দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক জটিল ও গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে এই খাত দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তর, শিল্প ও ব্যবসার সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিও অনেকাংশে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, তারল্য সংকট, দুর্বল তদারকি, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সুশাসনের ঘাটতি ব্যাংকিং খাতকে ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে জনআস্থার অবনতি খাতটির সংকটকে আরও গভীর করেছে। ফলে ব্যাংকগুলো আজ শুধু আর্থিক চাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বিনিয়োগে মন্থর গতির প্রেক্ষাপটে একটি নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ বাস্তবতা হলো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতাগুলো এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এর প্রভাব বিস্তৃত হচ্ছে পুরো অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার ওপর। তাই এই খাতের বর্তমান অবস্থা, সংকটের কারণ এবং উত্তরণের পথ নিয়ে গভীর পর্যালোচনা এখন সময়ের দাবি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকিং খাত তার মূল উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা থেকে ক্রমশ বিচ্যুত হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এই খাত একদিকে অর্থনীতিকে সহায়তা করছে, অন্যদিকে নিজেই একটি বড় ঝুঁকির উৎসে পরিণত হয়েছে।
এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো সুশাসনের ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অযাচিত প্রভাব। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক পরিচালনা ও ঋণ বিতরণ ব্যবস্থায় পেশাদারিত্বের পরিবর্তে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে যোগ্যতা ও আর্থিক সক্ষমতার পরিবর্তে সম্পর্কনির্ভর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদিত হয়েছে, যার একটি বড় অংশ পরবর্তীতে অনাদায়ী হয়ে পড়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে খেলাপি ঋণের ওপর। দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, অনাদায়ী ঋণ পুনরুদ্ধারে ব্যর্থতা এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশের কাছাকাছি—একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক অনুপাত। যদিও কিছু নীতিগত পদক্ষেপ ও পুনঃতফসিলের ফলে এই হার কিছুটা ওঠানামা করেছে, তবুও ঝুঁকির মাত্রা এখনও উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে।
খেলাপি ঋণের পাশাপাশি অনেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতি এবং প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থতার সমস্যায় ভুগছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং পুরো খাতের স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
একই সঙ্গে আস্থার সংকট এবং তারল্য চাপ ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার খবর সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে আমানত প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কিছু ব্যাংক দৈনন্দিন তারল্য চাহিদা পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, একীভূতকরণ এবং তারল্য সহায়তার মাধ্যমে খাতটিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। তবে প্রস্তাবিত আইন ও নীতিমালার কিছু দিক নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তাঁদের মতে, কেবল আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়; বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর তদারকি ছাড়া প্রকৃত সংস্কার সম্ভব নয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ব্যাংকের পরিচালনা প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক ও স্বার্থনির্ভর প্রভাব থেকে মুক্ত করে পেশাদার ব্যবস্থাপনার অধীনে আনতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও স্বাধীন ও কার্যকরভাবে ঝুঁকি-ভিত্তিক তদারকি জোরদার করতে হবে।
খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধানে কঠোর আইন প্রয়োগ, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত পুনর্গঠন, একীভূতকরণ অথবা প্রয়োজনে অবসায়নের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
সবশেষে, ব্যাংকিং খাতের জন্য প্রণীত নীতিমালা ও সংস্কারগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব ও নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কারণ একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
আজ তাই প্রশ্নটি শুধু ব্যাংকগুলোর নয়—এটি পুরো অর্থনীতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন। ব্যাংকিং খাত যদি সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে, তবে তা অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে; আর যদি না পারে, তবে এর প্রভাব বহন করতে হবে পুরো জাতিকে।

