সম্প্রতি প্রকাশিত অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে দেশের আর্থিক খাতের ভয়াবহ দুরবস্থার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ১৫ বছরে অবৈধ উপায়ে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচারের তথ্য। ঋণ প্রদানের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকিং খাতের চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং অস্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতি দেশের আর্থসামাজিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
বিগত সরকারের আমলে তথাকথিত উন্নয়নের গল্প বললেও প্রকৃত চিত্রটি জনগণের অগোচরেই থেকে যায়। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং আমলাদের সমন্বয়ে অর্থনৈতিক খাতকে লুণ্ঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পরিস্থিতির চাপে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন খাতে লুকায়িত দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হচ্ছে। সেতু, জ্বালানি এবং অবকাঠামো খাতে মেগা প্রকল্পগুলোর পেছনে বিশাল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্রমাবনতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট দেশকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বৈদেশিক বিনিয়োগে মন্দা এবং এর কারণ-
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) অবস্থা হতাশাজনক। ২০২৩ সালে দেশে এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির দেড় শতাংশেরও কম। তুলনামূলকভাবে, সংকটে পড়া শ্রীলংকায় এফডিআই জিডিপির ২০ শতাংশের বেশি ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নেট বিদেশি বিনিয়োগ ৮.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১.৪৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
বিভিন্ন খাতে বিদেশি বিনিয়োগের অবস্থাও অনাকাঙ্ক্ষিত। পোশাক খাতে বিনিয়োগ কমেছে ১৮.১৬ শতাংশ। টেলিকম, চামড়া, কৃষি ও মৎস্য খাতেও বিনিয়োগ কমেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শ্রমিক অসন্তোষ, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বৈদেশিক বিনিয়োগের গুরুত্ব এবং বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ-
বৈদেশিক বিনিয়োগ একটি দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৮০-এর দশকের লাতিন আমেরিকান সংকট থেকে শুরু করে কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বৈদেশিক বিনিয়োগের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এটি একটি দেশের পুঁজি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
তবে বাংলাদেশে বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস পাচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ক্রেডিট রেটিংয়ের অবনতি বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
সম্ভাবনার দিক-
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক এবং ওয়ানস্টপ ডিজিটাল সেবা বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে। কর রেয়াত, ভ্যাট হ্রাস এবং রপ্তানি ভর্তুকির মতো প্রণোদনাগুলো বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে।
বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে তরুণ কর্মশক্তি, বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে। দূতাবাসগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশকে তার বৈদেশিক বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সুশাসন, স্থিতিশীলতা এবং স্বচ্ছতার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটাই হতে পারে আশার নতুন দিগন্ত।
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ, সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী

