বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। শিল্পায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি, দুর্বল সুশাসন এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে গভীর সংকটে ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর বিভিন্ন হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী খেলাপি ঋণের প্রবণতা ক্রমাগত বাড়ছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করছে।
এই সংকট শুধু পরিসংখ্যানগত নয়, বরং এটি নীতিনির্ধারণ, তদারকি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণ যাচাই প্রক্রিয়া এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি ব্যাংকিং খাতের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। ফলে সাধারণ আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যাচ্ছে, যা আর্থিক ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র: পরিসংখ্যানের আড়ালের বাস্তবতা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, যা শুধু আর্থিক খাত নয়, পুরো অর্থনীতির জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন নীতিগত সুবিধার কারণে প্রকৃত চিত্র অনেক সময় আড়ালে ছিল। তবে সাম্প্রতিক তদারকিতে বাস্তব অবস্থা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের মোট বিতরণকৃত ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। তবে পুনঃতফসিল ও স্থগিত মামলার কারণে প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ এর চেয়েও বেশি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
খেলাপি ঋণের বড় অংশ অল্পসংখ্যক বড় ঋণগ্রহীতার মধ্যে কেন্দ্রীভূত। ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল সংসদে উপস্থাপিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়, শীর্ষ ২০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টি এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট, যাদের কাছে প্রায় ২২ হাজার ৮৮১ কোটি টাকার বেশি ঋণ আটকে আছে। একই সময়ে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকারও বেশি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ ১২০ খেলাপির কাছে প্রায় ৯২ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা আটকে আছে, অথচ আদায় হয়েছে মাত্র ৪৬৯ কোটি টাকা (প্রায় ০.৫ শতাংশ)। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ডিসেম্বর শেষে ৪৪.৪৪ শতাংশে পৌঁছায়।
খেলাপি ঋণের চাপ সরাসরি ব্যাংকের মূলধন কাঠামোকে দুর্বল করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ২৩টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং ধারার ব্যাংকগুলোতে ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের ঘাটতি প্রায় ৩৭ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা, বেসরকারি ব্যাংকে প্রায় ৩৬ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে প্রায় ৩২ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা।
বেসরকারি খাতে ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাকাবের অবস্থাও চাপের মধ্যে। একই সঙ্গে প্রায় ৩.০৪ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ মাত্র ৫,৭৭৫ জন বড় ঋণগ্রহীতার হাতে কেন্দ্রীভূত, যা সমস্যার কাঠামোগত গভীরতা নির্দেশ করে।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়মিত ঋণ অনুমোদন এবং বিশেষ সুবিধা প্রদান। এর পাশাপাশি অর্থপাচারের অভিযোগও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় নেমে আসে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩০.৬০ শতাংশ। এই হ্রাস মূলত হিসাব পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের কারণে হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। সব মিলিয়ে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় একটি সমন্বিত সংস্কার রোডম্যাপ গ্রহণ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি। এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ।
এই রোডম্যাপে খেলাপি ঋণ আদায়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এজন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং অর্থঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণও এর অংশ।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে যোগ্য ও পেশাদার নিয়োগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঋণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং বেনামী শেয়ার ধারণ রোধে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে একীভূতকরণ ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব ব্যাংককে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে এবং মূলধন ঘাটতি পূরণের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তদারকি ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, বিশেষ টাস্কফোর্স এবং Asset Quality Review (AQR) কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে IFRS 9 হিসাব পদ্ধতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি Distressed Asset Management কাঠামো বা ‘ব্যাড ব্যাংক’ গঠনের বিষয়েও আলোচনা চলছে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ আলাদা করে পরিচালনা করা যায়।
খেলাপি ঋণ আদায় এবং নতুন খেলাপি রোধে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ৮ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তারল্য সংকট মোকাবিলায় বিশেষ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে আমানত বিমা কাভারেজ বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিস্তার ঘটানো হচ্ছে।
বর্তমান ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো তারল্য সংকট, যা মূলধন ঘাটতি ও উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে তৈরি হয়েছে। অনেক ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে চাপের মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ তারল্য সহায়তা প্রদান করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সমাধানের জন্য প্রয়োজন সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কঠোর ঋণ যাচাই, দ্রুত খেলাপি ঋণ আদায় এবং দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ এবং পুঁজিবাজারের মাধ্যমে ব্যাংকের মূলধন শক্তিশালী করা জরুরি।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং তারল্য সংকটের এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চলমান সংস্কার উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সফলতা নির্ভর করছে কার্যকর বাস্তবায়ন, কঠোর তদারকি এবং সুশাসনের ওপর। দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

