ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় ব্যাংকের শাখায় গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে যে কাজ করতে হতো, এখন তার বড় অংশই সম্পন্ন হচ্ছে স্মার্টফোনের মাধ্যমে।
টাকা পাঠানো, মোবাইল রিচার্জ, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল পরিশোধ, বেতন গ্রহণ, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা সরকারি ভাতা সংগ্রহ—সবকিছুই ধীরে ধীরে চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যেমন গতিশীল করছে, তেমনি মানুষের দৈনন্দিন জীবনও সহজ করে তুলছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রযুক্তির এই দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের গ্রাহকেরা কতটা প্রস্তুত?
বর্তমানে দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) খাত অভূতপূর্ব গতিতে বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেশে নিবন্ধিত এমএফএস অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ কোটি ৯০ লাখে। এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ অ্যাকাউন্ট নারীদের নামে। তবে এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি হওয়ায় অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়। এর প্রধান কারণ হলো, একজন গ্রাহক একই জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একাধিক প্রতিষ্ঠানে আলাদা আলাদা অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে bKash, Nagad এবং Rocket-এ পৃথক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারেন। ফলে নিবন্ধিত অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বাস্তব ব্যবহারকারীর তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়।
বাংলাদেশে এমএফএস এখন আর শুধু টাকা পাঠানোর মাধ্যম নয়; এটি দেশের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রবাসী আয় গ্রহণ, ব্যবসায়িক লেনদেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, সরকারি সহায়তা বিতরণ এবং বেতন প্রদান—সব ক্ষেত্রেই মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এমএফএস প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে মোট লেনদেনের পরিমাণ রেকর্ড ১ দশমিক ৭২ ট্রিলিয়ন টাকা বা প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩২ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি।
এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৪০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী পুরো ২০২৪ সালে এমএফএসের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের মানুষ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ডিজিটাল আর্থিক সেবার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। অনলাইন কেনাকাটা, কিউআর কোড স্ক্যান করে বিল পরিশোধ এবং মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং এখন নগর জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলেও মোবাইলভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের বিস্তার স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করছে। আগে যেখানে গ্রামের মানুষকে টাকা পাঠাতে বা ব্যাংকিং সেবা নিতে শহরে যেতে হতো, এখন সেই কাজ ঘরে বসেই করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে এই অগ্রগতির মাঝেও কিছু বড় বাস্তবতা সামনে এসেছে। নিবন্ধিত অ্যাকাউন্টের সংখ্যা যত বড়ই হোক না কেন, সব অ্যাকাউন্ট নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে না।বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে মোট নিবন্ধিত মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের মধ্যে সক্রিয় অ্যাকাউন্টের হার এখনো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষ অ্যাকাউন্ট খুললেও নিয়মিত ডিজিটাল লেনদেনে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি।
বাংলাদেশে এখনো নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। অনেক গ্রাহক মোবাইলে টাকা পেলেও তা সঙ্গে সঙ্গে “ক্যাশ আউট” করে হাতে তুলে নেন। এমএফএস লেনদেনের বড় অংশই এখনো ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট এবং ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে টাকা পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। সরাসরি মার্চেন্ট পেমেন্ট বা কিউআর কোড ব্যবহার করে কেনাকাটার প্রবণতা শহুরে অঞ্চলে বাড়লেও প্রান্তিক পর্যায়ে তা এখনো সীমিত। ফলে প্রকৃত অর্থে ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে বড় ধরনের আচরণগত পরিবর্তন এখনো প্রয়োজন।
ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। গ্রামীণ ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনেকেই এখনো নিজে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে নিরাপদে লেনদেন করতে পারেন না। অনেকে এমএফএস এজেন্টের সহায়তার ওপর নির্ভর করেন। ফলে ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা বা নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ওটিপি জালিয়াতি, ফিশিং, ভুয়া কাস্টমার কেয়ার এবং সিম সোয়াপিংয়ের মতো সাইবার প্রতারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অনাস্থা তৈরি করছে। ছোটখাটো লেনদেনে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও বড় অঙ্কের অর্থ এখনো ব্যাংক শাখা বা নগদ টাকাতেই বেশি নিরাপদ মনে করেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো ডিজিটাল বৈষম্য। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এখনো ইন্টারনেট সংযোগ, স্মার্টফোন ব্যবহার এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নারী ও পুরুষের মধ্যেও ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহারে পার্থক্য দেখা যায়। যদিও নারীদের অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়ছে, তবুও আর্থিক স্বাধীনতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
সরকার “স্মার্ট বাংলাদেশ” গড়ার লক্ষ্যে ২০৩১ সালের মধ্যে ক্যাশলেস অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি “ক্যাশলেস বাংলাদেশ ইউনিট” গঠনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না; মানুষের মধ্যে আস্থা, দক্ষতা এবং নিরাপদ ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মানুষ এখন মুঠোফোনভিত্তিক প্রাথমিক ব্যাংকিং সেবায় অভ্যস্ত হলেও পুরোপুরি ডিজিটাল অর্থনীতিতে প্রবেশের জন্য আরও সময় ও প্রস্তুতি প্রয়োজন। সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা, গ্রাহকদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা বৃদ্ধি করা, নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজ ও নিরাপদ করে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ ভবিষ্যতের ব্যাংকিং হবে কাউন্টারের লাইনে দাঁড়িয়ে নয়, বরং মানুষের হাতের মুঠোয়। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ সফল করতে হলে শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন সচেতন, দক্ষ এবং আত্মবিশ্বাসী গ্রাহকও।

