ধর্ম মানুষের কাছে শান্তি, ন্যায় ও মানবিকতার শিক্ষা নিয়ে আসে। অথচ সেই ধর্মের নামেই যখন মানুষকে অপমান করা হয়, উপাসনালয় ভাঙচুর করা হয়, কিংবা ভিন্ন বিশ্বাসের কারণে কাউকে হত্যা করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে – ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে আসলে রক্ষা করা হচ্ছে কী? মানুষের বিশ্বাস, নাকি ঘৃণা ও আধিপত্যের রাজনীতি?
রিলিজিয়াস হেটস্পিচ বা ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য কেবল কিছু উসকানিমূলক শব্দ নয়; এটি অনেক সময় বৈষম্য, সামাজিক বর্জন ও সহিংসতার পথ তৈরি করে। প্রথমে একটি জনগোষ্ঠীকে হেয় করা হয়, তারপর তাদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, একপর্যায়ে তাদের ওপর নিপীড়নকেও বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ঘৃণার ভাষা যখন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন মানবিকতার পরাজয়ের ঝুঁকিও বাড়ে।
বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন
ভারত, চীনের উইঘুর ও ফিলিস্তিন—ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার এই তিন ক্ষেত্রেই ধর্মীয় পরিচয়, নাগরিক অধিকার ও মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। ভারতে মুসলিমসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, বৈষম্য ও সহিংসতার অভিযোগ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর মুসলিমদের নির্বিচার আটক এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকারে বিধিনিষেধ নিয়ে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ব্যাপক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে। এসব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট এক না হলেও একটি নীতি সর্বজনীন — রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থের অজুহাতে কোনো জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার উপেক্ষা করা যায় না।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু প্রেক্ষাপট
আবহমান বাংলার সুফি ঐতিহ্য, বাউল দর্শন ও লোকসংস্কৃতি ধর্মীয় সহাবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মাজারে হামলা, ভাঙচুর এবং ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা সেই ঐতিহ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৯৭টি মাজারে হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। এসব ঘটনায় তিনজন নিহত ও ৪৬৮ জন আহত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই হিসাব গবেষণায় নথিভুক্ত ঘটনা; প্রতিটি ঘটনার বিচারিক নিষ্পত্তির ফল নয়।
মাজারে কে যাবেন, কীভাবে ধর্মীয় চর্চা করবেন কিংবা কোন আধ্যাত্মিক ধারায় বিশ্বাস করবেন, সেটি ব্যক্তির বিবেক ও বিশ্বাসের বিষয়। কোনো ধর্মীয় আচারের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলে তা যুক্তি ও শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। কিন্তু ভাঙচুর কিংবা হামলার মাধ্যমে অন্যের বিশ্বাসের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।
আরও মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং পরে তাঁর মরদেহে আগুন দেওয়া হয়। প্রকাশিত তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের পক্ষে সরাসরি প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়; অভিযুক্তদের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষ।
এই হত্যাকাণ্ড একটি মৌলিক সত্য সামনে আনে—অভিযোগ কখনোই হত্যার অনুমতি নয়। কেউ অপরাধ করে থাকলে তাঁর বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, জনতার হাতে নয়। গুজব কিংবা যাচাইহীন অভিযোগের ভিত্তিতে একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া বিচার নয়; এটি বিচারবহির্ভূত সহিংসতা।
আইন আছে, কার্যকর প্রয়োগ দরকার
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধকরণ এবং ৪১ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। দণ্ডবিধির ২৯৫এ ধারায় ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমানের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।
কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার আইন কাউকে হামলা, ভাঙচুর কিংবা হত্যার অধিকার দেয় না। একইভাবে ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রতিরোধের নামে বৈধ সমালোচনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও খর্ব করা যাবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মাজারে হামলা হোক কিংবা সংখ্যালঘু নাগরিকের ওপর নির্যাতন—অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় বা সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগ করতে হবে। শুধু নিন্দা জানানো নয়, অপরাধের বিচার, ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও জরুরি।
আবহমান বাংলার অতীত সম্প্রীতি
বাংলার বাউল, সুফি, বৈষ্ণব ও লোকজ ঐতিহ্য মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবিক সম্পর্কের শিক্ষা দিয়েছে। লালন সাঁইয়ের মানবতাবাদী দর্শন থেকে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা—এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলিত পথচলার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে।
তবে অতীতের সম্প্রীতি নিয়ে গর্ব করলেই বর্তমানের অন্যায় আড়াল করা যায় না। সম্প্রীতি মানে সবাই একই ধর্মে বিশ্বাস করবেন, এমন নয়; বরং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষও সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তায় বাঁচবেন। একজন মুসলমানের কাছে হিন্দু প্রতিবেশীর নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একজন হিন্দুর কাছে মুসলমান প্রতিবেশীর অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই সম্প্রীতি রক্ষায় ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সহিংসতার অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, গুজব প্রতিরোধ, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা, অপরাধীদের বিচার এবং শিক্ষায় মানবিক মূল্যবোধের চর্চা জরুরি। রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা, প্রশাসন ও গণমাধ্যম—সব পক্ষকেই ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
মানুষের মর্যাদাই হোক শেষকথা
ভারতের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, চীনের উইঘুর মুসলিমদের অধিকার কিংবা ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি বাংলাদেশের মাজার ভাঙচুর ও দীপু চন্দ্র দাস হত্যার বিরুদ্ধেও সমানভাবে সোচ্চার হতে হবে। মানবাধিকার কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা দেশের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।
বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো—ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সহিংসতা প্রতিরোধ করা, একই সঙ্গে ধর্মের নামে ভিন্নমত দমন বন্ধ রাখা। রাষ্ট্রের পরিচয় সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তিতে নয়, বরং সবচেয়ে অসহায় নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায় প্রকাশ পায়।
ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে মানুষের মর্যাদা নষ্ট করা যায় না। আবহমান বাংলার সম্প্রীতি কোনো স্লোগান নয়; এটি ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সম্মান এবং সমান নাগরিক অধিকারের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন প্রতিষ্ঠা করতে হয়। যে বাংলাদেশে মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয় নিয়ে বাঁচবে না, অভিযোগের কারণে জনতার হাতে প্রাণ হারাবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের জন্য অপমানিত হবে না—সেই বাংলাদেশই হবে প্রকৃত অর্থে মানবিক, গণতান্ত্রিক ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ।
শত শত বছর ধরে বাংলার হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষ শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। আগামী দিনেও সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও পারস্পরিক ভালোবাসার পথেই এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।
আজ বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে থেমে যাবে মণ্ডপের ঢাক। কিন্তু সম্প্রীতির ঢাক বাজতে হবে সারা বছর–প্রতিবেশীর দরজায়, মোবাইলের পর্দায়, আর যেখানেই ভিন্ন ধর্ম বা মতের কেউ ভয় পায়, সেখানেই তার পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।
উৎসব শেষ হোক, সম্প্রীতি নয়। ধর্ম যার যার, বাংলাদেশ সবার।
শুভ বিজয়া।

