ইরান এবং সৌদি-আনসারুল্লাহ সংঘাতের দিকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ তীব্রভাবে কেন্দ্রীভূত থাকায় পূর্ব আফ্রিকায় গড়ে ওঠা নতুন উত্তেজনা তুলনামূলকভাবে আড়ালে পড়ে গেছে। অথচ সেখানে ইরিত্রিয়া তার অনেক বড় প্রতিবেশী ইথিওপিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
প্রথম নজরে বিষয়টি অস্বাভাবিকই মনে হতে পারে। ইথিওপিয়ার জনসংখ্যা ইরিত্রিয়ার তুলনায় অন্তত ৩০ গুণ বেশি। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে ইরিত্রিয়ার অর্থনীতি প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের।
সামরিক দিক থেকে ইরিত্রিয়ার একটি বড় বাহিনী রয়েছে। বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা ব্যবস্থার কারণে দেশটি প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সক্রিয় সেনা এবং আনুমানিক ৬ লাখ ৫০ হাজার রিজার্ভ সদস্য ধরে রেখেছে। তবে সংখ্যায় বড় হলেও বাহিনীটির অস্ত্রসজ্জা, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের মান ইথিওপিয়ার তুলনায় অনেক দুর্বল। বিপরীতে, ইথিওপিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার সামরিক বাহিনীকে উল্লেখযোগ্যভাবে আধুনিক করেছে।
তারপরও সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইরিত্রীয় বাহিনী ইথিওপিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এবং ইথিওপীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
তাহলে নিজেদের তুলনায় বহুগুণ বড় একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরিত্রিয়ার এই পদক্ষেপ কি নিছক বেপরোয়া সিদ্ধান্ত? বাস্তবতা ততটা সরল নয়।
এই অনুপ্রবেশ এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ইথিওপিয়ার সরকার নিজ দেশেই বিদ্রোহীদের একটি বিস্তৃত জোটের মুখোমুখি। ওই জোটের লক্ষ্য প্রেসিডেন্ট আবি আহমেদের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
জোটে ওরোমো লিবারেশন আর্মি, ফানো মিলিশিয়া এবং টিগ্রাই পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টসহ সাতটি গোষ্ঠী রয়েছে।
টিগ্রাই পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের ইতিহাস এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দলটি দীর্ঘদিন ইথিওপিয়ার রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল। টিগ্রাই নেতৃত্বাধীন ইথিওপিয়ান পিপলস রেভোলিউশনারি ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশটির ক্ষমতায় ছিল। পরে বর্তমান নেতৃত্ব তাদের প্রভাব সীমিত করে, যার পরিণতিতে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী টিগ্রাই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
লোহিত সাগরই মূল কৌশলগত প্রশ্ন
ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সম্পর্ক আরও পুরোনো সংঘাতের ইতিহাস বহন করে। ৩০ বছরের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর ১৯৯৩ সালে ইরিত্রিয়া স্বাধীন হয়। এর মধ্য দিয়ে লোহিত সাগরে ইথিওপিয়ার সরাসরি প্রবেশাধিকার কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এই বাস্তবতা বদলাতে চান আবি আহমেদ।
টিগ্রাই যুদ্ধের সময় অবশ্য দুই দেশের মধ্যে সাময়িকভাবে সম্পর্কের উন্নতি হয়েছিল। সে সময় ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া একসঙ্গে টিপিএলএফের বিরুদ্ধে লড়েছিল।
কিন্তু এখন সেই একই টিপিএলএফকেই ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে সমর্থন করছে। আঞ্চলিক রাজনীতির পুরোনো বাস্তবতাই এখানে আবার দৃশ্যমান—জোট পরিবর্তনশীল হলেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ তুলনামূলকভাবে স্থায়ী।
ইরিত্রিয়ার আশঙ্কা, ইথিওপিয়া যদি দেশের ভেতরের বিদ্রোহী শক্তিগুলোকে পরাজিত করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। সে ক্ষেত্রে ইথিওপীয় সেনাবাহিনী ইরিত্রিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে কিংবা সরাসরি সামরিক পদক্ষেপও নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবি আহমেদ বহুবার সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারকে ইথিওপিয়ার জন্য ‘অনিবার্য’ এবং ‘অস্তিত্বগত’ প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তার যুক্তির অর্থনৈতিক ভিত্তিও রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল স্থলবেষ্টিত দেশ হিসেবে ইথিওপিয়া তার আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশের জন্য আদ্দিস আবাবা-জিবুতি করিডোরের ওপর নির্ভরশীল।
শুধু ট্রানজিট ও বন্দর ফি বাবদ দেশটিকে বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়।
এই কারণে লোহিত সাগরের দিকে ইথিওপিয়ার কৌশলগত দৃষ্টি ক্রমশ আরও দৃঢ় হয়েছে।
তবে এর প্রভাব শুধু ইরিত্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উপকূলীয় অন্যান্য দেশও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে।
বিশেষ করে সোমালিয়া, কারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে আবি আহমেদের ঘনিষ্ঠতা মোগাদিশুকে ক্ষুব্ধ করেছে।
সোমালিল্যান্ডও ইথিওপিয়ার সমুদ্রপথ পাওয়ার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে এবং ইথিওপিয়াকে ১৯ কিলোমিটার এলাকা ইজারা দেওয়ার বিষয় বিবেচনা করছে।
সোমালিল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে কেবল ইসরায়েল। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও অঞ্চলটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
এই সমীকরণ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরব ও তুরস্ক বর্তমানে ইথিওপিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও, দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে লোহিত সাগরের উপকূলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হলে দুই দেশই বিষয়টিকে স্বস্তির সঙ্গে নেবে না।
বিশেষ করে তুরস্কের জন্য এটি আরও সংবেদনশীল। কারণ সোমালিয়ার সঙ্গে আঙ্কারা সামরিক ও অর্থনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই তার সম্পর্ক ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করেছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের দৃষ্টিতে, ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ মিত্র কোনো শক্তি লোহিত সাগরের কৌশলগত ভারসাম্যে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠলে তার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মিশর, সুদান ও নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ
যদিও এসব উদ্বেগের কিছু অংশ দীর্ঘমেয়াদি, পূর্ব আফ্রিকার বর্তমান উত্তেজনা সরাসরি মিশরের কৌশলগত হিসাবেও প্রবেশ করেছে।
এর কারণ নীল নদ।
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে হেরোডোটাস মিশরকে ‘নীল নদের দান’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সেই বাস্তবতা এখনো বহুলাংশে অটুট। ফলে নীল নদের উজানে ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম নির্মাণ কায়রোর কাছে শুধু পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও অস্তিত্বগত উদ্বেগের বিষয়।
এই প্রেক্ষাপটে ইথিওপিয়ার সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা দুর্বল রাখা মিশরের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফলে ইরিত্রিয়াকে সমর্থন করা কিংবা ইথিওপিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখা কায়রোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুদানের জটিল যুদ্ধ।
ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সুদানের বিদ্রোহী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) কাছে অস্ত্র পাঠানোর জন্য তার ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এমন অভিযোগও রয়েছে যে, সুদানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সুদানের ভূখণ্ডে ড্রোন হামলায় ইথিওপিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা ছিল।
রয়টার্সের একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে পশ্চিম ইথিওপিয়ায় আরএসএফের একটি প্রশিক্ষণ শিবির পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে ইথিওপিয়ার অবস্থানও একতরফা নয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর দেশটির আর্থিক নির্ভরতা যথেষ্ট। একই সঙ্গে আদ্দিস আবাবা আশঙ্কা করে, সুদানের সেনাবাহিনী যদি আরএসএফকে পরাজিত করে পুরোপুরি ক্ষমতা সংহত করতে পারে, তাহলে ইথিওপিয়া আঞ্চলিকভাবে আরও বেশি কৌশলগত চাপের মুখে পড়তে পারে।
সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইথিওপিয়ার সম্পর্ক কখনোই খুব স্বস্তিদায়ক ছিল না। ফলে খার্তুমে সেনাবাহিনীর পূর্ণ বিজয় আদ্দিস আবাবার দৃষ্টিতে কৌশলগত ঘেরাওয়ের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে পূর্ব আফ্রিকার এই সংকট শুধু ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার দ্বিপক্ষীয় সংঘাত নয়।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকার, সোমালিল্যান্ড প্রশ্ন, সোমালিয়ার নিরাপত্তা, তুরস্কের আঞ্চলিক স্বার্থ, সৌদি আরবের কৌশলগত উদ্বেগ, মিশরের নীল নদকেন্দ্রিক নিরাপত্তা এবং সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধ।
এই সমীকরণে প্রত্যেক পক্ষই মূলত নিজের নিরাপত্তাহীনতা, ভূরাজনৈতিক ভয় এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
ফলে যে সংঘাত এখন সীমান্তবর্তী বা আঞ্চলিক বলে মনে হচ্ছে, তা সহজেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিতে পারে।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বর্তমান অবস্থান দেখাচ্ছে, পূর্ব আফ্রিকার এই উত্তেজনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং লোহিত সাগর ও আফ্রিকার শিং অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নিরাপত্তা উদ্বেগ, অর্থনৈতিক চাপ ও প্রতিদ্বন্দ্বী জোটগুলোর স্বার্থের নতুন বহিঃপ্রকাশ।

