গত ২১ মাস ধরে গাজা গণহত্যার শিকার হয়ে আসছে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের হাতে। এই সময়টায় আমি গভীর দুঃখ, হতাশা ও দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দেখেছি কীভাবে একটি মানবিক সংকট ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। হাজারো শিশু বোমা হামলা, আগুনে পুড়ে যাওয়া, শার্পনেল আঘাত, অনাহার কিংবা বিলম্বিত চিকিৎসার কারণে ভয়াবহ আঘাতে ভুগছে। হাজার হাজার শিশু দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত, যেগুলোর চিকিৎসা পৃথিবীর অনেক দেশেই সহজলভ্য কিন্তু তারা তা পাচ্ছে না।
তাদের একমাত্র আশার জায়গা সীমান্তের ওপারে- কিন্তু খুব কমই সেখানে যেতে পারছে।
এই কারণেই আমি প্রায় দুই বছর ধরে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা, চিকিৎসক, আইনজীবী এবং সব রাজনৈতিক দলের সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে যুক্তরাজ্যকে শুধুমাত্র কথায় নয়, কাজে এগিয়ে আসার দাবি জানিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। অবশেষে, গত এপ্রিল মাসে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখেছি।
দুই সাহসী শিশু লন্ডনে এসেছে গাজা থেকে- ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠার পর এই প্রথমবারের মতো কোনো শিশু চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে সরাসরি আসতে পেরেছে। একজনের দৃষ্টিশক্তি রক্ষার জন্য জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন ছিল। আরেকজনের ছিল এক আজীবন অন্ত্রের সমস্যা, যা স্থানীয় চিকিৎসকরা চিকিৎসা করতে পারছিলেন না।
এই যাত্রা সম্ভব হয়েছে এনজিও, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনজীবী ও কর্মীদের একটি বিস্ময়কর নেটওয়ার্কের সহযোগিতায়।
এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত- কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, এখানেই থেমে গেলে চলবে না। এই দুই শিশুর যুক্তরাজ্যে আগমন একটি জাতীয় কর্মসূচির সূচনা হিসেবে দেখতে হবে, কোনো প্রচারণার সমাপ্তি হিসেবে নয়।
সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন-
সশস্ত্র সংঘাতের সময় শিশুদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের ইতিহাস প্রশংসনীয়। যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে সে সক্ষম, ইচ্ছাশক্তি রয়েছে, অবকাঠামো আছে এবং—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—চিকিৎসকদের ও জনসাধারণের সমর্থনও রয়েছে।
যেটা এখনও দেখা যায়নি, তা হলো একটি সমন্বিত ও বিস্তৃত উদ্যোগ।
গত অক্টোবরে ইউনিসেফ জানিয়েছিল, গাজায় প্রায় ২,৫০০ শিশুর জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন, যেগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত ওই অঞ্চল থেকে বের না হলে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু রাফাহ সীমান্ত বন্ধ থাকার কারণে প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ২২টি শিশুই চিকিৎসার জন্য বের হতে পারছিল। এই হারে চিকিৎসা দিতে ৭ বছরের বেশি সময় লাগবে, শুধুমাত্র যাদের শনাক্ত করা হয়েছে তাদেরই।
এখন প্রায় এক বছর পার হয়ে গেছে, পরিস্থিতি এখন আরো ভয়াবহ বলেই ধারণা করা হচ্ছে- কিন্তু এই শিশুরা আর সময় পাবে না। অনেকেই সহ্যসীমার বাইরে চলে যাওয়া ক্ষত, কেটে ফেলা অঙ্গ, পুড়ে যাওয়া শরীর, ও অ্যান্টিবায়োটিকবিহীন সংক্রমণের মধ্যে পড়ে আছে। কারও শরীরে কোনো ব্যথানাশক না দিয়েই অস্ত্রোপচার চলছে। আবার এমন কিছু রোগ রয়েছে, যেগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও নিরাময়যোগ্য কিন্তু গাজায় এখন সেগুলো মৃত্যুর কারণ।
‘চাইল্ড ওয়াই’ এবং যমজ ‘এস ও এস’-এর গল্প-
‘চিলড্রেন নট নাম্বারস’ নামের একটি এনজিও দুটি শিশুর বিষয়ে সহায়তা করছে।
‘চাইল্ড ওয়াই’ হলো দুই বছর বয়সী এক শিশু। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে সে এক ভয়াবহ এবং দ্রুত অবনতি ঘটানো রোগে ভুগছে। মুখের একটি ক্ষত থেকে রক্তপাত শুরু হয়, পরে সিটি স্ক্যানে দেখা যায় মুখ, চোয়াল ও খুলির চারপাশে রক্তনালির এক আগ্রাসী বৃদ্ধি ছড়িয়ে পড়ছে।
চিকিৎসায় কোনো সাড়া মিলছে না। সে মারাত্মক ব্যথায় ভুগছে এবং রক্তপাত থামছে না। এখন সে নিয়মিত রক্ত নিতে বাধ্য, আর তীব্র রক্তাল্পতায় ভুগছে। পরিবারের আতঙ্ক, হঠাৎ যে কোনো সময় এক ধরণের প্রাণঘাতী রক্তপাত তার জীবন কেড়ে নিতে পারে।
সাম্প্রতিক স্ক্যানে ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি ম্যালিগন্যান্ট টিউমার হতে পারে। কিন্তু গাজায় বায়োপসি কিংবা চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। শিশুটিকে বাঁচাতে এখনো একটা ক্ষুদ্র সুযোগ রয়েছে- কিন্তু সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। জরুরি ভিত্তিতে তাকে বিদেশের কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার, নইলে তার মৃত্যু অনিবার্য।
চার বছর বয়সী যমজ এস ও এস ভুগছে ‘সিস্টিনোসিস’ নামে একটি বিরল, আজীবন চলমান জিনঘটিত রোগে। এতে অ্যামিনো অ্যাসিড ‘সিস্টিন’ কোষে জমা হয়ে ধীরে ধীরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট করে দেয়। এর প্রাথমিক চিকিৎসা হলো নিয়মিত ‘সিস্টিয়ামিন’ নামের ওষুধ গ্রহণ এবং সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ।
কিন্তু অবরোধ ও বোমাবর্ষণের কারণে এই ওষুধ এখন গাজায় আর নেই। ফলে যমজদের শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হচ্ছে। ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্যের গুরুতর বিপর্যয়ে তারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের কিডনিতে এরইমধ্যে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে, যা আরও চিকিৎসা দাবি করে।
অপর্যাপ্ত পুষ্টিও তাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অথচ এই রোগ সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব- যদি তারা চিকিৎসার সঠিক সুযোগ পেত। শিশু দুটি যদি চিকিৎসা, পুষ্টি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় শিশু বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থাপনার সুযোগ না পায়, তারা বাঁচবে না।
জীবন বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপ-
এই শিশুরা দান নয়, অধিকার চায়। যুক্তরাজ্য হস্তক্ষেপ করলে কী হতে পারে? সবকিছুই বদলে যেতে পারে। তারা পেতে পারে সঠিক রোগ নির্ণয়, অস্ত্রোপচার, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ কিংবা নিরাময়। এর মানে হতে পারে- তারা বেঁচে থাকবে।
যুক্তরাজ্যের রয়েছে হাসপাতাল, চিকিৎসক এবং—সবচেয়ে বড় কথা—নৈতিক দায়িত্ব, এই জীবনরক্ষাকারী সুযোগটি দেওয়ার। একটি সিদ্ধান্তই হতে পারে জীবন আর মৃত্যুর পার্থক্য। এখন প্রশ্ন হলো: আমরা কি সেই সিদ্ধান্ত নেব?
আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি, ইউরোপের অন্যান্য দেশ যেমন ইতালি ও ফ্রান্স ইতোমধ্যে বিশেষ চিকিৎসা কর্মসূচি চালু করেছে। গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে, ফলে এই চিকিৎসাগুলো স্থানীয়ভাবে সম্ভব নয়। এখন সময় একটি বড় আকারের জবাবদানের- এটি নৈতিক দায়ও।
সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপ এবং মন্ত্রীদের সমর্থনকে আমি স্বাগত জানাই কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই উদ্যোগ এখনো মারাত্মকভাবে অপর্যাপ্ত।
প্রথম দুই শিশুর চিকিৎসা সম্পূর্ণ বেসরকারি অনুদান এবং দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়েছে। এনএইচএস থেকে এক পয়সাও আসেনি। ভিসা দেওয়া হয়েছে বিদ্যমান বিশেষ ক্ষমতার মাধ্যমে- কোনো সুসংগঠিত বা স্থায়ী সরকারি কর্মসূচি নেই।
এখনো কোনো স্পষ্ট প্রক্রিয়া নেই- যার মাধ্যমে এনজিও কিংবা পরিবারগুলো নিয়মিতভাবে যুক্তরাজ্যে চিকিৎসার আবেদন করতে পারে।
আমরা আগেও পেরেছি- ইউক্রেনের শিশুদের জন্য, সিরীয় শরণার্থীদের জন্য, যুদ্ধবিধ্বস্ত অনাথ শিশুদের জন্য। তাহলে গাজার শিশুদের জন্য নয় কেন?
এটা রাজনীতির প্রশ্ন নয়। এটা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। একজন শিশুকে যদি বাঁচানো যায়, তাহলে বাঁচাতেই হবে।
দেশজুড়ে মানুষ কথা বলছে। চিকিৎসকরা স্বেচ্ছাসেবায় এগিয়ে আসছেন। দাতব্য সংস্থাগুলো উদ্যোগ নিচ্ছে। স্থানীয় মানুষ তহবিল সংগ্রহ করছে। পার্লামেন্ট সদস্যরা যৌথভাবে কাজ করছেন যেন এই উদ্যোগ দুজন শিশুতে শেষ না হয়ে যায়।
আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই- যা এই দেশ সবসময় করেছে, সংকটে সহানুভূতি দেখাক, উদাহরণ সৃষ্টি করুক, এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিক। আমাদের এখনই কাজ করতে হবে। এই শিশুরা আর অপেক্ষা করতে পারবে না। তারা এখন আমাদের প্রয়োজন।
প্রথম সফল চিকিৎসা পরিবহন আমাদের আশা দেখিয়েছে। কিন্তু এখন এই আশাকে পরিণত করতে হবে একটি টেকসই কর্মসূচিতে। সরকারকে এই প্রাথমিক উদ্যোগকে রূপ দিতে হবে একটি স্থায়ী, মানবিক এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত চিকিৎসা কর্মসূচিতে।
আমরা জানি, এটি করা সম্ভব। এখন দরকার, এটি ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করা। কারণ, গাজার প্রতিটি শিশু যে জরুরি চিকিৎসার অপেক্ষায়, তাদেরও বেঁচে থাকার সমান অধিকার আছে।
- লেখক: লিভারপুল রিভারসাইড নির্বাচনী এলাকায় জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠা কিম জনসন ২০১৯ সালে শহরের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ এমপি হিসেবে নির্বাচিত হন। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

