ফ্রান্সে আগুন জ্বলছে, কিন্তু সেই আগুনের উৎস খুঁজতে শুধু প্যারিসের রাজপথের দিকে তাকালে হবে না। তাকাতে হবে হরমুজ প্রণালির দিকে, ইউরোপের জ্বালানি বাজারে, রাষ্ট্রের ঋণের হিসাবে এবং শিক্ষকহীন শ্রেণিকক্ষে।
যুদ্ধের ভূগোল এখন অদ্ভুত। বোমা পড়ে এক দেশে, জাহাজ আটকে যায় অন্য দেশের জলপথে, জ্বালানির দাম বাড়ে আরেক মহাদেশে। তারপর সংসারের হিসাব এলোমেলো হয়ে আগুন জ্বলে প্যারিস, মার্সেই, লিয়ঁ ও লিমোজের রাজপথে। আধুনিক যুদ্ধে সাধারণ মানুষ বোমার শব্দ না শুনেও বাজারের রসিদে তার প্রতিধ্বনি পড়তে পারে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে দায়ী করে ফরাসি সরকারের দায় শেষ করা যাবে না। যুদ্ধ জ্বালানির দাম বাড়ায়, কিন্তু সেই বাড়তি মূল্য সমাজের কোন শ্রেণি কতটা বহন করবে, তা নির্ধারণ করে রাষ্ট্রের নীতি। একজন ধনী নাগরিকের কাছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ভ্রমণ পরিকল্পনায় সামান্য পরিবর্তন। একজন নিম্ন আয়ের কর্মীর কাছে তা কর্মস্থলে যাওয়া, ঘর গরম রাখা আর সন্তানকে খাওয়ানোর মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার সংকট।

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ থেকে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয়, স্থবির মজুরি, কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা এবং দুর্বল হয়ে পড়া সরকারি সেবা নিয়ে বৃহত্তর ক্ষোভ। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শ্রমজীবী মানুষের সেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে। লাখো মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদে অংশ নেন।
কিন্তু টেলিভিশনের পর্দায় তাঁদের দাবি যতটা জায়গা পায়নি, তার চেয়ে বেশি জায়গা পেয়েছে পোড়া গাড়ি, লুট হওয়া দোকান আর ভাঙচুরের দৃশ্য। গণতন্ত্রে ক্যামেরারও নিজস্ব রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে। একটি প্ল্যাকার্ডের চেয়ে একটি জ্বলন্ত ভবন অনেক বেশি আকর্ষণীয়, অনেক বেশি বিক্রয়যোগ্য।
সহিংসতাকে অবশ্যই সমর্থন করা যায় না। নগর ভবন পুড়িয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যায় না, দোকান লুট করে মূল্যস্ফীতি কমানো যায় না। কিন্তু সহিংসতার ছবি সামনে এনে বৃহত্তর সামাজিক ক্ষোভকে আড়াল করাও রাষ্ট্রের জন্য সুবিধাজনক কৌশল হতে পারে। কারণ, কয়েকটি সহিংস ঘটনার বিচার করা যতটা সহজ, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সামাজিক অসন্তোষের জবাব দেওয়া ততটা সহজ নয়।
ফ্রান্সের সংকটের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ বৈপরীত্যটি ধরা পড়ে দুটি সংখ্যায়। শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় সরকার তিন হাজার অতিরিক্ত বিকল্প শিক্ষক দেওয়ার ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, এক দিনের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করেছে প্রায় ষাট হাজার নিরাপত্তাকর্মী। দুটি সংখ্যা সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে রাষ্ট্রের পৌঁছাতে সময় লাগে, অথচ রাজপথে সে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস নিয়ে দ্রুত হাজির হয়।
এখানে প্রশ্নটি শুধু শিক্ষকসংকট বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র নাগরিকের অসন্তোষের জবাব দিতে কোনটিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে—সমস্যার সমাধান, নাকি তার দৃশ্যমান প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ?

এই সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফ্রান্সের আর্থিক দুরবস্থাও। সরকারি ঋণের চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বাজেট নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন সরকারের সামনে কঠিন হিসাব তৈরি করেছে। জনসেবা উন্নত করতে অর্থ প্রয়োজন, আবার ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যয় কমানোর চাপও রয়েছে। কিন্তু ব্যয়সংকোচনের বোঝা যদি প্রধানত সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে, তাহলে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রাজনৈতিক অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এখানেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গে ফ্রান্সের রাজপথের সংযোগ। হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। জ্বালানির দাম বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের একটি অংশ এসে পড়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক যুদ্ধ জ্বালানির দাম বাড়ালেও সেই চাপ সমাজের কোন শ্রেণি কতটা বহন করবে, তা নির্ধারণ করে জাতীয় নীতি। একজন ধনী নাগরিক ও একজন নিম্ন আয়ের কর্মী একই দামে জ্বালানি কিনলেও তাঁদের ওপর এর প্রভাব এক নয়। একজনের জন্য তা ভ্রমণ পরিকল্পনায় সামান্য পরিবর্তন, অন্যজনের জন্য কর্মস্থলে যাওয়া, ঘর গরম রাখা কিংবা সন্তানের খাবারের খরচ মেটানোর মধ্যে কঠিন নির্বাচন।
যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন রাষ্ট্রনেতা ও সামরিক কৌশলবিদেরা। অথচ তার মূল্য দেন বাসচালক, শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং মাসের শেষে সংসারের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাওয়া পরিবারগুলো। তাঁরা হয়তো বোমার শব্দ শোনেন না, কিন্তু বাজারের রসিদে যুদ্ধের প্রতিধ্বনি ঠিকই পড়েন।
ফ্রান্সের সংকট তাই কেবল অর্থনৈতিক চাপের নয়; এটি সামাজিক আস্থারও সংকট। ফরাসি রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তি নাগরিকদের উচ্চ করের বিনিময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু নাগরিকেরা যদি মনে করেন, তাঁরা কর দিচ্ছেন অথচ বিনিময়ে মানসম্মত শিক্ষা, কার্যকর সরকারি সেবা কিংবা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পাচ্ছেন না, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের আস্থা দুর্বল হওয়াই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্র যখন সামাজিক সেবার সংকট মোকাবিলায় ধীরগতিতে এগোয়, অথচ বিক্ষোভ দমনে দ্রুত ও ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়, তখন নাগরিকের চোখে তার পরিচয় বদলাতে শুরু করে। সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ক্রমে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের রূপ নেয়।
ফ্রান্সের এই অস্থিরতা এমন এক ইউরোপের সংকট, যে বিশ্বরাজনীতিতে বড় শক্তি হতে চায়, কিন্তু সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার অর্থনৈতিক মূল্য নিজের নাগরিকদের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে বণ্টন করতে পারছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বাইরে সামরিক শক্তি প্রদর্শন আর ভেতরে সামাজিক আস্থা হারানো একই সঙ্গে চলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এই বৈপরীত্য রাষ্ট্রের সক্ষমতাকেই দুর্বল করে।
ফ্রান্সের রাজপথে তাই শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে না; দেখা যাচ্ছে বৈশ্বিক যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ক্ষয়ে যাওয়া সামাজিক চুক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক। যুদ্ধ দূরে ঘটলেও তার রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘরের ভেতর হতে পারে। মানুষ অনির্দিষ্টকাল এমন একটি ব্যবস্থা মেনে নিতে পারে না, যেখানে সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক, অথচ ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত সামাজিকভাবে দুর্বল মানুষের কাঁধেই বেশি পড়ে।
ফরাসি সরকারের সামনে তাই শুধু দাঙ্গা থামানোর কাজ নেই। তাকে প্রমাণ করতে হবে, প্রজাতন্ত্র নাগরিকের কথা আগুন জ্বলার আগেই শুনতে পারে। রাষ্ট্রের শক্তি কতজনকে গ্রেপ্তার করা যায়, শুধু সেই সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। বরং রাষ্ট্র কতজন মানুষকে বিশ্বাস করাতে পারে যে বিদ্যালয়ে শিক্ষক, জীবনে নিরাপত্তা এবং রাজনীতিতে মর্যাদা পাওয়ার জন্য তাঁদের শহর পোড়াতে হবে না, তা দিয়েও রাষ্ট্রের সক্ষমতা বিচার করা উচিত।
সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, কিন্তু সেই সঙ্গে সহিংসতার পেছনে থাকা সামাজিক ক্ষোভেরও রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। শুধু গ্রেপ্তার করে রাস্তা খালি করা যায়, কিন্তু মানুষের মনে জমে থাকা অবিশ্বাস দূর করা যায় না।
যে রাষ্ট্র নাগরিকের কণ্ঠ শোনার আগে কাঁদানে গ্যাসের শব্দ শোনে, সে হয়তো সাময়িকভাবে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়; কিন্তু ধীরে ধীরে হারাতে পারে রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক অধিকার।
-
ড. লুবনা ফেরদৌসী: যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শিক্ষক, গবেষক ও সমাজবিশ্লেষক। তাঁর ‘যুদ্ধ হরমুজে, আগুন ফ্রান্সে’ শিরোনামের মূল প্রতিবেদন অবলম্বনে সংক্ষেপিত ও সম্পাদিত।

