সংশোধিত বাজেটে কাটছাঁট ও ব্যয়ের হিসাবে সংস্কৃতি খাতের বাস্তব চিত্র
বাজেট এলেই আলোচনা ঘুরে বেড়ায় সড়ক, সেতু আর বিদ্যুতের চারপাশে। সংস্কৃতির কথা ওঠে সবচেয়ে শেষে, প্রায় সৌজন্যের খাতিরে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় পেয়েছিল ৮২৪ কোটি টাকা, অর্থাৎ শতকরা এক ভাগের এক-দশমাংশের সামান্য বেশি। এই অঙ্ক দেখলেই বোঝা যায়, রাষ্ট্র সংস্কৃতিকে কোথায় বসিয়ে রেখেছে।
আইন শাস্তি দেয়, সংস্কৃতি পথ দেখায়
কিশোর গ্যাং, মাদক, অনলাইন আসক্তি ও সহিংসতা নিয়ে আমাদের উদ্বেগের শেষ নেই। কিন্তু সমাধানের আলোচনা প্রায় সবসময় থানা, আদালত আর আইনেই থেমে যায়। আইন কাজ করে অপরাধ ঘটার পরে। যে কিশোরের বিকেলে যাওয়ার মতো পাঠাগার, মঞ্চ বা গানের ক্লাস নেই, তার সামনে ফাঁকা সময়টা দখল করে নেয় অন্য কিছু। আমাদের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংস্কৃতিক অবকাঠামো প্রায় নেই, আর জেলা পর্যায়েরগুলোও দুর্বল। সংকটটা এখানেই।
সংখ্যাগুলো কী বলছে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৮২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যার ৪৮৪ কোটি ৯১ লাখ পরিচালন ও ৩৪০ কোটি ৮৪ লাখ উন্নয়ন খাতে। আমার হিসাবে এটি মোট বাজেটের প্রায় ০.০৯ শতাংশ। গত অর্থবছরে এই অনুপাত ছিল প্রায় ০.১০ শতাংশ, অর্থাৎ বাজেট বাড়লেও সংস্কৃতির ভাগ কমেছে।
ধারাবাহিক চিত্রটি আরও স্পষ্ট:
| অর্থবছর | সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় (প্রস্তাবিত) | মোট বাজেট | অনুপাত |
| ২০২৪-২৫ | ৭৭৮.৮৬ কোটি | ৭.৯৭ লাখ কোটি | ০.০৯৮% |
| ২০২৫-২৬ | ৮২৪ কোটি | ৭.৯০ লাখ কোটি | ০.১০৪% |
| ২০২৬-২৭ | ৮২৫.৭৫ কোটি | ৯.৩৮ লাখ কোটি | ০.০৮৮% |
(২০২৪-২৫: ৭৭৮.৮৬ কোটি টাকার প্রস্তাব; ২০২৫-২৬: ৮২৪ কোটি টাকা, যার ৪৮৭ কোটি পরিচালন ও ৩৩৭ কোটি উন্নয়নে।)
দুই বছরে সংস্কৃতি খাতের প্রস্তাবিত বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ, আর একই সময়ে মোট বাজেট বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ সংস্কৃতি এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
কাগজের বরাদ্দ, হাতের টাকা
প্রস্তাবিত অঙ্ক ও শেষ পর্যন্ত খরচের মধ্যে ফারাকও আছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রস্তাবিত ৮২৪ কোটি টাকা সংশোধিত বাজেটে কমে ৭৫৩ কোটি হয়েছে। এটি প্রায় ৭১ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৮ শতাংশের বেশি কাটছাঁট। নাট্যজন মামুনুর রশীদ আগেই অভিযোগ করেছিলেন যে এই স্বল্প বরাদ্দের অর্থও অনেক সময় ফেরত যায়। মন্ত্রণালয় অবশ্য পরিকল্পনার অভাবের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পরিকল্পনা সম্মিলিতভাবেই হয়।
বৃহত্তর চিত্রেও সংস্কৃতির অবস্থান নাজুক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তথ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় মিলিয়ে পুরো বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্মবিষয়ক খাতের বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ০.৮ শতাংশ।
দাবি কীভাবে বেড়েছে
সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি নতুন নয়, তবে অঙ্কটা বদলেছে:
- ২০২২-২৩: উদীচী জানায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম ১ শতাংশ চেয়ে আসছে, কিন্তু বাস্তবে ০.১ শতাংশেরও কম মেলে।
- ২০২৩-২৪: সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ৬৯৯ কোটি টাকার প্রস্তাবে হতাশ হয়ে শহীদ মিনারে সমাবেশ ডাকে এবং অন্তত ১ শতাংশ দাবি করে।
- ২০২৬-২৭: বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কর্মী সংঘ ন্যূনতম ২ শতাংশ চেয়েছে। জাতীয় চলচ্চিত্র আন্দোলনের আলোচনায় অন্তত ১ শতাংশ বরাদ্দ, ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে ৫০০ কোটি টাকা এবং একটি স্থায়ী জাতীয় সৃজনশীল শিল্প কমিশনের দাবি উঠেছে। ১৯ জুনের সমাবেশে চরণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংগীত, নৃত্য, নাটক, চারুকলা ও শারীরিক শিক্ষা চালু এবং বিশেষ শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানায়, আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব বাতিলের খবরে ক্ষোভ প্রকাশ করে।
২ শতাংশ মানে কত টাকা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরে আমার হিসাবে:
- ১ শতাংশ = প্রায় ৯,৩৮০ কোটি টাকা (বর্তমানের প্রায় ১১ গুণ)
- ২ শতাংশ = প্রায় ১৮,৭৬০ কোটি টাকা (বর্তমানের প্রায় ২৩ গুণ)
বর্তমান বরাদ্দ প্রায় ১৭ কোটি মানুষের জন্য মাথাপিছু বছরে প্রায় ৪৯ টাকা (জনসংখ্যা আনুমানিক ধরা)
আন্তর্জাতিক তুলনা
সংস্কৃতি অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখে। ইউনেসকোর ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালে সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল শিল্প বৈশ্বিক জিডিপির ৩.১ শতাংশ এবং বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের ৬.২ শতাংশ জোগান দিয়েছে। ২০১৫ সালের আরেকটি সমীক্ষায় এই খাতের বার্ষিক আয় ২.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং কর্মসংস্থান ২ কোটি ৯৫ লাখ বলে হিসাব করা হয়েছিল।
দক্ষিণ কোরিয়া সংস্কৃতিতে বড় বিনিয়োগের উদাহরণ। ২০২৭ সালের জন্য তাদের সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ৯.৬৩৪ ট্রিলিয়ন ওয়ান প্রস্তাব করেছে, যা ২২.৬ শতাংশ বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ে এর অংশ ১.০৮ থেকে ১.১৬ শতাংশে উঠেছে। তাদের লক্ষ্য সাংস্কৃতিক কনটেন্ট শিল্পের আয় ২০২৩ সালের ১৫৪ ট্রিলিয়ন ওয়ান থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে ২১৫ ট্রিলিয়নে নেওয়া।
এই তুলনার একটি সীমাবদ্ধতা মনে রাখা দরকার। কোরিয়ার ওই মন্ত্রণালয়ে ক্রীড়া ও পর্যটনও অন্তর্ভুক্ত। তবু সেখানকার অনুপাত ১.১৬ শতাংশ, যা আমাদের ০.০৯ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি, আবার ২ শতাংশের চেয়ে কম। এটি দাবির যুক্তি শক্ত করে, আবার দেখায় যে ২ শতাংশ বিশ্বমানদণ্ডেও উচ্চাভিলাষী।
সংস্কৃতিকর্মীদের নিজেদের স্বীকৃত সংকট
শুধু অর্থই একমাত্র সমস্যা নয়, এ কথা সংস্কৃতিঙ্গনের ভেতর থেকেও উঠেছে। ডেইলি স্টারের এক গোলটেবিলে যাত্রাশিল্প উন্নয়ন সমিতির সভাপতি বলেন, নীতিনির্ধারণে যাত্রাশিল্পীদের কেউ যুক্ত নন, আর চলচ্চিত্রকার তানিম নূর ডিজিটাল উদ্যোগের জন্য আলাদা বাজেট চেয়ে মন্ত্রণালয়কে ভবিষ্যৎমুখী হতে বলেন। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন আহমেদ স্টালিনের বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্র প্রণোদনা দিতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতি মূলত মানুষই সৃষ্টি করে। এসব কথা থেকে স্পষ্ট, বরাদ্দের সঙ্গে পরিকল্পনা, অংশগ্রহণ ও সক্ষমতার প্রশ্নও জড়িত।
আমার মূল্যায়ন ও প্রস্তাব
২ শতাংশ দাবিটি সংস্কৃতির প্রতি দীর্ঘ অবহেলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বোঝা যায়। কিন্তু এক লাফে প্রায় ২৩ গুণ বরাদ্দ বাড়ালে তা খরচ করার সক্ষমতা, জবাবদিহি ও রাজধানী-কেন্দ্রিকতার ঝুঁকি থেকে যায়। সংশোধিত বাজেটে কাটছাঁটের ইতিহাস সেই ঝুঁকিকে বাস্তব করে। তাই আমি ধাপে ধাপে এগোনোর কথা বলব:
- তিন-পাঁচ বছরের রোডম্যাপ: আগে ০.৫ শতাংশ, পরে ১ শতাংশ, তারপর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ২ শতাংশ।
- সংশোধিত বাজেটে কাটছাঁট বন্ধ: সংস্কৃতির উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যয়ের হার প্রকাশ্য করা।
- উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ: নির্দিষ্ট অংশ বাধ্যতামূলকভাবে জেলা-উপজেলার পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে।
- শিক্ষায় সংস্কৃতি: প্রাথমিক স্তরে সংগীত ও চারুকলা শিক্ষক নিয়োগ।
- ডিজিটাল সংরক্ষণ তহবিল: লোকঐতিহ্য ও আর্কাইভ ডিজিটাইজেশনের আলাদা বরাদ্দ।
- নীতিনির্ধারণে শিল্পীদের উপস্থিতি: যাত্রা, লোকসংগীত ও চলচ্চিত্রের প্রতিনিধিদের পরামর্শক কাঠামোয় রাখা।
পরিশেষে প্রশ্নটা কেবল ২ শতাংশ নাকি ১ শতাংশের নয়। যে খাতের শেকড় ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে, তার জন্য রাষ্ট্রের হিসাবের খাতায় ০.০৯ শতাংশ বরাদ্দ কতটা মানানসই, সেটাই ভাবার বিষয়। সংস্কৃতিকে খরচ নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখার সংকল্প বাজেটের অঙ্কেই প্রতিফলিত হওয়া দরকার।

