মে মাসের শেষ দিকে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ তখনো বেশ ঘন। সেই বরফ ভেদ করে মৌসুমের প্রথম যাত্রায় রওনা দেয় বিশালাকার এলএনজি ট্যাংকার ক্রিস্টোফ দ্য মার্জেরি। রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলের একটি বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে জাহাজটি এগিয়ে যায় নর্দার্ন সি রুট বা উত্তর সাগরপথ ধরে।
এই বন্দরটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রাশিয়ার আর্কটিক এলএনজি-২ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। জাহাজটি বেশির ভাগ পথই একটি বরফভাঙা জাহাজের সহায়তায় পাড়ি দেয়। কয়েক হাজার মাইল দীর্ঘ আর্কটিক জলপথ ও বেরিং সাগর অতিক্রম করে প্রায় দুই সপ্তাহ পর সেটি পৌঁছায় রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলের কামচাটকা উপদ্বীপে।
সেখানে একটি নির্জন উপসাগরে গিয়ে জাহাজটি ভিড়ে। জায়গাটি একসময় সোভিয়েত সামরিক বসতি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ক্রিস্টোফ দ্য মার্জেরি একটি বিশাল ভাসমান সংরক্ষণ ইউনিটের পাশে অবস্থান নেয়। জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের সময় সাধারণত এমন বিন্যাস দেখা যায়।
তথ্য বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ এলএনজি ওই ভাসমান ইউনিটে খালাস করা হয়। এরপর জাহাজটি আবার আর্কটিকের দিকে ফিরে যায়।
এই ঘটনাই শুধু একটি জাহাজের যাত্রার গল্প নয়। বরং এটি দেখাচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম ও বরফঢাকা অঞ্চলে কীভাবে নতুন এক বাণিজ্যিক পথ তৈরি হচ্ছে—আর সেই পথ কীভাবে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলছে।

চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে উত্তর সাগরপথ
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন নর্দার্ন সি রুট বছরের বেশির ভাগ সময়ই বরফে ঢাকা থাকে। গ্রীষ্মের অল্প কয়েকটি মাসেই বরফভাঙা জাহাজের সহায়তায় এ পথে চলাচল তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের চিত্রও বদলে গেছে। নরওয়ের সেন্টার ফর হাই নর্থ লজিস্টিকসের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই পথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান বিদেশি অংশীদার এখন চীন।
এই বাণিজ্য একদিকে রাশিয়ার যুদ্ধকালীন অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে, অন্যদিকে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করছে। একই সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে চীনা জাহাজ চলাচলও বাড়ছে। এ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগও বাড়ছে—কারণ তাদের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক উপস্থিতি ভবিষ্যতে সামরিক কাজে রূপ নিতে পারে।
ক্রিস্টোফ দ্য মার্জেরি কামচাটকা ছেড়ে যাওয়ার পর একই উপসাগরে পৌঁছে আরেকটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত ট্যাংকার আর্কটিক মুলান। কয়েক দিন সেখানে অবস্থানের পর সেটিকেও একই ভাসমান সংরক্ষণ ইউনিটের পাশে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে জাহাজটি প্রায় এক দিন তার অবস্থান শনাক্তকারী সংকেত বন্ধ রাখে।
পরদিন আবার সংকেত চালু করে জাহাজটি চীনের বেইহাই বন্দরের দিকে যাত্রা শুরু করে। উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কয়েক দিন পর সেটি বেইহাইয়ের একটি এলএনজি টার্মিনালে অবস্থান করছে। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ওই টার্মিনালটি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ এলএনজি গ্রহণের জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছে।
জুনে যে পণ্য স্থানান্তর হয়েছিল, জুলাইয়েও একই দুই জাহাজের মাধ্যমে তা পুনরাবৃত্তি হয়। ফলে উত্তর সাগরপথ রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জ্বালানি চীনে পৌঁছানোর একটি দ্রুত বিকল্প পথ হিসেবে উঠে এসেছে।
যুদ্ধের প্রভাবেও বাড়ছে গুরুত্ব
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ আটকে পড়ছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চীন ও রাশিয়া উত্তর সাগরপথকে আরও বেশি কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চীনের জন্য এর আরেকটি গুরুত্ব রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিং নিজেকে ‘নিকট-আর্কটিক রাষ্ট্র’ হিসেবে তুলে ধরে এই অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে চেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলতে থাকলে আগামী দশকগুলোতে এই পথে নৌযাত্রার মৌসুম আরও দীর্ঘ হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন নতুন পথও খুলে যেতে পারে।
জাপানের সরকারি সংস্থা জাপান অর্গানাইজেশন ফর মেটালস অ্যান্ড এনার্জি সিকিউরিটির জ্বালানি বিভাগের মহাপরিচালক দাইসুকে হারাদা বলেন, আর্কটিক এখন চীনের সামনে বিশাল নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
রাশিয়া ও চীনের পুরোনো স্বপ্ন
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বহুদিন ধরেই রাশিয়ার আর্কটিক উপকূল ঘেঁষে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মাইল দীর্ঘ এই নৌপথকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। তার লক্ষ্য—রুশ বন্দর, তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং উত্তরাঞ্চলকে বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করা।
সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্নের কথা উল্লেখ করে পুতিন দাবি করেছেন, উত্তর সাগরপথই সবচেয়ে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর পথ।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েরও আর্কটিক নিয়ে বড় পরিকল্পনা রয়েছে। ২০১৮ সালে তিনি ‘পোলার সিল্ক রোড’ বা মেরু সিল্ক রোডের ধারণা সামনে আনেন। এটি চীনের বহুল আলোচিত বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আর্কটিক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হয়।
তবে আর্কটিকের বন্দর ও অবকাঠামোয় চীনের প্রত্যাশিত বড় বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত হয়নি। প্রচণ্ড খরচ, কঠিন আবহাওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ পুতিনের পরিকল্পনাকেও কঠিন করে তুলেছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলোর রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চল থেকে সরে যাওয়া পরিস্থিতি আরও বদলে দেয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাহাজ ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোও অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে যায়। তারপরও এই পরিস্থিতিকে বেইজিংয়ের জন্য একটি ‘সুযোগের জানালা’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ রাশিয়ার এই নৌপথ উন্নয়নে চীন এখন অন্যতম প্রধান অংশীদার।

নিয়মিত বাণিজ্যিক নৌপথের পথে চীন
এখন সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চীনা বেসরকারি জাহাজ কোম্পানিগুলোও এগিয়ে আসছে।
সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত ও চীনা পরিচালিত সি লিজেন্ড এ সপ্তাহান্তে চীন থেকে ইউরোপের মধ্যে মৌসুমি নিয়মিত কনটেইনার পরিবহন চালু করতে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই পথে চীন-ইউরোপ যাত্রায় প্রায় ২০ দিন লাগবে—সুয়েজ খাল দিয়ে প্রচলিত পথে যে সময় লাগে, তার প্রায় অর্ধেক।
চীনভিত্তিক আরেকটি প্রতিষ্ঠান নিউ নিউ শিপিং গত মাসে চীনের তিয়ানজিন থেকে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় আর্কটিক বন্দর মুরমানস্ক পর্যন্ত নতুন নৌসেবা চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে থেকেই চীনা শিল্পপণ্য রাশিয়ায় এবং রুশ কাঁচামাল চীনে পরিবহন করছে।
চীনের জাহাজ মালিকদের সংগঠনের প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে অন্তত ছয়টি চীনা জাহাজ কোম্পানি এই পথে ৫০টির বেশি যাত্রা করতে পারে। কনটেইনার, বাল্ক ও বিভিন্ন ধরনের পণ্যবাহী জাহাজ এতে অংশ নেবে। এর বেশির ভাগ যাত্রাই হবে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে।
নরওয়ের নর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হাই নর্থ লজিস্টিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিয়েল স্টকভিক বলেন, বর্তমানে চীন ও রাশিয়াই মূলত এই নৌপথ ব্যবহার করছে এবং তারা এটিকে নিজেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার অংশ হিসেবেই দেখছে।
তবে সুয়েজ খালের মতো বড় আন্তর্জাতিক নৌপথের তুলনায় উত্তর সাগরপথের বাণিজ্য এখনো খুবই ছোট। এই পথে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসই প্রধান পণ্য, যার বড় অংশই চীনের দিকে যাচ্ছে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে রাশিয়া থেকে চীনে এলএনজি আমদানি প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিষেধাজ্ঞার মাঝেও চীনের ভূমিকা
গত বছর উত্তর সাগরপথ দিয়ে সরাসরি চীনের উদ্দেশে সম্পূর্ণ যাত্রা করা আটটি তেলবাহী জাহাজই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ছিল। এসব জাহাজ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
একই সময়ে পুরোনো জাহাজ নিয়ে গড়ে ওঠা তথাকথিত ছায়া বহরের উপস্থিতিও বাড়ছে। অবস্থান গোপন করা বা শনাক্তকরণ এড়ানোর মতো নানা কৌশল ব্যবহার করা এসব জাহাজ আর্কটিক অঞ্চলে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিশ্লেষকেরা আরও বলছেন, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা আর্কটিক এলএনজি-২ প্রকল্পে প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামও নীরবে সরবরাহ করেছে।
এই প্রকল্পে আগে চীনের দুটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ফ্রান্সের টোটালএনার্জিস এবং একটি জাপানি জোট বিনিয়োগ করেছিল। নিষেধাজ্ঞার পর বিদেশি অংশীদারদের কেউ বিনিয়োগ স্থগিত করেছে, কেউবা সরে গেছে।
জাপানের হারাদার মতে, আর্কটিক এলএনজি-২ এবং রাশিয়ার ইয়ামাল এলএনজি প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দিচ্ছে।

পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ
চীন-রাশিয়ার এই ঘনিষ্ঠতা পশ্চিমা দেশগুলোর নজর এড়ায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে গ্রিনল্যান্ডের আশপাশের উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে রুশ ও চীনা জাহাজের সম্ভাব্য উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ফিনল্যান্ডের সঙ্গে জাহাজ নির্মাণের চুক্তি করেছে, যার লক্ষ্য মার্কিন বরফভাঙা জাহাজের বহর বাড়ানো।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস সতর্ক করেছেন, চীন আর্কটিকের নৌপথ ও সরবরাহব্যবস্থাকে ভবিষ্যতে কৌশলগত বা সামরিক কাজে ব্যবহার করতে পারে। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুট্টেও বলেছেন, রাশিয়া ও চীন যাতে আর্কটিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান প্রবেশাধিকার না পায়, সে বিষয়ে জোটকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
২০২৪ সালে আলাস্কার কাছে চীন ও রাশিয়ার যৌথ বোমারু বিমান মহড়া এবং আর্কটিক জলসীমায় যৌথ উপকূলরক্ষী অভিযানও পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
চীনের গবেষণা জাহাজের আর্কটিক অভিযান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, গবেষণার নামে সংগৃহীত তথ্য ভবিষ্যতে চীনের সামরিক বাহিনীও কাজে লাগাতে পারে। গত বছরের একটি অভিযানে চীনা গবেষণা জাহাজ আর্কটিকের বরফের নিচে ডুবোযানও পাঠিয়েছিল।
তবে বেইজিং এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনের দাবি, তাদের আর্কটিক কার্যক্রম শান্তি, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তারা নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছে এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
অন্যদিকে, মস্কোও আর্কটিকে চীনের সামরিক উপস্থিতি বাড়ুক—এমনটা খুব একটা চায় না। রাশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো চীন যেন রুশ জ্বালানি কেনে এবং উত্তর সাগরপথের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ায়।
‘পরবর্তী ধাপ’ কোন পথে?
গত বছর চীনের নিংবো বন্দরে বড় এক বাণিজ্যিক পরীক্ষামূলক যাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে ব্রিটেনের উদ্দেশে রওনা হয় একটি কনটেইনার জাহাজ। প্রায় ২০ দিনের সেই যাত্রাই এখন নিয়মিত মৌসুমি নৌসেবায় রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সি লিজেন্ডের এই নৌসেবায় চীনে তৈরি বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি, লিথিয়াম ব্যাটারি এবং সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ইউরোপে পাঠানো হবে। চলতি মৌসুমে ইউরোপের উদ্দেশে এমন আটটি যাত্রার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাশিয়ার পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের প্রধান আলেক্সেই লিখাচেভ এই নিয়মিত মৌসুমি নৌসেবাকে উত্তর সাগরপথ উন্নয়নের ‘পরবর্তী ধাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রোসাটমই এই নৌপথ পরিচালনা করে।
চীনের বড় রাষ্ট্রীয় জাহাজ কোম্পানি কোসকোসহ অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এই পথ থেকে সরে গিয়েছিল। এরপর সি লিজেন্ড ও নিউ নিউ শিপিংয়ের মতো নতুন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামনে আসে।
চীন-রাশিয়া সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ উইশনিকের মতে, নতুন বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে আর্কটিকে চীনের প্রবেশের পেছনে সতর্কতার বিষয়টিও থাকতে পারে। কারণ উত্তর সাগরপথ ব্যবহার করা নিজে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন না করলেও নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের ঝুঁকি রয়েছে।
নিউ নিউ শিপিং ২০২৩ সাল থেকে এই পথে চলাচল করছে। তবে তাদের একটি জাহাজ, নিউ নিউ পোলার বিয়ার, ২০২৩ সালে বাল্টিক সাগরে সাবমেরিন কেবল ও একটি পাইপলাইনের ক্ষতির ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় জাহাজটির ক্যাপ্টেন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

আর্কটিকের ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল?
উত্তর সাগরপথ নিয়ে বড় প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে—এটি কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে সুয়েজ খালের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে?
পথটি ব্যবহার করতে রাশিয়ার রোসাটমের অধীন একটি সংস্থায় নিবন্ধন করতে হয়। নৌযাত্রার মৌসুমও ছোট। আবহাওয়া দ্রুত বদলে যেতে পারে এবং গ্রীষ্মকালেও জাহাজ বরফে আটকে গিয়ে সহায়তা চাইতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।
নরওয়ের স্টকভিকের মতে, নিয়মিত বাণিজ্যিক নৌসেবা পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উত্তর সাগরপথে এমন অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে, যা যাত্রায় বিলম্ব ঘটাতে পারে।
তেল ছড়িয়ে পড়া বা দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বড়। কঠিন আর্কটিক পরিবেশে এ ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন। একই সঙ্গে বাড়তি জাহাজ চলাচল পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কায় এই পথ এড়িয়ে চলার অঙ্গীকার করেছে।
তারপরও বরফ গলার বাস্তবতা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। আগামী কয়েক দশকে বরফ কমে গেলে নৌযাত্রার মৌসুম দীর্ঘ হতে পারে। রাশিয়ার উপকূল এড়িয়ে সম্ভাব্য নতুন আন্তমেরু নৌপথও তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে চীন থেকে উত্তর আটলান্টিকে পৌঁছানোর আরও দ্রুত পথ তৈরি হবে।
দক্ষিণ কোরিয়াও ইতিমধ্যে এই সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়েছে। দেশটির জাহাজ কোম্পানি প্যানস্টার ২২ আগস্ট বুসান থেকে উত্তর সাগরপথ হয়ে ইউরোপে পরীক্ষামূলক যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংও উত্তর সাগরপথের যুগের সূচনায় দেশটি নেতৃত্ব দিতে চায় বলে জানিয়েছেন।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এই পথে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে। কারণ তারা ইতিমধ্যে রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ঝাও লংয়ের মতে, ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই অভিজ্ঞতাই চীনা কোম্পানিগুলোকে বাড়তি সুবিধা দেবে।
তখন রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগের আরেকটি বড় ঢেউ আসতে পারে।
অর্থাৎ উত্তর সাগরপথ এখনো সুয়েজ খালের বিকল্প হয়ে ওঠেনি। বরফ, খরচ, ঝুঁকি ও মৌসুমি সীমাবদ্ধতা এর বড় বাধা। কিন্তু যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চীন-রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা মিলিয়ে পৃথিবীর উত্তর প্রান্তের এই বরফঢাকা নৌপথ ধীরে ধীরে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে।

