভয়েস

