“ওকালতিতে সাধারণত যা তুমি ১০ বছরে শিখবে, বিচারক হিসেবে সর্বোচ্চ ২ বছরে তা শিখতে পারবে।”
চট্টগ্রাম বারের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির বাদশা এই কথাটি বলেছিলেন লেখকের কাছে। ২০১২ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জজ কোর্টে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরুর সময় পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা অবস্থায় এই পরামর্শ তার চিন্তায় নতুন দিক যোগ করে। সময় পেরিয়ে গেলেও সেই বক্তব্যের তাৎপর্য আজও প্রাসঙ্গিক বলে তিনি মনে করেন।
লেখক উল্লেখ করেন, শিক্ষানবিশকালসহ প্রায় ছয় বছর তিনি চট্টগ্রাম বারে আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরে ২০১৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে বিচারক হিসেবে যোগ দেন। ফলে আইনজীবী ও বিচারক—উভয় পেশার অভিজ্ঞতা থেকে বিষয়টি মূল্যায়নের সুযোগ তার হয়েছে।
সম্প্রতি রাজশাহী অ্যাডভোকেট বার অ্যাসোসিয়েশন বিচারক নিয়োগে ন্যূনতম পাঁচ বছরের আইনজীবী অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব বিচারব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্য থেকেই এসেছে বলে মনে করা হলেও এর বাস্তবতা, প্রভাব এবং অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা কি যথেষ্ট মানদণ্ড:
শুধু পাঁচ বছর আইন পেশায় থাকা মানেই একজন আইনজীবী দক্ষ বা পরিপক্ব—এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে লেখক মনে করেন।
বর্তমান পেশাগত বাস্তবতায় অনেক তরুণ আইনজীবী শুরুতে পূর্ণাঙ্গ ট্রায়াল বা আদালত কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পান না। অনেকে মানসম্মত মেন্টরশিপ বা অভিজ্ঞ সিনিয়রের দিকনির্দেশনা থেকেও বঞ্চিত হন। পাশাপাশি নবীন আইনজীবীদের পেশাগত জীবন আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নানা চ্যালেঞ্জে ভরপুর থাকে।
আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়া এবং নিয়মিত আদালতে কাজ করে দক্ষতা অর্জন করা—এই দুইটি বিষয় আলাদা বলেও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই কেবল সময়ের হিসাবকে দক্ষতার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ধরা যুক্তিসঙ্গত নয়। দক্ষতা নির্ভর করে কাজের ধরন, শেখার সুযোগ, পেশাগত নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং ধারাবাহিক আত্মোন্নয়নের ওপর—শুধু বছরের হিসাবের ওপর নয়।
বিচারকদের প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা:
অন্যদিকে নবীন বিচারকরা কর্মজীবনের শুরু থেকেই নিয়মিতভাবে বিপুল ও বৈচিত্র্যময় মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তির সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তারা প্রমাণ মূল্যায়ন, আইন ব্যাখ্যা, বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আদালত পরিচালনায় সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রার্থীরা নিয়োগের পর দীর্ঘ ও কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমও তাদের জন্য বিদ্যমান।
এছাড়া সিনিয়র বিচারক, অভিজ্ঞ আইনজীবী এবং আদালতের কর্মীদের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে তাদের পেশাগত দক্ষতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ফলে আইনজীবী ও বিচারক পেশায় অভিজ্ঞতার প্রকৃতি ও পরিসর এক নয় বলেও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। একটিকে অন্যটির সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখা সবসময় যৌক্তিক নাও হতে পারে।
অতীত অভিজ্ঞতার উদাহরণ:
২০১৫-১৬ সালের দিকে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস. কে. সিনহার সময় বিচারক নিয়োগে দুই বছরের আইনজীবী অভিজ্ঞতার শর্ত আরোপ করা হয়েছিল কিন্তু বার কাউন্সিল সময়মতো তালিকাভুক্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে না পারায় অনেক আইন স্নাতক ক্ষতিগ্রস্ত হন।
পরবর্তীতে বাস্তব জটিলতা এবং উদ্ভূত সমস্যার কারণে সেই শর্ত প্রত্যাহার করা হয়। এই অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন করে পাঁচ বছরের শর্ত আরোপের ক্ষেত্রে অতীত পরিস্থিতি গভীরভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে লেখক মত দেন।
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস দীর্ঘদিন ধরে মেধাবী আইন স্নাতকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় কর্মক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। এখন যদি বিচারক হওয়ার আগে বাধ্যতামূলকভাবে পাঁচ বছর আইন পেশায় থাকতে হয়, তাহলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী করপোরেট খাত, বেসরকারি চাকরি বা বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকে যেতে পারেন। এর ফলে বিচার বিভাগ দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যা বিচারব্যবস্থার গুণগত মানেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আইনজীবী পেশার উন্নয়নের প্রয়োজন:
বিচারকদের যোগ্যতা নিয়ে আলোচনা যেমন জরুরি, তেমনি আইনজীবী পেশার সীমাবদ্ধতা নিয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করা হয়েছে। নিয়মিত ও মানসম্মত তালিকাভুক্তি পরীক্ষা, নবীন আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো উন্নতির সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আইনজীবীদের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা নির্ধারণ মূলত বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। এ বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষ মতামত দিতে পারে, যা একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। তবে যেকোনো প্রস্তাব বিবেচনায় নিতে হলে বাস্তবতা, অতীত অভিজ্ঞতা, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ এবং মেধাবী মানবসম্পদ আকর্ষণের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত।
লেখকের মতে, বিচারক নিয়োগে নির্দিষ্ট বছরের অভিজ্ঞতাকে একমাত্র মানদণ্ড না করে মেধা, যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা, বিচারিক মনন ও পেশাগত সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিচারব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন নিহিত রয়েছে বিচারক ও আইনজীবী উভয় পেশার উন্নত প্রশিক্ষণ, উচ্চমানের দক্ষতা এবং পেশাদার মানবসম্পদ তৈরির মধ্যে। কোনো একক পেশার শ্রেষ্ঠত্ব নয়, বরং উভয়ের সম্মিলিত দক্ষতা ও সততার মধ্যেই বিচারব্যবস্থার শক্তি নিহিত।
- মোঃ জুনাইদ; জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সিভিল জজ), সুনামগঞ্জ।

