একটি সরু পথ ধরে ধ্বংসস্তূপের স্তূপ পেরিয়ে প্রায় ২০ জন সুসজ্জিত মানুষ অপেক্ষা করছেন। তাঁরা সবাই কূটনীতিক। তাঁদের সঙ্গে আল-বুস্তান পরিদর্শনে যোগ দিয়েছি আমি। এটি অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের একটি ফিলিস্তিনি এলাকা যা ভেঙে ফেলার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে অনেক বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়েছে। বুস্তান (অর্থাৎ ‘ফলের বাগান’) বসতি স্থাপনকারীদের জন্য গাড়ি পার্কিং ও বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত করা হবে। তবে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের জন্য নয়। কারণ তত দিনে তাঁরা আর সেখানে থাকবেন না।
একসময়ের একটি বাড়ির ধ্বংসাবশেষের পাশ দিয়ে আমরা হোঁচট খেতে খেতে এগোই। বাগানে একটি ক্যারাভ্যান রয়েছে। সেখানে এর মালিক ফখরি আবু দিয়াব আমাদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর স্ত্রী আমিনা তাঁদের পাঁচ সন্তানের মা। তিনি কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন।
‘ভোর তিনটায় তারা এলো। কালো মুখোশ পরা সশস্ত্র সৈন্যরা আমার মাথায় বন্দুক ধরল,’ সাম্প্রতিক এক সফরের কথা স্মরণ করে ফখরি বলেন। ‘তারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেল।’
আরেকবার তারা আমিনার চশমা ভেঙে দিয়েছিল। ভয়ে তিনি এত জোরে চোয়াল চেপে ধরেছিলেন যে তাঁর দাঁত ভেঙে গিয়েছিল।
কূটনীতিকেরা অস্বস্তিতে পা নাড়াচাড়া করেন। ষাটোর্ধ্ব ফখরি ও আমিনা সারাজীবন বুস্তানেই কাটিয়েছেন। ফখরি স্থানীয় বাসিন্দা কমিটির চেয়ারম্যান। কিন্তু তিনি আর বেশিদিন এখানকার বাসিন্দা থাকবেন না।
৪ অক্টোবর তাঁর বাড়ির গেটে নতুন করে ভাঙার আদেশ সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ২১ দিনের মধ্যে তাঁদের অস্থায়ী বাড়িটি ভেঙে ফেলার কথা রয়েছে। তারপর তাঁরা কোথায় যাবেন তা জানেন না।
‘যখনই আমি বুলডোজার বা অন্য কোনো যন্ত্রপাতির শব্দ শুনি তখনই আমার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া হয় যে ওরা আমাদের দিকেই আসছে,’ ফখরি মিডল ইস্ট আইকে বলেন।
জনসংখ্যা পুনর্গঠন
দরজার ঠিক বাইরেই স্যুটকেসগুলো গাদাগাদি করে রাখা আছে। ফখরি জানান, বুলডোজারগুলো মাঝেমধ্যে কোনো আগাম খবর না দিয়েই এসে পড়ে। ফলে প্রায়ই জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগই মেলে না।
জেরুজালেম পৌরসভা ফিলিস্তিনিদের নিজেদের বাড়িঘর ‘স্বেচ্ছায় ভেঙে ফেলার’ সুযোগ দিচ্ছে। ফখরি সতর্ক করে বলেন, ‘আপনারা যদি তা না করেন তাহলে পৌরসভা আপনাদের হয়ে তা করবে এবং আপনাদের কাছে এর বিল পাঠিয়ে দেবে।’
ফখরি জানান, তাঁর বাড়িটি ধ্বংস করার সময় তিনি ৪৩ হাজার শেকেল (১৩ হাজার ৮০০ ডলার) পরিশোধ করেছিলেন।
কয়েকজন কূটনীতিক নিজেদের মুঠোফোন পরীক্ষা করছেন।
আল-আকসা মসজিদের আধা মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি উপত্যকার তলদেশে অবস্থিত বুস্তানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি বাস করতেন। অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের জনবিন্যাস পুনর্গঠনের বৃহৎ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এলাকাটি ধ্বংস করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বিৎসলেমের এক বিবৃতি অনুসারে এই ধ্বংসযজ্ঞ ‘বৈষম্যমূলক আইনকে কাজে লাগিয়ে জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা এবং এলাকাটিকে “ইহুদীকরণ” করার লক্ষ্যে পরিচালিত ইসরায়েলি নীতির সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ’।
সংস্থাটি আরও বলেছে, ‘এই পদক্ষেপগুলো এই অঞ্চলের অন্যতম রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল এলাকায় ইসরায়েলি উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের জন্য পরিকল্পিত। বর্তমানে পশ্চিম তীরজুড়ে চলমান ব্যাপক জাতিগত নির্মূল অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেও এগুলো কাজ করছে।’
এদিকে ফখরি কূটনীতিকদের কাছে হতাশা নিয়ে আবেদন জানান, ‘আমরা বিশ্বকে অনুরোধ করছি আমাদের অবশিষ্ট বাড়িঘরগুলো ধ্বংস না করার জন্য ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করুন। আমাদের নিজেদের বাড়িতে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদে বসবাস করার অধিকার আছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে দিচ্ছে। ইসরায়েল যখন আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে কাজ করছে তখনও আপনারা তাকে ভয় পাচ্ছেন কেন?’
তিনি জানান, ২০২৪ সালের ভালোবাসা দিবসে তাঁর বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এর এক মাস আগে তৎকালীন মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী (ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিষয়ক) অ্যান্ড্রু মিলার বুস্তানে তাঁর বাড়িতে সরকারি সফরে গিয়েছিলেন।
‘যখন পরে আমাদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলা হবে তখন কূটনীতিকদের সঙ্গে দেখা করার দরকার কী?’ ফখরি প্রশ্ন করেন।
গাড়িতে ঘুমানো
ফখরি বলেন, ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংস করতে ব্যবহৃত বুলডোজার প্রস্তুতকারী দেশগুলো থেকেও তিনজন প্রতিনিধি তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই যন্ত্রগুলো সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। সভ্যতাকে ধ্বংস করার জন্য নয়।’
খুব বেশি কূটনীতিককে নোট নিতে দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের অধিকাংশই ইউরোপের। কয়েকজনকে বিরক্ত মনে হলেও একজন সুইস প্রতিনিধিকে বেশ আগ্রহী বলেই মনে হচ্ছে।
‘আপনারা সাহায্য করার জন্য কী করতে পারেন?’ ফখরি মিনতি করে বলেন। ‘আমরা আশা হারিয়ে ফেলেছি। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সাহায্য চাই। আমাদের কোনো পরিচয় বা রাষ্ট্র গঠনের অনুমতি নেই। আমরা শুধু কথার বদলে কাজ চাই।’
তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, ‘আমরা জানি না তরুণেরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।’
এ সফরে কোনো ব্রিটিশ কূটনীতিক উপস্থিত নেই। পশ্চিম তীরের বসতিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েল গত সপ্তাহে ব্রিটিশ কনস্যুলেট থেকে বেশির ভাগ ব্রিটিশ কূটনীতিককে বের করে দিয়েছে।
আল-বুস্তানকে রক্ষার জন্য ব্রিটিশ নীতির এই পরিবর্তন অনেক দেরিতে এসেছে। তা ছাড়া এই পদক্ষেপ কোনোভাবেই এখানকার পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য নয়।
পূর্ব জেরুজালেমের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূল করছে জেরুজালেম পৌরসভা ও ইসরায়েলি সরকার। এটি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাসবাদের বিষয় নয়।
ইসরায়েলি অলাভজনক সংস্থা ইর আমিম গতকাল ‘বহিষ্কার: অধিকারচ্যুতির রাষ্ট্রীয় কাঠামো’ শিরোনামে একটি উদ্বেগজনক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখানো হয়েছে, কার্যত ইসরায়েলের প্রায় সব সরকারি সংস্থাই পূর্ব জেরুজালেমের বাসিন্দাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার সঙ্গে জড়িত।
অন্য কথায় ব্রিটিশ নীতির পরিবর্তন নিয়ে উচ্ছ্বাসের পরও ফিলিস্তিনিরা এখনো পুরোপুরি পরিত্যক্ত।
ফখরি আমাদের বাইরে নিয়ে যান। আমরা তাঁর একসময়ের বাড়ির ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে এগিয়ে যাই। আমাদের ডান দিকে একটি খেলার মাঠ রয়েছে। সেটিও ধ্বংসের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। বাঁ দিকে একটি ফুটবল মাঠ। সেটিরও একই অবস্থা।
সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে—সম্পত্তি, গণসুবিধা, সম্প্রদায়, পরিবার, জীবন ও আশা।
আমি ফখরিকে জিজ্ঞেস করি, লোকেরা কোথায় যাবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি না। কেউ কেউ এখন গাড়িতেই ঘুমাচ্ছেন।’
আমরা কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে অন্য একটি বাড়ির বসার ঘরে ঢুকি। বাড়িটির মালিক ইমাদ বদরান। ৫৬ বছর বয়সী এই অন্ধ ব্যক্তি আদালতে তাঁর বাড়ি ভাঙার আদেশের বিরুদ্ধে লড়ছেন।
‘আমি একজন প্রতিবন্ধী। আমি আমার প্রতিবন্ধী স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গে থাকি। আমার ছেলের বাড়ি ইতিমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমার মতো একজন অন্ধ মানুষের পক্ষে এই অবস্থায় থাকার জায়গা খুঁজে পাওয়া কীভাবে সম্ভব? যদি থাকার কোনো জায়গা পাওয়াও যায় তাহলে মাসে ৬ থেকে ৭ হাজার শেকেল খরচ আমি কীভাবে জোগাড় করব?’ তিনি বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘এই ভাঙচুরের কোনো প্রয়োজন নেই। এগুলো করা হলে আমি রাস্তায় এসে পড়ব।’
অনুরোধ উপেক্ষা করা হয়েছে
বদরান বলেন, তিনি জেরুজালেম পৌরসভার একজন কর্মীকে তাঁর পরিস্থিতির কথা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। জবাবে ওই কর্মী বলেছিলেন, ‘এটা আমার সমস্যা নয়।’
কূটনীতিকদের একজন বলেন, ‘আপনাদের কণ্ঠস্বর ও কথা শোনাটা জরুরি।’
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল এক বৃদ্ধার বাড়ি। গত মাসে বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তাঁকে পাওয়া গেল না। জানানো হলো, তিনি বাইরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
ওই দিনই প্রথমবারের মতো তিনি নিজের পুরোনো বাড়িতে ফিরেছিলেন। তাঁর ছেলে ফখরিকে বার্তা দিয়ে জানান, বাড়িটির অবস্থা দেখে তিনি এতটাই মর্মাহত হয়েছিলেন যে কথা বলতে পারছিলেন না। এরই মধ্যে তিনি সেখান থেকে চলে গেছেন।
অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে বসতি স্থাপনকারীদের চালানো সহিংসতার ঢেউয়ের দিকে এখন বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ। আমাদের সফরের কয়েক দিন পর ইউরোপীয় কূটনীতিকদের বহনকারী একটি গাড়িবহরকে বসতি স্থাপনকারীরা ঘিরে ধরে এবং পাথর ছোড়ে।
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমজুড়েই এসব উচ্ছেদ চলছে। এগুলো একই জাতিগত নির্মূল কর্মসূচির অংশ।
ফখরি পরে মিডল ইস্ট আইকে জানান, তাঁর গল্প শুনতে বুস্তানে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি এসেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, সাবেক আইরিশ প্রেসিডেন্ট মেরি রবিনসন, ফিলিস্তিন বিষয়ক সাবেক মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধি হাদি আমর এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি টম ফ্লেচার। সম্প্রতি নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত দক্ষিণ আফ্রিকার আইনবিদ নাভি পিল্লাইও এখানে এসেছেন।
সবাই শুনেছেন ও দেখেছেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। জেরুজালেম পৌরসভা যদি তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারে তাহলে বুস্তান—যা কিছুদিন আগেও একটি সমৃদ্ধ ফিলিস্তিনি জনপদ ছিল—শিগগিরই গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় পরিণত হবে।
- পিটার ওবোর্ন: তাঁর নতুন বই, ‘কমপ্লিসিট: ব্রিটেন’স রোল ইন দ্য ডেস্ট্রাকশন অফ গাজা’, সম্প্রতি অর বুকস থেকে প্রকাশিত হয়েছে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

