১ অক্টোবর সামি আবু শেহাদেহ ইসরায়েলের সর্বোচ্চ আদালতে হাজির হলে সেই শুনানিতে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে অনেক কিছু প্রকাশ পায়।
সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন থেকে দুটি ফিলিস্তিনি নির্বাচনী তালিকা এবং দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। তাঁরা হলেন হাদাশের ইহুদি ইসরায়েলি আইনপ্রণেতা ওফার কাসিফ এবং বালাদের নেতা আবু শেহাদেহ।
নয়জন বিচারপতির একটি প্যানেলের সামনে আবু শেহাদেহকে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, ৭ অক্টোবর ২০২৩-এ নিহত ইসরায়েলিদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি এবং তাঁর আনুগত্য নিয়ে প্রকাশ্য জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পরদিন আরব৪৮ নিউজ সাইটে প্রকাশিত তাঁর একটি নিবন্ধ।
তিনি বারবার বিচারকদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে তিনি হামলা ও বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার বিরোধী। নিবন্ধটি লেখার জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করতেও তাঁকে বারবার চাপ দেওয়া হয়েছিল।
আদালত দুটি তালিকা এবং কাসিফের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। তবে আবু শেহাদেহকে আদালত জানায় যে অধিকাংশ বিচারপতি তাঁর অযোগ্যতা বহাল রাখবেন। এ অবস্থায় তাঁকে আবেদন প্রত্যাহারের জন্য এক দিন সময় দেওয়া হয়।
তিনি আবেদন প্রত্যাহার করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল যে তিনি জয়েন্ট লিস্ট এবং বৃহত্তর অর্থে সংসদীয় কার্যক্রমকে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার পরিণতি থেকে রক্ষা করতে চান। এর ফলে ১৯৮৫ সালে ইসরায়েলের অযোগ্যতা আইন প্রণয়নের পর প্রথম ফিলিস্তিনি নেতা হিসেবে তিনি নেসেট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে ছিটকে পড়েন।
ইসরায়েলি নাগরিকত্ব থাকা অনেক ফিলিস্তিনি এই শুনানিকে অপমানজনক বলে মনে করেছেন। যদিও ঘটনাটি মোটেও আশ্চর্যজনক নয়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর ওই ভূখণ্ডে থেকে যাওয়া এবং একটি বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে কী প্রকাশ পায়?
ইসরায়েলি আবেগিক ব্যবস্থাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ভয়, শত্রুতা ও সন্দেহের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক মতপ্রকাশকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয় তা কীভাবে তাঁদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিস্থিতিকে রূপ দেয়? এমনকি ফিলিস্তিনিদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরোপ বা তাঁদের রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো আইনি ভিত্তি না থাকলেও এই প্রবণতা কীভাবে কাজ করে?
আবু শেহাদেহকে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে। কোন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিরা একটি বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন এবং একই সঙ্গে সেই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রাখতে পারেন যাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করেই ওই রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আমাদের নাকবার পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনি নাগরিকত্বের বিকাশের দিকে ফিরে তাকাতে হবে।
সামরিক শাসন
সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেসব ফিলিস্তিনি ওই ভূখণ্ডে থেকে গিয়েছিলেন তাঁরা নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত হন। একই সঙ্গে তাঁরা সামরিক শাসন, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, নজরদারি এবং তাঁদের জাতীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর পরিকল্পিত দমন-পীড়নের শিকার হন।
তাঁদের নাগরিকত্ব বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক প্রকল্প থেকে কোনো বিচ্যুতি ছিল না। বরং এটি তাঁদের শাসন ও নিয়ন্ত্রণ এবং বঞ্চিত করার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। নেসেটে তাঁদের অংশগ্রহণও সেই কাঠামোর মধ্যেই গড়ে উঠেছিল।
১৯৬৬ সাল পর্যন্ত স্থায়ী সামরিক শাসনের সময় বহু ফিলিস্তিনি নাগরিক সরাসরি জায়নবাদী দলগুলোকে বিশেষ করে শাসক দল মাপাইকে ভোট দিতেন। অন্যদিকে তাঁরা আরব প্রার্থীদের নেতৃত্বাধীন কিন্তু ওই দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত ও নির্ভরশীল ‘উপগ্রহ তালিকা’কেও ভোট দিতেন।
নাকবার পরবর্তী পরিস্থিতি এই ধারার জন্ম দিয়েছিল। ফিলিস্তিনিদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং পরাজয়ের পর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে নামতে হয়েছিল তাঁদের। একই সঙ্গে সামরিক শাসন তাঁদের চলাচলের স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান, অনুমতিপত্র এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সামরিক গভর্নরদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছিল।
সে সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলন অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে রূপ পেয়েছিল। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ‘সুমুদ’ বা অবিচলতা, ভূমিতে টিকে থাকা এবং মৌলিক অধিকার আদায়ের দাবি। এসবের মধ্যে সামরিক শাসনের অবসান ছিল প্রধান। বৃহত্তর ফিলিস্তিনি জাতীয় প্রশ্নটি সতর্কতার সঙ্গে এবং গোপনে মোকাবিলা করা হতো।
একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি দল গঠন করা সম্ভব ছিল না। জায়নবাদী দলগুলোর বাইরে ইসরায়েলের নির্বাচনে ফিলিস্তিনিদের প্রথম অংশগ্রহণ ঘটে ন্যাশনাল লিবারেশন লীগের মাধ্যমে। ১৯৪৯ সালের নির্বাচনের আগে সংগঠনটি কমিউনিস্ট পার্টি মাকিতে যোগ দেয়। পরবর্তী সময়ে দলটি ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক সংগঠন এবং সামরিক শাসনের বিরোধিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোয় পরিণত হয়।
১৯৬৫ সালে জায়নবাদ ও ফিলিস্তিনিদের জাতীয় অধিকার নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে মাকি দলে বিভেদ দেখা দেয়। দলটির প্রধানত ফিলিস্তিনি অংশ রাকাহ প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী সময়ে সংগঠনটি ফিলিস্তিনি জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে ক্রমশ নিজেদের যুক্ত করে নেয়। একই বছর জাতীয়তাবাদী আল-আর্দ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আরব সোশ্যালিস্ট লিস্ট নেসেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চেষ্টা করে এবং অযোগ্য ঘোষিত হয়।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতারা তখন থেকেই তাঁদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করে আসছেন। একই সঙ্গে তাঁরা নিজেদের সম্প্রদায়কে সংগঠিত করা, প্রতিনিধিত্ব করা এবং সম্মিলিত দাবি তুলে ধরার জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। ফিলিস্তিনি দলগুলোকে বাধা দেওয়ার বর্তমান প্রচেষ্টা সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই অংশ। এই ইতিহাসে তাঁদের সংসদীয় অংশগ্রহণকে কখনো অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কখনো নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং কখনো তা নির্মূল করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় রাজনীতি
পণ্ডিত মুহান্নাদ মুস্তফা ও আসাদ ঘানেম যেমনটি নথিভুক্ত করেছেন, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি ফিলিস্তিনি জাতীয় চেতনাকে শক্তিশালী করে এবং ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বৃহত্তর জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করে।
এরপর নতুন আন্দোলন ও স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আরব স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রধানদের জাতীয় কমিটি’। ১৯৭৫ সালে গঠিত হয় ‘আরব ভূমি প্রতিরক্ষা কমিটি’। পরের বছর এই কমিটি প্রথম ‘ভূমি দিবস’ বিক্ষোভের আয়োজন করে।
১৯৭৭ সালে রাকাহ অন্যান্য আরব ও ইহুদি গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে শান্তি ও সমতার গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ‘হাদাশ’ প্রতিষ্ঠা করে।
হাদাশের কর্মসূচিতে ফিলিস্তিনি জাতীয় আন্দোলনের রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাগরিক সমতা ও শ্রমিক অধিকারের দাবিকে ফিলিস্তিনিদের জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক সংগঠন ও সংসদীয় প্রতিনিধিত্বে হাদাশ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
১৯৭০-এর দশকে গড়ে উঠতে শুরু করা ইসলামী আন্দোলন ১৯৮০-এর দশকে তার সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করে। ক্রমে এটি স্থানীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়।
১৯৮৭ সালের প্রথম ইন্তিফাদা ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক সংহতি আরও গভীর করে। এই সংহতি প্রকাশ পায় ইসরায়েলের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনিদের প্রতি বস্তুগত সমর্থনের মধ্য দিয়ে।
১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি আরেকটি যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসে। এর ফলে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক আলোচনায় নাগরিকত্ব, সম্মিলিত জাতীয় অধিকার এবং ইসরায়েলি রাষ্ট্রের স্বরূপের মতো প্রশ্ন গুরুত্ব পায়।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৫ সালে বিভিন্ন ধারার জাতীয়তাবাদী কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের একত্র করে ‘বালাদ’ বা জাতীয় গণতান্ত্রিক পরিষদ আত্মপ্রকাশ করে। এর কর্মসূচিতে রাষ্ট্রের জায়নবাদী ও ঔপনিবেশিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়। একই সঙ্গে সব নাগরিকের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনিদের সম্মিলিত অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনসহ একটি জাতীয় জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়।
সংসদীয় সীমা
বালাদের নেতৃত্বের মধ্যে নেসেটে প্রবেশ করা উচিত কি না তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা স্বীকার না করেই রাষ্ট্রের ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানো এবং ফিলিস্তিনিদের জাতীয় দাবি এগিয়ে নেওয়ার মঞ্চ হিসেবে সংসদীয় রাজনীতিকে বেছে নেয়।
এদিকে ১৯৯৬ সালে একই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ইসলামী আন্দোলন উত্তর ও দক্ষিণ শাখায় বিভক্ত হয়। দক্ষিণ শাখা সংযুক্ত আরব তালিকা ‘রা’আম’-এর মাধ্যমে সংসদে প্রবেশ করে।
তা’আল এবং আরব মুভমেন্ট ফর রিনিউয়ালের পাশাপাশি এই তিনটি দল ফিলিস্তিনি ভোটারদের বিভিন্ন মাত্রার উপস্থিতি নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়। সংসদীয় অংশগ্রহণ কতটা কার্যকর তা নিয়ে জোরালো বিতর্কের মধ্যে ২০০৯ সালে ভোটার উপস্থিতি সেই সময় পর্যন্ত সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
২০১৪ সালে নেসেট নির্বাচনী ন্যূনতম ভোটের হার বাড়িয়ে দেয়। পদক্ষেপটিকে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিত্ব বাদ দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাপকভাবে দেখা হয়েছিল। কারণ কোনো দলই এককভাবে নতুন সীমা অতিক্রম করতে পারবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় চারটি দল ২০১৫ সালের নির্বাচনের জন্য যৌথ তালিকা গঠন করে।
এই ইতিহাস দেখায় যে ফিলিস্তিনিদের সংসদীয় অংশগ্রহণ কখনোই সুপ্রতিষ্ঠিত কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আদৌ অংশগ্রহণ করা হবে কি না তা নিয়েও কখনো ব্যাপক রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
বৃহত্তর জাতীয় সংগ্রাম এবং ফিলিস্তিনি নাগরিকদের পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এই অংশগ্রহণের ধরন ও অর্থ বারবার বদলেছে। তবু বিভিন্ন কৌশল ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ওপর আরোপিত কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে।
ফিলিস্তিনি দলগুলো ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে দুটি তালিকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। একটি হলো হাদাশ, বালাদ ও তা’আলকে নিয়ে গঠিত যৌথ তালিকা। অন্যটি এককভাবে রা’আম।
এই বিভাজন শুধু নির্বাচনী কৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের উদ্দেশ্য এবং ইসরায়েলি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পরিণতি নিয়ে ফিলিস্তিনিদের বৃহত্তর বিতর্কের প্রতিফলন। এ ক্ষেত্রে রা’আম ক্রমশ একীভূতকরণপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্ট মূলত বিরোধী অবস্থান ধরে রেখেছে।
সংকীর্ণ ব্যবধান
নেসেটে ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণ কখনোই জায়নবাদী রাজনীতির সীমাবদ্ধতা, প্রভাবশালী ইসরায়েলি দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভয়ের রাজনীতি থেকে মুক্ত ছিল না। ফিলিস্তিনি দলগুলোকে অযোগ্য ঘোষণার প্রচেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত আবু শেহাদেহর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তোলার ঘটনা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে এসব সীমাবদ্ধতা প্রয়োগের পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন এসেছে।
ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক মতপ্রকাশ জায়নবাদী আধিপত্য, নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ও দমন-পীড়নের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। তবে ৭ অক্টোবরের পর এসব বিধিনিষেধ তীব্রভাবে বেড়েছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের জন্য অনুমোদিত রাজনৈতিক জীবনের সীমানা নতুন করে নির্ধারিত হয়েছে।
গাজার প্রতি সংহতি প্রকাশসহ রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ক্রমবর্ধমান অপরাধীকরণ, রাজনৈতিক সংগঠন ও সম্মিলিত সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধ, হাদাশের মতো দলের কার্যালয়ে পুলিশের অভিযান, বিক্ষোভ দমন এবং কর্মীদের গ্রেপ্তার ও দীর্ঘমেয়াদি আটকের ঘটনাগুলোতে এই প্রবণতা স্পষ্ট।
ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক আটকাদেশের ব্যবহারেও এর প্রতিফলন রয়েছে। বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী গাজায় গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে ইসরায়েলি আদালতগুলো ইসরায়েল ও পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের সংশ্লিষ্ট এ ধরনের ২৯৭টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে।
রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার যে সীমিত সুযোগ আগে থেকেই ছিল তা আরও সংকুচিত হয়েছে। বৈধ ও অবৈধ রাজনৈতিক কার্যকলাপের সীমারেখাও অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। ৭ অক্টোবরের আগে সীমাবদ্ধ পরিবেশের মধ্যেও মতপ্রকাশ ও সংগঠিত হওয়ার যেসব সুযোগ ছিল সেগুলো বাস্তবে ক্রমেই নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, শাস্তিযোগ্য হয়ে উঠছে অথবা বাধার মুখে পড়ছে।
এসব বিধিনিষেধ শুধু আইন বা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মাধ্যমে আরোপ করা হয় না। বিরাজমান পরিস্থিতি, ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের প্রতি ক্রমবর্ধমান বৈরিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও কর্মক্ষেত্রে নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিস্তারও তাঁরা কী বলতে পারবেন এবং কোন বিষয়ের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করতে পারবেন তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিচয়, সম্মিলিত শোক ও সংহতির প্রকাশকে ক্রমবর্ধমানভাবে সন্ত্রাসবাদের সমর্থন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। অন্যদিকে গ্রেপ্তার, চাকরিচ্যুতি, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা সামাজিক প্রতিশোধের আশঙ্কায় ফিলিস্তিনিরা নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁরা বিক্ষোভ এড়িয়ে চলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট মুছে ফেলছেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন অথবা নীরব থাকছেন। অথচ তাঁদের এসব কাজের কোনোটিই হয়তো বেআইনি নয়।
এভাবেই রাজনৈতিক মনোভাব, শাস্তির আশঙ্কা এবং হুমকির অভ্যন্তরীণীকরণের মধ্য দিয়ে অনুমোদিত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সীমা নতুন করে নির্ধারিত হচ্ছে।
ভয়ের মধ্যে নেতৃত্ব
এখানে সংসদীয় অংশগ্রহণ এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে এর সীমাবদ্ধতার প্রশ্নে ফিরে আসা যায়। শুধু ইসরায়েলি রাজনীতিতে ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণের সংকীর্ণ সুযোগ আরও কমে যাচ্ছে কি না তা বিবেচ্য নয়। বৃহত্তর অর্থে ক্রমবর্ধমান বৈরিতা ও রাজনৈতিক সহিংসতা ফিলিস্তিনিদের কৌশল এবং সম্মিলিত আন্দোলনকে কীভাবে নতুন রূপ দিতে পারে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলের ভয়, শত্রুতা ও ভীতি প্রদর্শনের আবেগনির্ভর রাজনীতি ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কতটা প্রভাবিত করেছে সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
ভয় ও সতর্কতার বিরাজমান পরিবেশ নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়েছে। পুলিশ উম্ম আল-ফাহম ও সাখনিনে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে নাজারেথে একটি জাগরণী অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে উচ্চ পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রধান মোহাম্মদ বারাকাহকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশকে এড়াতে ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর নাজারেথে কমিটির আয়োজিত একটি সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয় মাত্র কয়েক মিনিট আগে। ওই সমাবেশে শুধু নেতৃত্ব পর্যায়ের ব্যক্তিদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
গণহত্যা শুরু হওয়ার তিন মাসেরও বেশি সময় পর ২০২৪ সালের ২০ জানুয়ারি হাইফায় হাদাশের নেতৃত্বে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশ তিনবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং সুপ্রিম কোর্টে আবেদনও করা হয়। শেষ পর্যন্ত সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়, তবে উপস্থিতির সংখ্যা ৭০০ জনে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
তীব্র দমন-পীড়নের মধ্যে এমন সতর্কতা বোধগম্য। কিন্তু তা ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতাদের কিংবা বৃহত্তর অর্থে ফিলিস্তিনিদের নিপীড়ন ও রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারেনি। আবু শেহাদেহর আবেদন প্রত্যাহারের ঘটনা তারই প্রমাণ।
এতে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে থাকা ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব তাঁদের মুখোমুখি হওয়া পরিবর্তনের ব্যাপকতা ও জটিলতা যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারবেন কি না।
এই পরিস্থিতি কি ইসরায়েলের অভ্যন্তরে থাকা ফিলিস্তিনিদের বৃহত্তর ফিলিস্তিনি জাতীয় সংগ্রামের অংশ হিসেবে নিজেদের লড়াইকে নতুন করে তুলে ধরতে উৎসাহিত করতে পারে? সংসদীয় অংশগ্রহণের ভবিষ্যতের জন্য এর অর্থ কী হবে? আর এই পরিস্থিতি কি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের ক্রমশ সংকুচিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক সংগঠন নিয়ে আরও মৌলিক পুনর্বিবেচনার পথ তৈরি করবে?

