আধুনিক নগরায়ণের প্রধান শর্ত হলো সুপরিকল্পিত অবকাঠামো। কিন্তু আমাদের শহরের চিত্র ঠিক উল্টো। বড় বড় বাণিজ্যিক ভবন এবং মার্কেট নির্মিত হচ্ছে ঝকঝকে নকশায়, কিন্তু সেখানে আসা ক্রেতা বা দর্শনার্থীদের গাড়ি রাখার জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না।
ঢাকা বা বড় শহরগুলোর প্রধান সড়কের পাশে তাকালে দেখা যায়, বহুতল ভবনগুলো থেকে মালিকরা প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা ভাড়া ও অগ্রিম টাকা আদায় করছেন। অথচ সেই ভবনের প্রয়োজনীয় পার্কিং স্পেসটি হয় গুদাম হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, না হয় সেখানে দোকান বসিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করা হচ্ছে। এর ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ রাস্তার ওপর গাড়ি পার্কিং করছে, যা সৃষ্টি করছে অসহনীয় যানজট।
পার্কিং স্পেসের বাণিজ্যিক অপব্যবহার
ভবন নির্মাণ বিধিমালা (BNBC) অনুযায়ী প্রতিটি ভবনের আয়তন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা পার্কিংয়ের জন্য রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক প্রভাবশালী মালিক রাজউক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে পার্কিং দেখিয়ে নকশা পাস করিয়ে নিলেও, ভবন নির্মাণের পর তা বদলে ফেলেন। আন্ডারগ্রাউন্ডের সেই ফাঁকা জায়গাটি তখন আর গাড়ি রাখার কাজে ব্যবহৃত হয় না। সেটি হয়ে যায় বড় কোনো কোম্পানির গুদাম কিংবা ছোট ছোট দোকানের মার্কেট।
মালিকরা দ্বিগুণ লাভের আশায় এই কাজ করছেন—একদিকে মূল ভবনের ভাড়া, অন্যদিকে পার্কিং স্পেসের বাণিজ্য। এই লোভের বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যাদের চলাচলের রাস্তাটি দিন দিন ছোট হয়ে আসছে।
|
উচ্চ ভাড়া ও মালিকদের চরম উদাসীনতা
মার্কেট মালিকরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা অগ্রিম (সেলামি, সিকিউরিটি বা এডভান্স) গ্রহণ করেন। একেকটি ছোট দোকানের মাসিক ভাড়া যেখানে লক্ষাধিক টাকা, সেখানে সেই মার্কেটের কোনো সুনির্দিষ্ট পার্কিং সুবিধা না থাকাটা কেবল চরম অব্যবস্থাপনা নয়, বরং একটি অপরাধ।
একজন ক্রেতা যখন গাড়ি নিয়ে ওই মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসেন, তখন তাকে রাস্তার ওপর গাড়ি রেখে ঝুঁকি নিতে হয়। মালিকরা কেবল তাদের পকেট ভরার চিন্তায় মগ্ন থাকেন, কিন্তু তাদের ব্যবসার কারণে পাবলিক রাস্তায় যে জনদুর্ভোগ তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়ে তাদের বিন্দুমাত্র দায়বদ্ধতা দেখা যায় না। তারা সুবিধা ভোগ করছেন ব্যক্তিগতভাবে, কিন্তু তার নেতিবাচক প্রভাব ফেলছেন পুরো সমাজের ওপর।
ট্রাফিক পুলিশের প্রতি সুপারিশ: দায়বদ্ধতার পরিবর্তন
এতদিন পর্যন্ত ট্রাফিক পুলিশ কেবল গাড়ির চালক বা মালিককে মামলা দিয়ে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এখন সময় এসেছে দায়বদ্ধতার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার।
ট্রাফিক পুলিশের প্রতি আমাদের জোরালো সুপারিশ হলো—যে ভবনের সামনে অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যানজট সৃষ্টি হবে, তার জন্য সরাসরি ওই ভবন বা মার্কেট মালিককে দায়ী করতে হবে। রাস্তার ওপর গাড়ি থাকার মানে হলো ওই ভবনের ব্যবস্থাপনা ত্রুটিপূর্ণ। গাড়ি জব্দ করার পাশাপাশি যদি ভবনের মালিককে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয়, তবে তারা স্বউদ্যোগে তাদের আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে দোকান বা গুদাম সরিয়ে পার্কিংয়ের জায়গা করে দিতে বাধ্য হবে।
|
আইনি প্রয়োগ ও উচ্ছেদ অভিযান
এই অপব্যবস্থা বন্ধ করতে কেবল জরিমানা যথেষ্ট নয়। সিটি কর্পোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগকে যৌথভাবে নিয়মিত ‘পার্কিং অডিট’ করতে হবে। প্রতিটি মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডে নকশা অনুযায়ী পার্কিং আছে কি না, তা সরেজমিনে তদন্ত করতে হবে। যদি দেখা যায় কেউ পার্কিংয়ের জায়গা ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছে, তবে কোনো নোটিশ ছাড়াই সেই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। প্রয়োজনে সেই ভবনের বাণিজ্যিক লাইসেন্স বাতিল করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাস্তার জায়গা যারা দখল করে ব্যবসা করার পরিবেশ তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স‘ নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
ভোগান্তিমুক্ত নগরের প্রত্যাশা
জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি রাস্তা কোনো ব্যক্তিগত পার্কিং লট হতে পারে না। আপনি আপনার ভবনে ব্যবসা করে কোটি টাকা আয় করবেন, আর তার জন্য সাধারণ মানুষকে রাস্তায় জ্যামে বসে কষ্ট পেতে হবে—এই বৈষম্য আর চলতে দেওয়া যায় না।
প্রতিটি ভবন মালিককে বাধ্য করতে হবে যেন তারা তাদের গ্রাহক ও ভিজিটরদের পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নিজের সীমানার ভেতরেই করেন।
রাস্তার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মালিকদের ওপর কঠোর আইন প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। আমরা এমন একটি শহর চাই যেখানে ব্যবসা চলবে নিয়ম মেনে এবং রাস্তা থাকবে সাধারণ মানুষের নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের জন্য।

