লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ারে গান্ধী মূর্তির নিচে এক শান্ত শনিবার, পুলিশ ৮৩ বছর বয়সী রেভারেন্ড সু পারফিটকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর ‘অপরাধ’? একটি প্ল্যাকার্ড ধরা, যাতে লেখা ছিল: “আমি গণহত্যার বিরোধিতা করি। আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করি।” তাঁকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল- তিনি শান্ত, মর্যাদাপূর্ণ ও নির্ভীকভাবে হাসছিলেন।
সেদিন তিনি ছিলেন দুই ডজনেরও বেশি গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের একজন- যাদের বেশিরভাগই নারী ও প্রবীণ এবং যাদের হাতে ছিল কেবল ব্যানার ও বিবেক।
তাদের ‘অপরাধ’ ছিল প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করা- যে দলটিকে সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকার সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, যদিও তারা কখনও কাউকে আঘাত করেনি।
তাদের পদ্ধতি? স্প্রে পেইন্ট, লাল রং ছিটানো, ভবনের গেটের সঙ্গে তালাবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ, অস্ত্র কারখানার যন্ত্রপাতি নষ্ট করা, রাস্তা অবরোধ- সবই একটি অহিংস আন্দোলনের অংশ, যার উদ্দেশ্য ছিল গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহে ব্রিটেনের ভূমিকার অবসান ঘটানো।
এই সন্ত্রাসবাদের ঘোষণাটি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার এবং সংসদে এটি ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়- ঠিক সেই দিনে, যেদিন ব্রিটেনে নারীরা ভোটাধিকার অর্জনের বার্ষিকী। বেশিরভাগ নারী এমপি এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন- এরপর অনেকে আবার সাফ্রাগেটদের ‘যুদ্ধপন্থী’ আন্দোলনের ঐতিহ্য উদযাপন করতে হাসিমুখে ছবিও তোলেন কিন্তু সেই ঐতিহ্য ছিল একদমই কোমলতাবর্জিত।
এমিলি প্যাঙ্কহার্স্টের নেতৃত্বাধীন উইমেন্স সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইউনিয়ন বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। তারা ডাকব্যবস্থা ব্যাহত করেছিল, সরকারি ভবন ও রাজনীতিবিদদের বাড়িতে আগুন লাগিয়েছিল, জানালার কাচ ভেঙেছিল, রেলিংয়ে নিজেদের শৃঙ্খলিত করেছিল, চার্চ অব ইংল্যান্ডের ভবনে হামলা করেছিল এবং পুরুষদের একচেটিয়া ক্লাব ধ্বংস করেছিল। তারা রাজনৈতিক সভা ব্যাহত করেছিল, আইন ভেঙেছিল এবং অনশন করেছিল।
বাক-স্বাধীনতার দমন-
প্যালেস্টাইন অ্যাকশন কখনও এমন কিছু করেনি। তবুও আজ তাদের সন্ত্রাসী হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বারন পিটার হেইনের ভাষায়: “ব্রাইজ নর্টনে সামরিক বিমান রঙ করার চেয়ে সাফ্রাগেটদের কর্মকাণ্ড অনেক বেশি কঠোর ছিল।” কিন্তু আজকের নারী এমপিরা সাফ্রাগেটদের প্রশংসা করেন শব্দে, আর ভোট দেন তাদের চেতনা ও কার্যকলাপকে অপরাধী করতে।
এর ব্যতিক্রম গুটিকয়েক- যাদের মধ্যে রয়েছেন গ্রিন পার্টির পিয়ার ব্যারোনেস জেনি জোনস। তিনি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের পক্ষে স্পষ্টভাবে কথা বলেছেন এবং ব্রিটেনের সহযোগিতাকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন। তিনি সেই আদর্শের প্রতিফলন, যা সাফ্রাগেটদের উত্তরাধিকার দাবী করে- নীতিনিষ্ঠ, প্রতিবাদী এবং রাজনৈতিক ভীরুতার ভেতরেও সত্য বলার সাহসী। তিনি দমনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান- না যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গণহত্যা চলতে থাকে।
তিনি সেই ধরনের আইনপ্রণেতা, যাদের কথা এমিলি প্যাঙ্কহার্স্ট বলেছিলেন তাঁর এক বিচার চলাকালে: “আমরা এখানে আইনভঙ্গকারী হিসেবে নয় বরং আইন প্রণয়নকারী হওয়ার চেষ্টায় এসেছি।”
আশ্চর্য নয় যে, যখন কুপারের মতোরা সু পারফিট বা প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হুদা আমোরির মতোদের টার্গেট করেন, তখন জেনি জোনস স্পষ্ট ভাষায় বলেই ফেলেন: এই রাষ্ট্র নীরবতা চায়, প্রতিবাদ নয়। তিনি সংসদে বলেন: “আপনারা যদি চান প্যালেস্টাইন অ্যাকশন বিলুপ্ত হোক, তাহলে ইসরায়েলে অস্ত্র পাঠানো বন্ধ করুন এবং একটি গণহত্যামূলক সরকারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করুন।” এটা কেবল ভণ্ডামি নয়। এটি একটি নৈতিক বিপর্যয়।
সেই একই প্রতিবাদে ছিলেন এক ওয়েলশ নার্স, যিনি কয়েক সপ্তাহ আগে রাফাহ সীমান্তে ছিলেন এবং গাজায় ত্রাণ সরবরাহে সহায়তা করতে চেয়েছিলেন। এখন তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে এসেও প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন- হৃদয়ভাঙা কিন্তু নিরুৎসাহিত নন।
এই হল আন্দোলনের চেহারা: সাধারণ মানুষ, যাদের হৃদয় বিচলিত হয়েছে অসাধারণ এক নিষ্ঠুর বাস্তবতায়- গণহত্যা এবং নিজের সরকারের অংশগ্রহণে।

বিস্তারমান আন্দোলন-
এর এক সপ্তাহ আগে, গ্লাস্টনবেরি মঞ্চে পাঙ্ক ব্যান্ড ‘বব ভিলান’ চিৎকার করে বলেছিল “ডেথ টু দ্য আইডিএফ”- ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। হাজার হাজার দর্শক এ কথা সমস্বরে পুনরাবৃত্তি করে, যা সরাসরি সম্প্রচার হয়েছিল বিবিসিতে।
গোটা উৎসবে ফিলিস্তিন ছিল সবখানে- গানে, পতাকায়, বক্তৃতায়। দর্শকরা উল্লাস করেছিল। কর্তৃপক্ষ ভয় পেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তড়িঘড়ি করে নিন্দা করেন, এমনকি হোয়াইট হাউসও প্রতিক্রিয়া জানায়। কিন্তু যেসব অপরাধ এই প্রতিবাদকে জন্ম দিয়েছে- হাসপাতালে বোমা হামলা, দুর্ভিক্ষ, ধ্বংসস্তূপের নিচে ছিন্নভিন্ন দেহ- তা নিয়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রনেতারা নীরব।
দুদিন পর, লন্ডনের হাই কোর্ট রায় দেয়- যুক্তরাজ্য থেকে এফ-৩৫ ফাইটার জেটের যন্ত্রাংশ রপ্তানি ‘আইনসম্মত’। ঠিক সেই জেট, যা গাজা ধ্বংসে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বার্তা ছিল পরিষ্কার: গণহত্যার বিরোধিতা করা অপরাধ, গণহত্যাকারীকে অস্ত্র দেওয়া আইনসঙ্গত।
তবু প্রতিবাদ থেমে নেই। পুলিশি ধরপাকড়, নিষিদ্ধ ঘোষণার আদেশ, মিডিয়ার নীরবতা- সব উপেক্ষা করে, এই আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ছে।
প্যালেস্টাইনি চিকিৎসকদের ওপর একটি বহুদিন ধামাচাপা দেওয়া বিবিসি প্রামাণ্যচিত্র, যেটি সম্প্রচারের আগেই বন্ধ করা হয়েছিল, অবশেষে সম্প্রচার করে চ্যানেল ৪। এতে দেখা যায়, কীভাবে পরিকল্পিতভাবে চিকিৎসক ও হাসপাতালকে টার্গেট করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ধারাভাষ্যকার গ্যারি লিনেকার মন্তব্য করেন: “বিবিসির লজ্জিত হওয়া উচিত।”
এদিকে ইসরায়েলের নিজের পত্রিকা ‘হারেতজ’ প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি সেনাদের সাক্ষ্য- যেখানে বলা হয়েছে, তারা না খেয়ে থাকা ফিলিস্তিনিদের- যারা খাবার নেওয়ার জন্য জড়ো হয়েছিল- তাদের গুলি করার নির্দেশ পেয়েছিল। কোনো যোদ্ধা নয়- শিশু, বাবা-মা, সাধারণ মানুষ।
গাজায় মৃতের সংখ্যা এখন ৫৬ হাজার ছাড়িয়েছে। আর ব্রিটেন গ্রেপ্তার করছে তাদের, যারা এটা থামাতে চায়।
তবে গতি পাল্টে যাচ্ছে। জনমত শুধু পাল্টাচ্ছে না, ধসে পড়ছে পশ্চিমা নেতৃত্বের চারপাশে। যুক্তরাজ্যে ইসরায়েলের প্রতি ‘নেট অনুকূলতা’ এখন -৪৬। প্রায় অর্ধেক ব্রিটিশ নাগরিক মনে করেন, ইসরায়েল গণহত্যা করছে। অধিকাংশই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর গ্রেপ্তার সমর্থন করেন। ইউরোপজুড়েও চিত্র একই- জার্মানিতে -৪৪, ফ্রান্সে -৪৮, ডেনমার্কে -৫৪, ইতালিতে -৫২ এবং স্পেনে-৫৫।
যুক্তরাষ্ট্রেও দৃশ্যপট বদলাচ্ছে। পিউর মার্চ মাসের এক জরিপে দেখা যায়, ৫৩ শতাংশ আমেরিকান এখন ইসরায়েলকে নেতিবাচকভাবে দেখেন- তিন বছরের ব্যবধানে ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি। রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জনে ৪ জন আমেরিকান মনে করেন- ইসরায়েলের সমস্যাগুলো “আমাদের ব্যাপার না”।
অপ্রতিরোধ্য পরিবর্তন-
ফিলিস্তিন মুক্তির লড়াই এখন শুধু গাজা বা পশ্চিম তীরে নয়। এটি এখন লড়াই পশ্চিমা বিশ্বেও- একদিকে জেগে ওঠা জনতা, অন্যদিকে সেগুলোকে দমন করতে চাওয়া ক্ষমতাধর ব্যবস্থা।
ইসরায়েলি প্রকল্প একটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়- এটি মূলত একটি পশ্চিমা ঔপনিবেশিক উদ্যোগ। এবং গত দুই বছর দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে তার অস্তিত্ব পশ্চিমা সরকারগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল- বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের।
এই জন্যই আজকের যুদ্ধভূমি লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন ও ওয়াশিংটনের রাস্তায়- সংসদ, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম এবং আদালতের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে। এটি একটি নৈতিক কর্তৃত্বের লড়াই- ক্ষমতা ও সত্যের সংঘর্ষ। এর পরিণতি নির্ধারণ করবে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের আরেকটি জিনিস শেখায়: যে, দাসত্ব বিলোপ, নারীদের ভোটাধিকার, বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন- এসব জয় এসেছিল, কারণ জনগণ নেতৃত্বকে আলো দেখাতে বাধ্য করেছিল নয় বরং তাদের গরম অনুভব করিয়েছিল। সেই চাপই অবশেষে খোলা দরজা ছিনিয়ে নিয়েছিল। ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও তাই হবে। জনগণ নেতাদের চেয়ে বহু এগিয়ে আছে এবং শিগগির বা দেরিতে- নেতাদের অনুসরণ করতেই হবে।
জনমত একসময় ক্ষমতাধরদের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেবে। সময় লাগবে, ধীরে আসবে। কিন্তু পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে এবং এটি আর থামানো যাবে না। ইতিহাস দেখছে। এবং একদিন ফিলিস্তিন মুক্ত হবে- হবেই। স্মরণে থাকবে না সেইসব নাম, যারা ইসরায়েলকে বোমা সরবরাহ করেছে। স্মরণে থাকবে তাদের, যাদের চুপ করানো হয়েছিল। যারা গ্রেপ্তার হয়েছিল। যারা মিছিল করেছিল। যারা মানুষ বাঁচিয়েছিল।
যেমন রেভারেন্ড সু পারফিট, যিনি হাসছিলেন গ্রেপ্তার হওয়ার সময়। যেমন ব্যারোনেস জেনি জোনস, যিনি ন্যায়বিচারকে কখনও ছেড়ে যাননি। আমরা মনে রাখব কারা ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে- আর কারা ছিল এর পথে।
- সৌমায়া ঘানুশি; প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সূত্র: মিডল ইস্ট আই।

